রাজধানীর পরিবাগ থেকে মায়ের সঙ্গে পান্থপথের দৃক গ্যালারিতে শেখ হাসিনার কার্টুন দেখতে এসেছে পাঁচ বছর বয়সি ছোট্ট সামিহা। গ্যালারিতে প্রবেশ করেই দেয়ালে আঁকা কার্টুনগুলো দেখছে সামিহা। তার মতোই বাবার সঙ্গে মোহাম্মদপুর থেকে দৃক গ্যালারিতে ‘কার্টুন বিদ্রোহ’ প্রদর্শনী দেখতে এসেছে আবদুল্লাহ। গ্যালারিতে থাকা শেখ হাসিনার একটি কার্টুনে আঁকা প্রতিকৃতির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন বাবা ও ছেলে। এই কার্টুনে বাধা রয়েছে বেশ কয়েকটি রশি। এই রশি ধরেই সবাই শেখ হাসিনার কার্টুনের সঙ্গে ছবি তুলছেন। কেউ কেউ বলছেন সত্যজিৎ রায়ের বিখ্যাত ছবি হীরক রাজার দেশের সেই জনপ্রিয় সংলাপ ‘দড়ি ধরে মারো টান, রাজা হবে খান খান’। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর পান্থপথের দৃক গ্যালারিতে কার্টুনে বিদ্রোহ শিরোনামে কার্টুন প্রদর্শনীতে দেখা যায় এমন চিত্র।
গ্যালারিতে থাকা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নানা ধরনের আর্টওয়ার্ক দেখলে যে কারোরই চোখ আটকে যাবে। এই প্রদর্শনীতে প্রায় সাড়ে ৩০০ কার্টুন রয়েছে। যেখানে সবচেয়ে বড় কার্টুন শেখ হাসিনার। এসব কার্টুনের বিষয়বস্তু বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে ঘটে যাওয়া ঘটনার প্রতিচ্ছবি।
দুই মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে কার্টুন প্রদর্শনীতে এসেছেন সুমাইয়া আক্তার। প্রদর্শনী নিয়ে তিনি সময়ের আলোকে বলেন, কার্টুনগুলো দেখে অনেক ভালো লাগছে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় যে ঘটনাগুলো ঘটেছে কার্টুনের মাধ্যমে এখানে সেই বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। স্বৈরাচার হাসিনার পুলিশ বাহিনী কতটা নির্মমভাবে ছাত্র-জনতাকে হত্যা করেছে এই কার্টুনগুলো দেখে বাচ্চারা বুঝতে পারছে। এটি নতুন প্রজন্মের জন্য একটি ইতিহাস।
শেখ হাসিনা সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে কার্টুন যে শক্তিশালী ভূমিকা রেখেছিল, তা গত এক মাসে খুব ভালোভাবে অনুধাবন করতে পেরেছে সাধারণ মানুষ। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে অবস্থান করছিলেন নাহিদ ইসলাম। শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পরপরই দেশে ফিরেছেন তিনি। প্রদর্শনীর কার্টুনগুলো দেখে তিনি সময়ের আলোকে বলেন, আন্দোলনের সময় এসব কার্টুন আমরা বিদেশ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখেছি। এসব কার্টুনের মাধ্যমে আন্দোলনের গতি সঞ্চারিত হয়েছে। ছাত্র-জনতার ওপর স্বৈরাচারের নির্যাতন ও তার পতনের ইতিহাস জানার জন্য এই প্রদর্শনী অনেক গুরুত্ব বহন করে। এটি বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের নতুন ইতিহাস।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর থেকে আসা জাহিদ হাসান সময়ের আলোকে বলেন, যারা এই ছাত্র আন্দোলন দেখেনি তারা এই কার্টুনের প্রদর্শনী দেখলে সহজেই সেই সময় কী ঘটেছিল সেটি বুঝতে পারবে। এই কার্টুনগুলোর মাধ্যমে ছাত্ররা দেশের জন্য যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন সেটি তুলে ধরার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মীরা তাদের শিল্পের মাধ্যমে স্বৈরাচার হাসিনার পতনের চিত্র তুলে ধরেছেন।
বাংলাদেশে ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক কার্টুনের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। একসময় দেশের সংবাদপত্রগুলোয় নিয়মিত কার্টুন ছাপা হতো। তবে পাঠক আগ্রহের কেন্দ্রে থাকা থাকার পরও রাজনৈতিক কারণে একটা সময় কার্টুন ছাপা প্রায় বন্ধ হয়ে যায় সংবাদপত্রে। তবে দৃক গ্যালারির এমন প্রদর্শনীতে প্রাণ ফিরে পেয়েছেন কার্টুনিস্টরা। দৃক গ্যালারিতে কার্টুন আঁকা কার্টুনিস্ট আহসান হাবীব সময়ের আলোকে বলেন, এই কার্টুন আমাদের ভেতরে থাকা স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে। এখন যখন সবকিছু নতুন করে শুরু হয়েছে তাই আবার নতুন করে সবাই কার্টুন আঁকবে।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময়কার কার্টুন দেখার প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহের কারণে ১৬ আগস্টে শুরু হওয়া এই প্রদর্শনীর সময় বাড়ানো হয়েছে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। দৃক গ্যালারির কিউরেটর রেজাউর রহমান সময়ের আলোকে বলেন, প্রতিদিন বেলা ৩টার পর থেকে রাত ৮ পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষ দৃক গ্যালারিতে কার্টুন দেখতে আসছে। এগুলো দেখে এখানে থাকা ডায়েরিতে তাদের অনুভূতি প্রকাশ করছে।
সময়ের আলো/আরএস/