বাসা থেকে তুলে নিয়ে টর্চার সেলে নির্যাতন ও মুক্তিপণের অভিযোগে সম্প্রতি পল্লবী থানার দুই এসআই ও এক এএসআইসহ ছয়জনের নামোল্লেখ করে আদালতে মামলা করেছেন আবদুর রহিম নামে এক ভুক্তভোগী। শুধু আদালত নয়, তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছেও এসব অভিযোগ দাখিল করেন। তবে মামলায় নাম থাকা ওই তিন পুলিশ কর্মকর্তার দাবি, এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন, মিথ্যা ও হয়রানিমূলক।
গত ৯ এপ্রিল করা ওই মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, আবদুর রহিম (৩৫) রাজধানীর পল্লবী থানাধীন মিরপুর সেকশন-৭-এর ৫ নম্বর রোডের বাসিন্দা। তিনি ওয়ালটন ইলেকট্রনিক্স মালামালের ব্যবসা করেন। যদিও মামলায় তিনি তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করেননি।
আবদুর রহিম পুলিশের যে তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন তারা হলেন-পল্লবী থানার এসআই শুভ, এসআই জিতু ও এএসআই ফয়সাল। সময়ের আলোর হাতে আসা এ সংক্রান্ত একটি সিসি ক্যামেরা ফুটেজে দেখা যায়, গত ৭ এপ্রিল আবদুর রহিমকে তার বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাচ্ছেন ওই পুলিশ কর্মকর্তারা। তবে ওই পুলিশ কর্মকর্তাদের দাবি, আবদুর রহিমের নামে অর্থ ও স্বর্ণালংকার আত্মসাৎসহ পল্লবী থানায় অনন্ত পাঁচটি অভিযোগ দিয়েছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী। অভিযোগ তদন্ত করতে গেলে তাদের হয়রানি করতেই এ মামলা করেছেন আবদুর রহিম। একই সঙ্গে আবদুর রহিমকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন তারা।
রহিমের অভিযোগের বিষয়ে পুলিশ যা বললেন : এসআই শুভ বলেন, অর্থ ও স্বর্ণালংকার আত্মসাতের অভিযোগে রহিমকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় ডাকা হয়। এ সময় বাদী জিয়াউল হক উপস্থিত ছিলেন, সিসি ক্যামেরার ফুটেজেও তার প্রমাণ রয়েছে। আশা করি, সুষ্ঠু তদন্তে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে। এসআই জুমাইতুল ইসলাম জিতু বলেন, আমাদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ দিয়েছেন তা বিভাগীয় তদন্ত চলছে। তদন্তে সত্যতা বেরিয়ে আসবে। এএসআই মো. ফয়সাল হোসেন বলেন, আমাদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা ভিত্তিহীন, মিথ্যা ও হয়রানিমূলক।
এদিকে ঢাকা মহানগর পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলেন, পল্লবী থানার তিন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলার পর ডিএমপি কমিশনারের নির্দেশে অভিযোগ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত করে ঘটনার সত্যতা পেলে আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে অভিযোগকারী কোনো অপরাধে জড়িত রয়েছেন কি না সে বিষয়েও বিস্তারিত খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।
আবদুর রহিমের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ : আবদুর রহিম ২০২৩ সালের ১৬ নভেম্বর তার পরিচিত জিয়াউল হক নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে দুবাই ঘুরতে যান। ২৩ নভেম্বর ভোর সাড়ে ৪টার দিকে ঢাকায় শাহজালাল বিমানবন্দরে অবতরণ করলে জিয়াউলের লাগেজ নিয়ে তার আগেই বের হয়ে বাসায় চলে যান আবদুর রহিম। ওইদিনই সকাল সাড়ে ৬টার দিকে রহিমের পল্লবীর বাসায় গিয়ে লাগেজ ফেরত চাইলে তিনি জিয়াউলকে বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেন। তিনটি ব্যাগে ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকার গহনা এবং নগদ ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা ছিল বলে দাবি ভুক্তভোগীর। পরে স্থানীয় লোকজন ও আত্মীয়স্বজনদের মাধ্যমে টাকা ও গহনা উদ্ধারের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে সম্প্রতি থানায় অভিযোগ করেন। ওই অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব পান এসআই জিতু।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী জিয়াউল হক সময়ের আলোকে বলেন, রহিমের কাছে সর্বমোট ১১ লাখ ৩০ হাজার টাকা পাই। টাকার জন্য গত ডিসেম্বর থেকে তাকে তাগিদ দেওয়া হলেও টাকা না দেওয়ায় থানায় অভিযোগ করি। এরপরও টাকা দেবে দেবে বলে দিচ্ছিল না। থানা পুলিশও তাকে ডাকলে যাচ্ছিল না। অবশেষে পুলিশ নিয়ে তার বাসায় যাই, যেন সে এ বিষয়ে কিছু একটা সমাধান দেয়। এরপর সে পুলিশের সঙ্গে থানায় আসে। সঙ্গে আমিও যাই। থানায় বসেই রহিম টাকা পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু থানা থেকে বেরিয়ে টাকা না দেওয়ার উদ্দেশ্যে বিষয়টি অন্য খাতে প্রবাহিত করতে পুলিশের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ তুলছে।
মিরপুর-১০ নম্বর সেকশনের আরফান উদ্দিন চৌধুরী শিমুল নামের এক ইলেকট্রনিক পণ্য ব্যবসায়ীর কাছ থেকেও ৩৪ লাখ ২৯ হাজার ৮৪৩ টাকার ইলেকট্রনিক পণ্য বাকিতে আনেন আবদুর রহিম। কিন্তু এ টাকা চাইতে গেলে বিভিন্ন লোকজন নিয়ে দোকানে গিয়ে হুমকি দেন মর্মে গত ৩০ এপ্রিল পল্লবী থানায় অভিযোগ করেছেন শিমুল। এ বিষয়ে ভুক্তভোগী সময়ের আলোকে বলেন, আবদুর রহিম ইলেকট্রনিক পণ্যের ব্যবসা করেন। সেই সুবাদে তাকে বাকি দেওয়া হয়েছে। তার কাছে বাকির টাকা চাইতে গেলে তিনি বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেন। ২০২০ সাল থেকে এসব টাকার বিষয়ে তাগিদ দেওয়া হলেও তিনি এখন পর্যন্ত কোনো টাকা দেননি। পরে গত ৩০ এপ্রিল রহিমের বিরুদ্ধে পল্লবী থানায় অভিযোগ করি।
এ ছাড়াও আবদুর রহিমসহ তিনজনের নামে ওয়ালটন পণ্য এনে ৩৫ লাখ ৫৪ হাজার ৫২৮ টাকা পরিশোধ না করায় ২০২৩ সালের ৯ নভেম্বর পল্লবী থানায় জিডি করেছেন ওয়ালটন হাইটেক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের অ্যাডিশনাল অপারেটিভ ডিরেক্টর টিএম আবদুল্লাহ আল ফুয়াদ।
অভিযোগের বিষয়ে যা বললেন রহিম : এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আবদুর রহিম সময়ের আলোকে বলেন, আমি খুব সাধারণ একজন মানুষ। আমাকে টর্চারের বিরুদ্ধে মামলা ও একাধিক রিপোর্ট হওয়ায় এ মামলা সাজানো হয়েছে। আমার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট।
আপনার বিরুদ্ধে করা মামলাগুলোতে ওসি ও এসআইয়ের স্বাক্ষর রয়েছে, তা হলে এগুলো কীভাবে মিথ্যা হয়? এমন প্রশ্নের জবাবে রহিম বলেন, আমার বিরুদ্ধে এ ধরনের কোনো অভিযোগ নেই। আমাকে ফাঁসানোর চেষ্টা চলছে।
এ বিষয়ে পল্লবী থানার ওসি অপূর্ব হাসান বলেন, উনার (আবদুর রহিম) বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ করা হয়েছে। যেহেতু পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে এখন তিনি অভিযোগ করেছেন, তাই এখন ওইসব অভিযোগ তদন্ত হচ্ছে না। তবে আদালতের অনুমতি চাওয়া হয়েছে, অনুমতি পেলে আবদুর রহিমের নামে করা অভিযোগগুলো তদন্ত করা হবে।
সময়ের আলো/আরএস/