নির্বাচনি প্রচারণায় পলিথনে মোড়ানো (লেমিনেটেড) পোস্টার তৈরি ও ব্যবহারে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও তা মানছেন না প্রার্থীরা। আদালতের নিষেধাজ্ঞা ও নির্বাচনি আচরণবিধির লঙ্ঘন করে প্রচারকাজে পরিবেশ দূষণকারী প্লাস্টিকের যথেচ্ছ ব্যবহার করছেন তারা। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরুর পর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রার্থীদের লেমিনেটেড পোস্টার ও ব্যানারে ছেয়ে গেছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার অলিগলি এবং রাস্তায় প্রার্থীর লেমিনেটেড পোস্টার এবং ব্যানার ঝুলতে দেখা গেছে।
২০২০ সালের ২২ জানুয়ারি পরিবেশ রক্ষায় সিটি নির্বাচনে পলিথিনে মোড়ানো পোস্টার তৈরি ও ব্যবহার বন্ধের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। সারা দেশে পলিথিনে মোড়ানো পোস্টার তৈরি ও ব্যবহার কেন নিষিদ্ধ করা হবে না জানাতে রুলও জারি করেন আদালত। বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সচিব, নির্বাচন কমিশন সচিব, স্বাস্থ্যসচিব ও দুই সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট অন্যদের ওই রুলে বিবাদী করা হয়।
বৃহস্পতিবার সরেজমিন দেখা গেছে, ঢাকা-১০ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী চিত্রনায়ক ফেরদৌস আহমেদ, ঢাকা-৬ আসনে সাঈদ খোকন, ঢাকা-৪ আসনে আবু হোসেন বাবলা ও অ্যাডভোকেট সানজিদা খানম, ঢাকা-৭ আসনে মোহাম্মাদ সোলায়মান সেলিমের লেমিনেটিং করা অগণিত পোস্টার এবং ব্যানার রাস্তায় টাঙানো রয়েছে।
পরিবেশবিদরা বলছেন, প্রাথমিক ব্যবহারের পরে ফেলে দেওয়া এ বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য পরিবেশ দূষণের অংশীদার হবে। এসব একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াবে, পরিবেশ বিপর্যয় ঘটবে। এ ছাড়া বায়ু ও পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। যারা জনগণের জনপ্রতিনিধি হবেন তারাই যদি আইন না মানেন, পরিবেশ দূষণের কারণ হন, এটা খুবই দুঃখজনক।
এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এসডো) বলছে, ২০২০ সালে সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগে তারা বাংলাদেশে লেমিনেটেড পোস্টার, লিফলেট, স্টিকার ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে ‘থার্মাল লেমিনেশন ফিল্মস : অ্যান ইনসিজিং হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট হ্যাভক অব ঢাকা সিটি’ শীর্ষক একটি গবেষণা করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকা শহরে প্রতি বছর বিভিন্ন উৎস থেকে গড়ে প্রায় ১০ হাজার টনের ওপর লেমিনেটেড প্লাস্টিকের বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যা মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ। ২০২০ সালে ঢাকার ২ সিটি নির্বাচনের প্রচারণা শুরুর ১২ দিনের মধ্যেই ২ হাজার ৪৭২ টন লেমিনেটেড প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়েছে। ২০২০ সালে সিটি নির্বাচনের আগে এ বিষয়ে আদালতে রিট করে এসডো। এর পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণায় প্লাটিকের ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় আদালত।
সংস্থাটি বলছে, এবারের জাতীয় নির্বাচনে ইতিমধ্যে লেমিনেটিং করা পোস্টার ও ব্যানার ছাড়াও প্রচারণায় ব্যবহৃত স্টিকার, সাধারণ কার্ড, স্বেচ্ছাসেবকের পরিচয়পত্র তৈরিতেও লেমিনেটেড প্লাস্টিকের ব্যবহার লক্ষ করা যাচ্ছে। পরিবেশ দূষণকারী প্লাস্টিকের অপব্যবহার নিয়ে নানা আইন থাকলেও এর বাস্তবায়ন নেই। অনেকটা ‘কাজির গরু কেতাবে আছে গোয়ালে নেই’ অবস্থা।
এবার জাতীয় নির্বাচনের জন্য সারা দেশে প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে। তাই এবার প্লাস্টিক বর্জ্যরে পরিমাণ অনেক বেশি হবে। ২০ হাজার টন ছাড়িয়ে যেতে পারে। তাই নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণায় প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধে চলতি সপ্তাহে আদালতের শরণাপন্ন হবে তারা।
২০২০ সালে আদালতের নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনও নির্দেশনা দেয়। সর্বশেষ ইউপি নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণায় প্লাস্টিকের ব্যবহার না করতে নির্দেশনা দিলেও এবার সে রকম কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি কমিশনকে।
কমিশন বলছে, নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণায় প্লাস্টিকের ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং ব্যবহার করলে তা হবে নির্বাচনি আচরণবিধির লঙ্ঘন। কোনো প্রার্থী এতে জড়িত হলে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এবার জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে কি না তা নিশ্চিত করতে পারেনি কমিশন।
একাধিক প্রার্থীর কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তারা বলেন, অতিউৎসাহী কর্মী-সমর্থকরা এমনটা করেছেন। তারা ব্যবস্থা নেবেন। কেউ বলেছেন, জানতেন না। কেউ বলেছেন, আর করবেন না।
এ বিষয়ে বাপার যুগ্ম সম্পাদক প্রফেসর ড. কামরুজ্জামান মজুমদার সময়ের আলোকে বলেন, এর আগে ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনেও লেমিনেটিং করা পোস্টারের আধিক্য দেখা যায়। প্রতিটি পোস্টার লেমিনেটিং করতে ১০ থেকে ২৮ গ্রাম প্লাস্টিকের ব্যবহার হয়। এটি অপচনশীল এবং পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এ মুহূর্তে বৃষ্টি হলে এসব লেমিনেটিং করা পোস্টার স্যুয়ারেজ লাইনে গিয়ে পানিপ্রবাহে বাধার সৃষ্টি করবে, জলাবদ্ধতা তৈরি হবে। অর্থাৎ প্লাস্টিকের কারণে দূষণ হবে।
তিনি বলেন, পরিবেশের দূষণ রোধে জনপ্রতিনিধিদের সচেতন হতে হবে। যারা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন তারা আমাদের জনপ্রতিনিধি হবেন। এখন তারাই যদি পরিবেশ দূষণ রোধে সচেতন না হয়, এটা দুঃখজনক।
তিনি বলেন, আমরা কয়েকজন প্রার্থীর সঙ্গে আনঅফিসিয়ালি কথা বলছি, তারা বলছেন, পোস্টার কুয়াশায় ভিজে নষ্ট হয়ে যাওয়া এড়াতে লেমিনেটিং করা হয়। অনেকে বলেছে, আইনটা আছে তা জানেন না। কয়েকজন বলেছেন, আর করবেন না। এই আইনটা যাতে যথাযথ পালন হয় সে বিষয়ে নির্বাচন কমিশন একটা নির্দেশনা দিতেই পারে।
এ বিষয়ে এসডোর নির্বাহী পরিচালক সিদ্দীকা সুলতানা সময়ের আলোকে বলেন, নির্বাচনি প্রচারণায় প্লাস্টিকের ব্যবহার না করার বিষয়ে হাইকোর্টের আদেশ রয়েছে, মন্ত্রণালয় থেকে গণবিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে, এরপরও প্রার্থীরা নির্বাচনি প্রচারণায় প্লাস্টিকের ব্যবহার করছেন। এটা কাম্য নয়। এটা আমাদের নজরে এসেছে। এটা সারা দেশেই হচ্ছে বলে জানা গেছে।
তিনি বলেন, আগামী সপ্তাহে আমরা আবারো আদালতে পিটিশন দাখিল করব, সেই প্রস্তুতি নিচ্ছি। এবার গতবারের চেয়ে বেশি লেমিনেটিং করা পোস্টার ব্যবহার হচ্ছে।
তিনি বলেন, প্লাস্টিকটা কখনো রিসাইকেল হয় না। এটা ২-৩ দিনের মধ্যে ছিঁড়ে যেখানে সেখানে পড়বে, ড্রেনে যাবে, মাটিতে পড়বে। মাটিতে মিশবে না, ড্রেনেজ সিস্টেমে বাধা সৃষ্টি করবে, আগুনে পোড়ালে তা বাতাস দূষিত করবে। ঢাকা শহর এমনিতেই সবচেয়ে দূষিত শহর, এ প্লাস্টিক পোড়ালে দূষণ আরও বাড়বে। স্বাস্থ্যের ক্ষতি হবে।
ইসির অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ সময়ের আলোকে বলেন, নির্বাচনে লেমিনেটিং করা পোস্টার ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। এতে পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হয়। কেউ লেমিনেটিং করে পোস্টার ব্যবহার করলে এটা আচরণবিধি লঙ্ঘন হবে। তার বিরুদ্ধে আচরণবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এবার জাতীয় নির্বাচনে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে পরে জানানো হবে।
সময়ের আলো/আরএস/