সাহিত্যের আলোকধারায় লিটল ম্যাগাজিন

বিমল গুহ

সাহিত্য

‘লিটল ম্যাগাজিন’ বলতে আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটি চিত্র- লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশের তাগিদ; নবীনদের প্রকাশনা। আত্মপ্রকাশের তাগিদে নবীন লিখিয়েদের

2025-01-24T08:45:27+00:00
2025-01-24T08:45:27+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬,
৪ আষাঢ় ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬
সাহিত্য
সাহিত্যের আলোকধারায় লিটল ম্যাগাজিন
বিমল গুহ
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০২৫, ৮:৪৫ এএম   (ভিজিট : ৪৮৭)
সাহিত্যের আলোকধারায় লিটল ম্যাগাজিন
‘লিটল ম্যাগাজিন’ বলতে আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটি চিত্র- লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশের তাগিদ; নবীনদের প্রকাশনা। আত্মপ্রকাশের তাগিদে নবীন লিখিয়েদের দেয়াল পত্রিকার প্রকাশও একটা পদক্ষেপ। এ রকম অভিজ্ঞতাও কম-বেশি আমাদের অনেকের আছে। এটি এক ধরনের নেশা; লেখক হওয়ার নেশা! তা একসময় আবার স্থিমিত হয়েও পড়ে। এ জাতীয় প্রকাশনার বিড়ম্বনার কথাও আমাদের বলেছেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামানÑ ‘একসময় হাতে লেখা পত্রিকার খুব চল ছিল। পাড়ার কিছু কিশোর, হয়তো যুবকও দুয়েকজন হাতে লেখা কাগজ প্রকাশ করত।...ওদিকে পাড়ার সাহিত্যযশঃপ্রার্থীরা সেই কাগজে লিখতে আগ্রহ প্রকাশ করতেন। 

লেখকের চেয়ে কমবয়সি সম্পাদক লেখা অমনোনীত করলে শোকাবহ পরিস্থিতির সূচনা হতো।’ এটাই এ-জাতীয় প্রকাশনার বৈশিষ্ট্য বলা যেতে পারে! তবে লিটল ম্যাগাজিন আরেক ধাপ এগোনো। আত্মগত তাগিদের পাশাপাশি নতুনের বার্তাবাহী প্রকাশনা এটি। এতে সংস্কার-মুক্তির চেষ্টা থাকে, নতুন চিন্তার প্রকাশ থাকে।

এই লিটল ম্যাগাজিন কথাটিই চালু হয়েছে এর প্রকাশগত বৈশিষ্ট্যের জন্য। প্রথম মহাযুদ্ধ-পরিস্থিতির সময়ে ১৯১২ সালে শিকাগোর লিটল থিয়েটার আন্দোলন হয়েছিল। সেই থেকে লিটল ম্যাগাজিন শব্দের ব্যবহার শুরু হয় বলে ধারণা করা হয়। প্রথম মহাযুদ্ধের কালে ১৯১৪ সালে অর্থাৎ বিংশ শতাব্দীর শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে মার্গারেট এন্ডারসন ‘লিটল রিভিউ’ বলে একটা সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা ও প্রকাশ করেছিলেন। কবি এজরা পাউন্ড এ কাজে তাকে প্রভূত সহায়তা করেছিলেন। এ থেকেই ব্যবহারে আসে লিটল ম্যাগাজিন শব্দটি।

‘ম্যাগাজিন‘ শব্দটাই সাহিত্যে প্রবেশ করেছে সংগৃহীত বিষয়ের সমন্বিত প্রকাশের ধারণা থেকে। মূল শব্দটি এসেছে সৈনিকদের ব্যবহৃত অস্ত্রভান্ডার ম্যাগাজিন থেকে। যেমন, গানপাউডার ম্যাগাজিন, ফায়ার আর্মস ম্যাগাজিন ইত্যাদি। শব্দটি ফরাসি; এর অর্থ ও সংগ্রহশালা। বিভিন্ন বিষয়ের আয়োজনে প্রকাশনার কারণে শব্দটি সাহিত্যে ব্যবহার শুরু হয়েছে। প্রথম ব্যবহার করেন এডওয়ার্ড কেভ। তিনি ১৭৩১ সালে লন্ডন থেকে ‘দি জেন্টালম্যানস ম্যাগাজিন‘ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ করেন। প্রকাশ করেছিলেন ‘সিলভেনাস আর্বান’ ছদ্মনামে। সাহিত্যে ম্যাগাজিন মানে সাময়িকী। পরে এ থেকে চালু হয় লিটল ম্যাগাজিন। লিটল ম্যাগাজিন বলতে সাহিত্যযশঃপ্রার্থী তরুণদের সাহিত্য উদ্যোগকে বুঝি আমরা। তাদের অফুরন্ত উৎসাহ ও অক্লান্ত শ্রমের ফসল। এতে নতুনদের আবেগতাড়িত কাঁচা লেখার সমারোহ যেমন থাকে; তেমনি কখনো আবার নানা নিরীক্ষা প্রবণতাও লক্ষ্যযোগ্য হয়ে ওঠে বিশেষ মতাদর্শে দীক্ষিত চিন্তার কিংবা আত্মসমর্থিত মতামত প্রকাশের তাগিদ থেকে। এই তাগিদ প্রথাগত নয়, কিংবা পুকুর বা দীঘির মতো আবদ্ধ জলাশয় নয়। তা নদীর মতো চলিষ্ণুÑগতিমান। এখানেই এর বৈশিষ্ট্য বেশি বর্তায়। তবে সীমিত পুঁজির কারণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে লিটল ম্যাগাজিনের আয়ুূষ্কাল হয় সীমিত। এটাও তার রূপ।

আমরা জানি, প্রাতিষ্ঠানিক কাগজে শুরুতে সবাই প্রবেশাধিকার হয় না। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের আদর্শের সঙ্গে অমিল হলেও তাতে অন্তর্ভুক্তির সুযোগ সীমিত হয়। আবার মানসম্মত বা রুচিসম্মত লেখা না হলেও বড় কাগজে প্রবেশাধিকার মেলে না। কেউ তো শুরুতেই বড় লেখক হয়ে জন্মগ্রহণ করে না। কৈশোর-তারুণ্যের দিন পার করে পরিণত পর্যায়ে আসতে কিছুটা সময় লাগে। কিন্তু লেখকের তো চায় আত্মপ্রকাশের সুযোগ। এই বাসনাকে অবদমনের সাধ্য কার! চাইÑনিজস্ব বা গোষ্ঠীভুক্ত প্রকাশ-মাধ্যম। তাই একজন লেখকের জীবনে লিটল ম্যাগাজিনের ভূমিকাকে ছোট্ট করে দেখার সুযোগ নেই। এ কথাও সত্যি যে, বিশেষ ক্ষেত্রে দুয়েকজন শক্তিশালী তরুণও সাহিত্যে প্রবেশ করেন। তাদের কেউ বড় কাগজে অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠানিক ম্যাগাজিন বা দৈনিকের সাহিত্য পাতায় স্থান করে নিতেও পারেন। এই দুয়েকজনকে দিয়ে তো আর সামগ্রিককে বিবেচনা করা যাবে না!

সঠিকভাবে চর্চা করলে অনেকের মেধার ফসল সমাজকে-জাতিকে-দেশকে অনেক কিছু দিতে পারে। যেকোনো ধরনের মেধাচর্চার ক্ষেত্রে আগে চাই, প্রকাশের আনন্দ। 

যারা সাহিত্যচর্চা করেন, তাদের অনেকের ক্ষেত্রে লিটল ম্যাগাজিন গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ-মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। গ্রামে থাকতে স্কুলপড়ুয়া আমরা কয়েকজন ‘পল্লীশ্রী’ নামে একটি কাগজ হঠাৎ করেই বের করে ফেলেছিলাম। কী চেষ্টা, কী আনন্দ তখন! রাত জেগে লেখা মুসাবিদা করা, আবার সকালে উঠে বাড়ি থেকে অনেক দূরে প্রেসে ছোটা, কী অভিযান! এমনকি তার কভার ডিজাইনও করেছিলাম আমি নিজে। তাও মনে হয়েছিল সেরা কভার। নিজের সৃষ্টির তৃপ্তি তেমনি হয়। 

নিজের রচনা ভালো হোক আর মন্দ হোক; তা যে তৈরি হলো, তার মুগ্ধতাবোধ রচয়িতাকে আপ্লুত করে রাখে। এই বিবেচনায় শক্তিশালী হোক, আর কম শক্তিশালী হোক, যেকোনো তরুণ আত্মপ্রকাশের অনুভব থেকে প্রকাশ করেন লিটল ম্যাগাজিন। আমরা অনেকে এর বাংলা প্রতিশব্দ করেছি, ‘ছোট কাগজ’। ছোট কাগজ আকারে ছোট, নিরীক্ষাপ্রবণ, নতুন ভাবনার ধারক, প্রচলিত সংস্কার মুক্তির চেষ্টা ইত্যাদি ইত্যাদি। স্থায়িত্বও ছোট অর্থাৎ ক্ষণস্থায়ী।

বাংলা সাহিত্যে লিটল ম্যাগাজিনের সূচনা হয় রবীন্দ্র যুগে, নতুনত্বের দাবি নিয়ে। প্রমথ চৌধুরী সম্পাদিত ‘সবুজপত্র’ ১৯১৪ সালে প্রথম লিটল ম্যাগাজিনের চরিত্র নিয়ে আবির্ভূত হয়। গতানুগতিক ধারার বিপরীতে নতুন চিন্তা-চেতনার ধারক হিসেবে ‘সবুজপত্র’-এর ভূমিকা সাহিত্যের ইতিহাসে নিশান উড়িয়ে আছে। পরে প্রকাশিত হয় ‘কল্লোল’ ১৯২৩ সালে। চলেছিল ১৯৩৫ পর্যন্ত। তাও বলা যায়, অনেক দিন।

বাংলাদেশ ভূখন্ডে ১৯৪৭-পরবর্তী সাহিত্যসেবীদের স্বকীয় চিন্তা প্রকাশের প্রণোদনা যুগিয়েছে দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য-সাময়িকীর সঙ্গে রুচির ভিন্নতা থেকে। উৎসাহী সাহিত্যকর্মীরা তাই লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশে এগিয়ে এসেছিলেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চট্টগ্রাম থেকে ১৯৪৮ সালে মাহবুব-উল আলম চৌধুরী ও সুচরিত চৌধুরী সম্পাদিত ‘মুক্তি’ লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশের পথিকৃৎ হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে। ব্রিটিশ শাসন থেকে সদ্য মুক্ত স্বাধীনতা উত্তরকালে তারুণ্যের নতুন উদ্যম সাহিত্য ক্ষেত্রকে নতুন চেতনায় প্রাণিত করেছে। কিছু সাহিত্য পত্রিকা তখন থেকে প্রকাশিত হতে শুরু করে। লিটল ম্যাগাজিন বা ছোট কাগজ প্রকাশের ধারাটি অব্যাহত আছে। তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য থেকে এগুলোকে আলাদা করে দেখা যাবে না। কবি কায়সুল হক বলেছেন, ‘আমাদের এখানে পঞ্চাশের দশকের গোড়ার দিকেই শুরু হয় লিটল ম্যাগাজিনের অভিযাত্রা। 

আমাদের লেখকদের রুচিশীল পত্রিকার অভাবে প্রধান আশ্রয়স্থল তথা পৃষ্ঠপোষক হয়ে দাঁড়ায় দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য-ক্রোড়পত্র। কিন্তু এখানেও বিপত্তি ঘটে, একে তো স্বল্পপরিসর, বড় পত্রিকার যে চরিত্র তার কোনো হেরফের নেই এখানে। লেখকের স্বাধীনতা খর্ব করা এদের প্রধান ব্রত।’

পরবর্তীতে এ অঞ্চলে বিভিন্ন সময়ে প্রচুর ছোট কাগজ প্রকাশিত হয়েছে। সাহিত্যের আলোকধারায় এর ভূমিকাও রয়েছে আমাদের সাহিত্যে। নমুনাস্বরূপ উল্লেখকৃত কিছু নাম থেকে এটি বোঝা যাবে। পঞ্চাশের দশকের প্রকাশিত, পরিচিতি, যাত্রিক, স্পন্দন, কবিকণ্ঠ। কিংবা ষাটের দশকের, পূর্বমেঘ, নাগরিক, স্বদেশ, কণ্ঠস্বর, কিছুধ্বনি, বিপ্রতীক। সত্তরের, সাম্প্রতিক, গণসাহিত্য, যুবরাজ, জনান্তিক, অতলান্তিক, কবি, ঈষিকা, অঙ্কুর, বিন্দুপাত, অচিরা। আশির দশকের, সময়, লোকায়ত, জীবনানন্দ, মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা, সমালোচনা, একবিংশ, শালুক। নব্বইয়ের দশক ও তৎপরবর্তী সময়ের নতুন দিগন্ত, অমিত্রাক্ষর, বার্ণিক, নান্দীপাঠ, কালধারা, উলুখাগড়া, আবহমান, লিরিক, বৈঠা, শিল্প ও সাহিত্য, খেয়া, সম্প্রীতি, কাদাখোঁচা, নতুন সাহিত্য প্রভৃতি। এসব কাগজে প্রবন্ধ, কবিতা, ছোটগল্প তো ছিলই; আরও ছিল সংগীত, চলচ্চিত্র, নাট্যকলা, স্মৃতিকথা, দর্শন, শিক্ষা, রাজনীতি, অনুবাদ ইত্যাদি যাবতীয় বিষয়। এর কোনোটা ঋতুভিত্তিক, কোনোটা বিষয়ভিত্তিক বিশেষ সংখ্যা হিসেবেও প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। এগুলোর মধ্যে হাতেগোনা কয়েকটি এখন টিকে আছে। সাহিত্য-সংস্কৃতির পরিম-লে এসব কাগজের অবশ্য অবশ্যই একটা ভূমিকা থাকবে সবসময়।



Loading...
Loading...
সাহিত্য- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: