সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে জাতিসংঘের জলবায়ু বিষয়ক বৈশ্বিক সম্মেলন ‘কনফারেন্স অব পার্টিজ বা কপ-২৮’ মঙ্গলবার (১২ ডিসেম্বর) শেষ হয়েছে। ১২ দিন ব্যাপি এই অনুষ্ঠিত সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতি তহবিল ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড’ গঠনের পর সেখানে ৭০ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেলেও বাংলাদেশের খুব বেশি আশাবাদী হওয়ার তেমন কোন কারণ নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, বিশ্বের অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেই এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ায় এর প্রতি দৃষ্টি কম ছিল। একই সাথে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব রুখতে তৈরি করা তহবিলগুলোতে দিন দিন অর্থ সংস্থান কমে যাওয়ার কারণে এর থেকে খুব বেশি প্রত্যাশাও ছিল না।
অ্যাকশন এইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবীর সাংবাদিকদের বলেছেন, কপ-২৮ লস এন্ড ড্যামেজ ফান্ডে বিভিন্ন দেশের অংশগ্রহণের সুখবর দিয়ে শুরু হলেও, টানা দুই সপ্তাহ ধরে নানা আলোচনার পরে আশানুরূপ ফল পাওয়া যায়নি। তবে সম্মেলনের বড় অর্জন জলবায়ু ক্ষয়ক্ষতি তহবিল গঠন চূড়ান্ত হওয়া। বাংলাদেশ যাতে ওই তহবিল থেকে দ্রুত বরাদ্দ নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের দিতে পারে, সে ব্যাপারে আর বেশি মনোযোগ দিতে হবে। তিনি বলেন, আমরা গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড, অভিযোজন তহবিল, স্পেশাল জলবায়ু পরিবর্তন তহবিলে বেশকিছু প্রতিশ্রুতি পেলেও, এর ধারাবাহিকতা এবং যথাযথ প্রয়োগের ব্যাপারে সন্দিহান।
বেসরকারি সংস্থা কোস্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, অভিযোজন তহবিলে ১০০ মিলিয়ন ডলার দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জার্মানি। ইসরায়েলকে সহায়তা করার জন্য পাঁচ বিলিয়ন ডলার দিলেও আমেরিকা জলবায়ু তহবিলে মাত্র ১৭ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। তাই সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এই ফান্ড থেকে ২০০ মিলিয়নের মতো অর্থ পেতে পারে, যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। অথচ ট্রিলিয়ন ডলার আশা করা হয়েছিল। কারণ প্রতিবছর বাংলাদেশকে ১০০ বিলিয়ন ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি ছিল, সেটা এখন মিলিয়নে নেমে আসছে। সুতরাং অভিযোজন তহবিল থেকে খুব বেশি সহায়তা আশা করতে পারবো না। তাছাড়া এইসব তহবিলের অর্থ কতটা পাওয়া যাবে সেটাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ অভিযোজন তহবিল এবং গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডের অর্থ পাওয়াটা খুব কঠিন। বাংলাদেশের মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠান এতে নথিবদ্ধ হয়েছে। একটি হচ্ছে পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) এবং আরেকটি হচ্ছে ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল)। তারাও সব মিলিয়ে প্রায় ১০ থেকে ২০ মিলিয়নের মতো টাকা পেয়েছে। তাই আমরা আশা করলেও খুব বেশি লাভ হবো না।
কোস্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক বলেন, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, বিশ্ব ব্যাংক, আইএমএফ এর মতো বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের বিষয়ে সচেতন। কারণ বাংলাদেশ এরইমধ্যে মারাত্মক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে এ বছর সবচেয়ে গরম দিনগুলো পার করেছে। এক বছরেই ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট চারটি ঘূর্ণিঝড়ের মুখে পড়েছে। এরইমধ্যে বেশ ভাল শীত পড়তে শুরু করেছে। তিনি বলেন, এডিবি, আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের জন্য ৫ বিলিয়নের একটা বিশেষ তহবিল তৈরি করতে যাচ্ছে। এটা একটা আশার বাণী বলে মনে করেন তিনি।
কপ-২৮ এ যোগ দেওয়া বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের অন্যতম সদস্য এবং পরিবেশ অধিদফতরের পরিচালক জিয়াউল হক বলেন, সম্মেলনে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জলবায়ু ক্ষয়ক্ষতি তহবিলে নতুন করে বরাদ্দ দেওয়ার দাবি তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশ যাতে সেখান থেকে দ্রুত ও সহজে প্রকল্পের মাধ্যমে বরাদ্দ পায় সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।
কপ- ২৮ সম্মেলনে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শিল্পোন্নত দেশগুলো যাতে জলবায়ুর ক্ষয়ক্ষতি তহবিলে অন্য কোনো খাত থেকে অর্থ এনে না দেয়। সে ব্যাপারে বিশ্ববাসীকে সাবধান করেছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী, বিশ্বের তাপমাত্রা এই শতাব্দীর মধ্যে যাতে দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি না বাড়ে, সেই লক্ষ্যে শিল্পোন্নত দেশগুলোতে কার্বন নিঃসরণ কমানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
সময়ের আলো/জেডআই