অটোরিকশার নিয়ন্ত্রণেও রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা

এসএম মিন্টু

রাজধানী

‘আল্লাহ ভরসা’, ‘খোদা হাফেজ’, ‘খাজা বাবা’ কিংবা ‘বিসমিল্লাহ’- এমন হরেক নামের ব্যানারে অটোরিকশা চলতে দেখা যায় রাজধানীর সড়কে। এ ধরনের

2024-05-21T01:44:43+00:00
2024-05-21T01:44:43+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬,
১৮ আষাঢ় ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬
রাজধানী
অটোরিকশার নিয়ন্ত্রণেও রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা
চেনা যায় নাম দেখে
এসএম মিন্টু
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২১ মে, ২০২৪, ১:৪৪ এএম 
অটোরিকশার নিয়ন্ত্রণেও রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা
‘আল্লাহ ভরসা’, ‘খোদা হাফেজ’, ‘খাজা বাবা’ কিংবা ‘বিসমিল্লাহ’- এমন হরেক নামের ব্যানারে অটোরিকশা চলতে দেখা যায় রাজধানীর সড়কে। এ ধরনের নাম ব্যবহার মূলত চাঁদাবাজির একটি কৌশল, যার নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিরা সবাই স্থানীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতাকর্মী। গত কয়েক দিনে রাজধানীতে অটোরিকশা চালানোর দাবি আদায়ে চালকদের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এসব নামযুক্ত ব্যানার দেখে ট্রাফিক পুলিশ সহজেই বুঝতে পারেন কোন অটোরিকশা কোন এলাকার কোন নেতার নিয়ন্ত্রণে। 

এভাবে যারা অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন সপ্তাহ শেষে তারা অটোরিকশাপ্রতি ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকা চাঁদা আদায় করে থাকেন অটোরিকশা মালিক ও চালকের কাছ থেকে। এসব টাকা রাজনৈতিক নেতাকর্মীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে ভাগভাটোয়ারা করে নেন বলে সময়ের আলোর কাছে অভিযোগ করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অটোরিকশার একাধিক মালিক ও চালক।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেশ কয়েকজন অটোরিকশার মালিক ও চালক জানান, স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীরা এসব টাকা নিয়ে থাকেন। পরে ওই নেতাকর্মীদের মাধ্যমেই ভাগ পৌঁছে যায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে। এ কারণে রাজধানীতে চলা অটোরিকশার ব্যানার দেখেই বুঝতে পারেন এ কোন নেতা রিকশা পরিচালনা করছেন। 

সম্প্রতি অটোরিকশা বন্ধের ঘোষণা দেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। একই দিন ঘোষণা দেয় বিআরটিএ। এরপরই পুলিশ অ্যাকশনে যায়। গত রোববার রাজপথে অটোরিকশা চালানোর দাবিতে বিক্ষোভ করে চালকরা। দাবি আদায়ে পুলিশের সঙ্গে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এক পর্যায়ে বিক্ষুব্ধ চালকরা মিরপুরের কালশীতে পুলিশ বক্সে অগ্নিসংযোগ করে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এ আন্দোলনের ঘোষণা দেয়। চালকদের অনেকেই জানায়, তাদের আন্দোলনে আওয়ামী যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীও ছিল। আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় গতকাল সকাল থেকেই রাস্তায় নেমে পরে অটোরিকশা চালকরা। 

এদিন দুপুরে রাজধানীতে এক আলোচনা সভায় সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, মেহনতি মানুষের দুঃখ-দুর্দশা বিবেচনা করে এবং বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি ও দ্রব্যমূল্যের কথা চিন্তা করে সিটি এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা চালু রাখার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এদিকে গত রোববার পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের হামলা, ভাঙচুর ও পুলিশ বক্সে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ৪টি মামলায় ২ হাজার ৭০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এসব মামলায় ৪২ জনকে গ্রেফতার দেখিয়ে সোমবার দুপুরে আদালতের মাধ্যমে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, এ আন্দোলনের নেপথ্যে আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী নেতারাই জড়িত। পেছন থেকে চালকদের উসকানিও দিয়ে যাচ্ছিলেন তারাই। কারণ অটোরিকশা বন্ধ হলে চাঁদাবাজিও বন্ধ হবে। এসব কারণে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালকদের মাঠে নামিয়ে ফায়দা লুটছেন রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা।

একটি সূত্র জানায়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের যুবলীগের একজন শীর্ষ নেতা অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন। মিরপুর ও কালশীতে নিয়ন্ত্রণ করছেন একজন শীর্ষ সন্ত্রাসী ও আরেক আওয়ামী লীগ নেতা। এ ছাড়াও উত্তরায় নিয়ন্ত্রণ করছেন আওয়ামী লীগের কয়েকজন কাউন্সিলর। 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চাঁদার ভাগ চলে যায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের কাছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ‘আল্লাহ ভরসা’, ‘খোদা হাফেজ’, ‘খাজা বাবা’ কিংবা ‘বিসমিল্লাহ’ ব্যানার ছাড়াও রিকশাচালকদের কাছে দেওয়া হয় লাল-নীলসহ হরেক রকম কার্ড। কার্ডগুলো লেমিনেশন করে চালকদের হাতে দেওয়া হয়। যাতে ট্রাফিক পুলিশ বা থানা পুলিশকে দেখালেই বুঝতে পারে সেটি ওই এলাকার নিয়ন্ত্রকের নিয়ন্ত্রিত নেতার অটোরিকশা। এরপর রিকশা ছেড়ে দেওয়া হয়। আবার কোনো কোনো সময় পুলিশ বুঝতে না পারলে নিয়ন্ত্রককে ফোন দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ছেড়ে দিতে হয় অটোরিকশাটি।

গতকাল সকাল ৯টা ২০ মিনিট থেকে ১০টা ২০ মিনিট পর্যন্ত রাজধানীর রামপুরা এলাকায় মূল সড়কে নেমে বিক্ষোভ করে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালকরা। রামপুরা বেটার লাইফ হাসপাতাল ও আবুল হোটেলের সামনে জড়ো হয়ে প্রায় আড়াইশ চালক সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলতে দেওয়ার দাবিতে এ বিক্ষোভ করে। বিক্ষোভ থেকে তারা সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর বিরুদ্ধে নানা স্লোগান দেয়। এ সময় রাস্তায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। পরে অবশ্য পুলিশের আশ্বাসে চালকরা রাস্তা ছেড়ে চলে গেলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

আবুল হোটেলের সামনে বিক্ষোভরত চালকরা অভিযোগ করে, আমরা রিকশা নিয়ে রাস্তায় বের হতে পারি না। পুলিশ ধরে, টাকা নেয় আবার মাঝেমধ্যে ব্যাটারি খুলে রাখে, রিকশা ভেঙে দেয়। এ জন্য আমরা মূল সড়কে উঠি না। ভেতরের রাস্তা বা গলিতে রিকশা চালাই। এখন পুলিশ গলিতে গিয়েও রিকশা ধরে। আমরা তা হলে কীভাবে চলব। এভাবে তো জীবন চলে না। এটির একটা বিহিত হওয়া দরকার। এ সময় সমবেত অন্য চালকরা সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরকে উদ্দেশ্য করে ভুয়া ভুয়া স্লোগান দিতে থাকে।

প্রায় একই সময়ে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় বিক্ষোভ করে চালকরা। সকালে কয়েকজন ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতাকর্মীকে লাঠিসোটা নিয়ে জড়ো হতে দেখেছেন স্থানীয়রা। তাদের দেখে অনেকে প্রশ্ন তোলেন, অটোরিকশা চালকদের বিক্ষোভে ওই নেতারা কেন?

এ প্রসঙ্গে জাতীয় রিকশা ও ভ্যানচালক সমিতির কোষাধ্যক্ষ মো. ওবায়দুল ইসলাম সময়ের আলোকে বলেন, আমাদের দাবি, আমাদের বৈধ করে সরকার রাজস্ব আদায় করুক। রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও পুলিশের চাঁদাবাজি বন্ধ করা, অযথা রিকশা আটকে ব্যাটারি খুলে ফেলা এবং আটক করে থানায় নেওয়া থেকে বিরত থাকার জন্য সরকারের প্রতি অনুরোধ জানাই। তবে কোথায় কীভাবে অটোরিকশা চলবে সে বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে জানিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) ড. খ. মহিদ উদ্দিন বলেন, সরকারের সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। আমরা এখনও সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা পাইনি। তবে মূল সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল বন্ধ থাকবে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনার পর আমরা ব্যবস্থা নেব। তখন দেখব কোথায় চলবে কোথায় চলবে না।

সময়ের আলো/জিকে


Loading...
Loading...
রাজধানী- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: