রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) পোষ্য কোটা বাতিলসহ তিন দফা দাবিতে প্রশাসন ভবনে তালা দিয়ে সকাল ১০টা থেকে আন্দোলন করছেন শিক্ষার্থীরা। ফলে প্রশাসন ভবনে দুই উপ-উপাচার্যসহ শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী ৮ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছেন। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত (সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা) দাবিতে অনড় রয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
আন্দোলনকারীদের অন্য দুইটি দাবি হলো- ফ্যাসিস্ট শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিচারের আওতায় আনা এবং দুইজন ফ্যাসিবাদী শিক্ষককে সহকারী প্রক্টর নিয়োগ দেওয়ার জন্য উপাচার্য ও রেজিস্ট্রারকে উন্মুক্ত স্থানে কারণ দর্শানো। এছাড়া সম্পূরক একটি দাবি হলো- ভর্তি পরীক্ষার আবেদন ফি কমানো।
এদিকে পোষ্য কোটা আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একাংশের পাশাপাশি বহিরাগত শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি দেখা গেছে। তাদের উপস্থিতি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে আন্দোলনে সালাহউদ্দিন আম্মার ছাড়া অন্য সমন্বয়কদের না থাকা নিয়েও সৃষ্টি হয়েছে গুঞ্জন।
সরেজমিনে দেখা যায়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, রাবির ১৭ জন সমন্বয়ক ও সহ-সমন্বয়কের মধ্যে শুধু সালাহউদ্দিন আম্মার একাই আন্দোলনকারীদের সাথে রয়েছেন। আন্দোলনে অংশ নেওয়া একাংশ রাজশাহী মহানগরের বিভিন্ন স্কুলকলেজের শিক্ষার্থী। ফলে বহিরাগত শিক্ষার্থীদের নিয়ে আন্দোলন করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশ। আবার বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবেও দেখছেন কেউ কেউ।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কামরুজ্জামান কলেজের ইন্টারমিডিয়েটের শিক্ষার্থী মিফতাহুল জান্নাত বিভা, বারিন্দ মেডিকেল কলেজের মাহফুজা রাহাত, বেলপুকুর কলেজের সুস্মিতা, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্মী, আদর্শ অনার্স ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী মো. শুভ্র ও রাজশাহী সিটি কলেজের শিক্ষার্থী সুমাইয়া তাসনিমসহ প্রায় ৩০ জন বহিরাগত শিক্ষার্থী এ আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন, পোষ্য কোটা আসলেই থাকা উচিত না। কিন্তু এইভাবে আন্দোলন চলমান রাখলে আমাদের সেশন জট আরও বাড়বে। আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কতজন যোগদান করেছে? বহিরাগত শিক্ষার্থীদের নিয়ে আন্দোলন চলমান যৌক্তিকতা নিয়ে আমরা সন্দিহান। সালাউদ্দিন আম্মার একাই নেতৃত্ব দিচ্ছে এই আন্দোলনের। এখানে অন্যান্য সমন্বয়করাও নেই।
তবে এ বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করতে রাজি হননি অন্য সমন্বয়কেরা।
বহিরাগতদের অংশ নেয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে আরবি বিভাগের শিক্ষার্থী রমজান-উল ইসলাম বলেন, কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দাবির ক্ষেত্রে শুধু প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাই অংশগ্রহণ করতে পারে। বহিরাগত কেউ এসে হঠাৎ করে প্রশাসন ভবনের তালা দিবে এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
শিক্ষার্থীদের আরেকটি অংশ বলছেন, কয়েকদিন ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকলে খুব বেশি সমস্যা হবে না। কিন্তু এই পোষ্য কোটা নামক বিষফোঁড়ার বাতিল চাই।
আন্দোলনে অংশ নিয়ে বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী উর্মি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সন্তানরা পোষ্য কোটা পেয়ে স্বল্প মার্কস পেয়েও ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে, যেটি আমরা পাইনি। আমাদের ছোট-ভাইবোনদের সাথে এই বৈষম্য যেন না হয়, সেই দাবি নিয়ে আমি এসেছি।
বহিরাগত শিক্ষার্থীদের বিষয়ে জানতে চাইলে আন্দোলনের সমন্বয়কারী ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, রাবির অন্যতম সহ-সমন্বয়ক সালাউদ্দিন আম্মার বলেন, এখানে অবস্থানরত বহিরাগত শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই ভর্তি পরীক্ষার্থী এবং যারা এর বাইরের আছেন, তারা নিজেদের ছোট ভাই-বোনদের জন্য পোষ্য কোটা না রাখার ও ভর্তি ফি কমানোর দাবিতে সংহতি জানাতে এসেছেন।
অবরুদ্ধ অবস্থায় বিকেলে রাবির উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফরিদ উদ্দীন খান তার ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘তাপসী রাবেয়া হলের একজন নারী কর্মকর্তা দাফতরিক কাজে প্রশাসনিক ভবনে এসে আটকে গেছেন। খবর এসেছে তার বৃদ্ধা মা সংকটাপন্ন অবস্থায়। তাকে বের হতে দেয়া হচ্ছে না। একজন ডায়াবেটিক রোগীর খাবার ঢুকতে দেয়নি। আমি সালাহউদ্দিন আম্মারকে উক্ত কর্মকর্তাকে বের হতে দেবার অনুরোধ করলে সে বের হতে দিবে না বলে ফোন রেখে দিয়েছে। আমি এই ধরনের অমানবিক আচরণ থেকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বিরত থাকার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি। অন্যের নাগরিক অধিকার খর্ব করে কোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলন কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।’
উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীব বলেন, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে আমরা অনেক উদ্বিগ্ন রয়েছি। অনেকটা চেষ্টা করে কোটার পার্সেন্টেজ কমিয়ে নিয়ে এসেছি। তবে সেটা শুধু এ বছরের জন্য। আগামী বছর থেকে তাদের বেতন স্কিল যদি বাড়ে তাহলে এই কোটা পুরোপুরি বাতিল হবে বলে মনে করছি। আমরা মনে করছি, একটি সমাধানের পথে চলে এসেছিলাম। কিন্তু শিক্ষার্থীরা কেন যে এমনটা করছে আমার বোধগম্য নয়।
সময়ের আলো/আরআই