শুক্রবার বেলা ৩টা, আষাঢ়ের আকাশ মেঘাচ্ছন্ন, রোদের তেমন উত্তাপ নেই, ছুটির দিনে এমন আবহাওয়ায় মিরপুর বোটানিক্যাল গার্ডেনের সামনে দর্শনার্থীদের তেমন কোনো ভিড় নেই। টিকেট কাউন্টারে টিকেট কেটে এক-দুইজন দর্শনার্থী জাতীয় উদ্যানে প্রবেশ করছেন। ভেতরে প্রবেশ করার পরও দেখা গেল উদ্যানে দর্শনার্থীদের আগের মতো আনাগোনা নেই। ‘ঢাকার অক্সিজেন ভান্ডার’খ্যাত এই বোটানিক্যাল গার্ডেন ছুটির দিনে যেখানে হাজার হাজার দর্শনার্থীর পদচারণে মুখর হতো, সেখানে এখন চারদিকে সুনসান নীরবতা। শুক্রবার সরেজমিন উদ্যান ঘুরে দেখা যায় এমন চিত্র।
উদ্যানের ভেতরে প্রবেশ করেই সবসময় দর্শনার্থীরা গোলাপ ফুলের বাগানে ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। আর শুক্রবার হলে তো কথাই নেই, কিন্তু সেই গোলাপের বাগানে কোনো দর্শনার্থীই নেই। বাগানে আধা ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকার পর একটু সামনে গিয়ে দেখা মিলল দুই দর্শনার্থীর। উদ্যান নিয়ে কথা বলতেই দর্শনার্থী রাকিব হাসান সময়ের আলোকে বলেন, উদ্যানে আগে টিকেটের প্রবেশ মূল্য ছিল ২০ টাকা, এখান ১০০ টাকা। এটি একটি জাতীয় উদ্যান এখানে মানুষ গাছপালা, পাখি ও প্রাকৃতিক পরিবেশে বায়ু সেবন করতে আসে। সাধারণ মানুষের জন্য সেই সুযোগটিও শেষ হয়ে যাচ্ছে।
উদ্যানের লেকপাড়ে স্ত্রী ও ছেলেমেয়েসহ ঘুরছেন রুহান খান। বাচ্চারা বাবা-মায়ের সঙ্গে প্রাকৃতিক পরিবেশে নিজেদের মনমতো দৌড়াদৌড়ি করছে, ছেলেমেয়েদের হাসিমাখা মুখ দেখে তারাও অনেক খুশি।
তিনি সময়ের আলোকে বলেন, ঢাকা শহরে তেমন খোলামেলা জায়গা নেই। একটু খোলামেলা জায়গার জন্য ছেলেমেয়েদের সঙ্গে নিয়ে এই উদ্যানে আসি। কিন্তু এখান আর আগের মতো আসা হবে না। ২০ টাকার টিকেট এখন ১০০ টাকা করা হয়েছে। এটি আমাদের মতো মানুষের জন্য খুবই কষ্টকর।
রুহান খানের কষ্টের কথার সঙ্গে মিল পাওয়া গেল এই উদ্যানে ওজন মেপে সংসার চালানো জাহানারার কথায়। দীর্ঘ ১০ বছর ধরে এই উদ্যানে ওজন মাপা মেশিন দিয়ে দর্শনার্থীদের ওজন মাপেন তিনি। সে টাকা দিয়েই চলে তার সংসার।
তিনি সময়ের আলোকে বলেন, টিকেটের দাম বাড়ায় আজকে ছুটির দিনেও তেমন কোনো দর্শনার্থী নেই, টিকেটের দাম না কমালে এখানে আগের মতো দর্শনার্থী আসবে না।
সম্প্রতি বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ওয়ারীর বলধা গার্ডেনের প্রবেশ ফি ১০০ টাকা নির্ধারণ করে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে বন, পরিবেশ ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের জলবায়ু বন অধিশাখা-১। গত বৃহস্পতিবার নতুন ফি কার্যকর হওয়ার পর থেকেই উদ্যানে দর্শনার্থীর সংখ্যা অনেক কমে গেছে। ফি বাড়ানোর পর প্রথমবার উদ্যানে এসেছেন লামিয়া আক্তার। তিনি সময়ের আলোকে বলেন, এটি জাতীয় উদ্যান, যেখানে কোনো ফি নেওয়াই উচিত নয়, সেখানে ২০ টাকার টিকেটের মূল্য ১০০ টাকা করা হয়েছে। এটি একদমই ঠিক হয়নি। গাছপালা দেখার জন্য, একটু হাঁটহাঁটি করার জন্য ১০০ টাকা ফি দিয়ে আর কখনো এখানে আসব না।
বোটানিক্যাল গার্ডেনের পাশেই জাতীয় চিড়িয়াখানা যেখানে প্রবেশ ফি মাত্র ৫০ টাকা। পশুর খাদ্য কেনাসহ তাদের দেখভালের জন্য এমন ফি নিয়ে কোনো দর্শনার্থী কখনো প্রশ্ন তোলেনি। কিন্তু উদ্যানের প্রবেশ ফি ১০০ টাকা করায় দর্শনার্থীদের ক্ষোভ বিরাজ করছে। উদ্যানে আসা জান্নাত আক্তার সময়ের আলোকে বলেন, চিড়িয়াখানার পশু-পাখির খাবার দিতে হয়, সেখানে মাত্র ৫০ টাকা টিকেট। আর এখানে চারদিকে বাগান গাছপালা- এর জন্য কেন ১০০ টাকা ফি দিতে হবে। সব জিনিসের দাম বাড়ার কথা ভাবলে এখানে ২০ টাকার জায়গায় ৩০ টাকা রাখতে পারত। একলাফে ১০০ টাকা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাসুমা সুলতানা রিফা বলেন, কনক্রিটের শহরে একটু আলো বাতাসের জন্য সবাই এখানে আসে। ১০০ টাকা টিকেটের মূল্য করায় সাধারণ মানুষ এখানে আর নিয়মিত আসতে পারবে না।
বোটানিক্যাল গার্ডেনের পাশেই পরিবার নিয়ে থাকেন হাবিবুর রহমান। ছুটির দিনে পরিবারের সদস্য নিয়ে এসেছেন তিনি। উদ্যানের প্রবেশ ফি বাড়ানো নিয়ে তিনি সময়ের আলোকে বলেন, ১০০ টাকা দিয়ে টিকেট কেটে প্রেমিক-প্রেমিকা ছাড়া কেউ এখানে আসবে না, সাধারণ মানুষ কম থাকায় অসামাজিক কার্যকলাপও বেড়ে যাবে। বাগানে চুরি করে গাছপালা কাটলেও কেউ দেখবে না। দর্শনার্থী না থাকলে এর সৌন্দর্যও থাকবে না।
বোটানিক্যাল গার্ডেনের টিকেট কাউন্টারে প্রায় ৮ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন ইদ্রিস খান। তিনি সময়ের আলোকে বলেন, ছুটির দিনে আগে আমরা দুইজন মিলে টিকেট দেওয়ার সময়ই পেতাম না। এখন একজনে টিকেট দিচ্ছি। টিকেটের দাম বাড়ানোর ফলে ছুটির দিনেও তেমন কোনো দর্শনার্থী নেই। টিকেটের দাম ১০০ টাকা শুনে অনেকেই উদ্যানে প্রবেশ না করে ফিরে যাচ্ছেন। ফি না কমালে দর্শনার্থী বাড়বে না বলেও জানান তিনি।
সময়ের আলো/আরএস/