প্রকাশ: শুক্রবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০২৫, ৮:৫২ এএম (ভিজিট : ১২৪২)
ছোটগল্প, অণুগল্প এবং ঝলকগল্প কথাসাহিত্যের একটি উজ্জ্বল ধারা ছোটগল্প। আকারে ছোট হলেই তাকে ছোটগল্প বলা যাবে না। ছোটগল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো বিন্দুতে সিন্ধুর বিশালতা। ছোটগল্পে উপন্যাসের বিস্তার থাকে না, থাকে ভাবের ব্যাপকতা। উপন্যাস পড়ে পাঠক তৃপ্তি লাভ করে, ছোটগল্পে পায় কোনো ভাবের ইঙ্গিত। ক্ষুদ্র কলেবরে নিগূঢ় সত্যের ব্যঞ্জনায়ই এর সার্থকতা।
ছোটগল্পের কয়েকটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর ক্ষুদ্র পরিসরের মাঝে বৃহতের ইঙ্গিত, এর আরম্ভ ও উপসংহার হয় নাটকীয়, এর বিষয়বস্তু সাধারণত স্থান, কাল ও ঘটনার ঐক্য মেনে চলে, এতে মানবজীবনের কোনো একটি বিশেষ মুহূর্ত, ভাব বা চরিত্রের একটি বিশেষ দিক উজ্জ্বল হয়, যেকোনো ধরনের বাহুল্য বর্জনের মাধ্যমে গল্প হয় রসঘন। এতে থাকে রূপক বা প্রতীকের মাধ্যমে অব্যক্ত কোনো বিষয়ের ইঙ্গিত।
সম্প্রতি বাংলা সাহিত্যে অণুগল্প নামে সাহিত্যের একটি ধারা প্রতিষ্ঠার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। বাংলাদেশ, পশ্চিমবাংলা, আসাম এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করা বাংলাভাষাভাষির
কথা সাহিত্যিকদের অণুগল্পচর্চা করতে দেখা যায়। এ দেশে বিভিন্ন দৈনিকের সাহিত্য পাতায় অণুগল্প প্রকাশিত হয়ে আসছে অনেক আগে থেকেই। তবে অদ্যাবধি কোথাও অণুগল্পের সুনির্দিষ্ট কোনো বৈশিষ্ট্য নির্ণীত হয়নি। এর সুনির্দিষ্ট কোনো সময় বা শব্দ পরিসর এখনও নির্ধারিত হয়নি। কোনো কোনো পত্রিকার সাহিত্য পাতায় অনধিক ৩০০ শব্দে অণুগল্প প্রকাশিত হয়। কোনো পত্রিকায় ৫০০ শব্দের অণুগল্পও প্রকাশিত হতে দেখা যায়। এতে অনুমিত হয় যে, পত্রিকার বিজ্ঞ সাহিত্য সম্পাদকগণ হয় ভালো মানের অণুগল্প পান না, নয় তো এ বিষয়ে ধোঁয়াশায় আছেন।
বনফুলের ‘নিমগাছ’ নামের গল্পটিই হতে পারে অণুগল্পের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। অণুগল্পের সময় তথা শব্দ পরিসর, ঝলক প্রসঙ্গ, সংক্ষিপ্ততা, শুরু ও শেষে নাটকীয়তা ইত্যাদি থাকা বাঞ্ছনীয়। অণুগল্পের সংক্ষিপ্ততা এবং ঝলক বিষয় বিবেচনায় গল্পের দাবির প্রেক্ষিতে সুনির্দিষ্ট সময় পরিসর তথা শব্দ পরিসর থাকা দরকার।
আমাদের আধুনিক সাহিত্য রচিত হয় পাশ্চাত্য সাহিত্যের ভাবধারায়। ইংরেজি তথা বিশ্ব সাহিত্যে ছোটগল্পের দুটি ধারা লক্ষ করা যায়। যথা ১. ছোটগল্প : ২০০১ শব্দ থেকে ১০ হাজার শব্দসীমা পর্যন্ত গল্প; ২. ঝলকগল্প : ৬ শব্দ থেকে ২ হাজার শব্দ পর্যন্ত। অন্যদিকে ঝলকগল্প হলো ছোটগল্প লেখার একটি রূপ যা সীমিত সংখ্যক শব্দের মধ্যে একটি পাঞ্চ প্যাক করে। এটি এমন একটি ধারা যা লেখকদের সংক্ষিপ্ত হতে চ্যালেঞ্জ করে, যা তাদের পাঠকদের কাছে একটি শক্তিশালী বার্তা বা আবেগ প্রকাশ করে। উপরন্তু ফ্ল্যাশ গল্প নতুন ধারণা তৈরি করতে বা লেখকের বৃত্তাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে একটি দুর্দান্ত উপায় হতে পারে। কারণ এই ধারার সংক্ষিপ্ততার চর্চার কিছু অন্বেষণের প্রেরণা দেয়। ছোটগল্পের যেমন আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে, তেমনি আছে ঝলকগল্পরও।
ঝলকগল্পের শিল্পরূপ সম্পর্কে বলা যায়, এর সৌন্দর্য গল্পের সংক্ষিপ্ততায়। যা লেখকদের বাধ্যতামূলকভাবে মাত্র কয়েকশ শব্দের মধ্যে একটি সম্পূর্ণ আখ্যান তৈরি করতে দেয়।
ঝলকগল্প ধারায় লেখার কৌশল বড় ভূমিকা পালন করে। পাঠকের সঙ্গে সংবেদনশীল সংযোগ তৈরি করার সময় লেখককে কেবল অপর্যাপ্ত শব্দ দিয়ে একটি সম্পূর্ণ গল্প বলতে সক্ষম হতে হবে। একটি অনন্য এবং চিত্তাকর্ষক গল্প নিয়ে আসার জন্য সৃজনশীল অনুপ্রেরণাও প্রয়োজন, যা পাঠককে ব্যস্ত রাখবে। গতিশীল ভুবনে যখন কথাসাহিত্য লেখার জন্য পর্যাপ্ত সময় নেই, তখন ঝলকগল্প চর্চার প্রচেষ্টায়, এ ধারার সৃজনশীলতায় অনেক দূর নিয়ে যাবে।
প্রথমত, গদ্যভাষা টাইট বা কমপেক্ট হওয়া উচিত। এর অর্থ প্যাসিভ ভয়েসের পরিবর্তে সক্রিয় ভয়েস ব্যবহার করা। অপ্রয়োজনীয় শব্দ, বিশেষ করে ক্রিয়াবিশেষণ ত্যাগ করা। পাঠকের মনে একটি ইমেজ তৈরি করতে পাওয়ার ক্রিয়া ব্যবহার করার দিকে মনোনিবেশ করা।
দুর্দান্ত ঝলক কল্পকাহিনিকেও ঠিক কার্যকরভাবে শুরু করতে হবে এবং যতটা সম্ভব অপ্রয়োজনীয় পটভূমির তথ্য মুছে ফেলতে হবে। প্রদত্ত কাঠামোর মধ্যে অর্থ পূরণ করতে পারে পাঠকের মনে এমন আস্থার জায়গা সৃষ্টি করতে হবে।
ঝলকগল্পে বিভিন্ন ধরনের সাহিত্যিক ডিভাইস অন্তর্ভুক্ত থাকবে। যেমন, চিত্রকল্প, প্রতীকবাদ, জুক্সটাপজিশন এবং রূপক। এই ডিভাইসগুলো পাঠককে গল্পে টানতে এবং মর্মস্পর্শিতা তৈরি করতে সহায়তা করে। জুক্সটাপজিশন হলো : তুলনা বা বৈসাদৃশ্য বা একটি আকর্ষণীয় প্রভাব তৈরি করার জন্য প্রায়শই দুই বা ততোধিক জিনিসকে পাশাপাশি রাখার একটি উদাহরণ।
আধুনিক বাংলাসাহিত্যে ফ্ল্যাস ফিকশনের ধারায় রবীন্দ্র-নজরুল-সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ-বনফুলসহ প্রতিষ্ঠিত অনেক গল্পকারই এই ধরার গল্প লিখেছেন। সম্প্রতি বাংলা ভাষায় অনেকেই ফ্ল্যাস ফিকশন লিখছেন। পত্রপত্রিকায় স্থানাভাবে যেসব অতি ছোট আকারের গল্প প্রকাশিত হচ্ছে, সেগুলোর অনেক গল্পই ফ্ল্যাশ ফিকশনের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ হচ্ছে।
মোজাফফর হোসেন রচিত ‘পাঠো বিশ্লেষণে বিশ্বগল্প, ছোটগল্পের শিল্প রূপান্তর’ গ্রন্থে ‘বিশ্বসাহিত্যে অণুগল্প’ নামে একটি অধ্যায় রয়েছে। এতে বিশ্বসাহিত্যের ফ্ল্যাশ ফিকশনকে ‘অণুগল্প’ বলা হয়েছে। অধ্যায়টিতে অণুগল্পের বৈশিষ্ট্য, শিল্পকৌশল প্রকারভেদ আশানুরূপ স্পষ্ট করা হয়নি। অধিকন্তু অণুগল্পের শব্দসীমা অনধিক এক হাজার বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে এই নিবন্ধকার রচিত ‘ফ্ল্যাশ ফিকশন স্বতন্ত্র ও সমৃদ্ধ ধারা’ ঝলকগল্পের শব্দসীমা ২ হাজারসহ নানাদিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে মে, ২০২৩ মাসে সিদ্ধার্থ সিংহের ৪০০টি গল্প নিয়ে প্রকাশিত হয় ‘চোর ধরার মেশিন এবং ৩৯৯’ নামে ঝলকগল্পের বই। বইটির প্রকাশনা অনুষ্ঠানে লেখক জানান, তার নতুন বইয়ের ৪০০টি ঝলকগল্পই ৪০০ রকমের।
কোনোটার সঙ্গে কোনোটার সামান্যতমও মিল নেই। আকারে অণুগল্পের মতো দেখতে হলেও এগুলো অণুগল্প নয়।
অণুগল্পের চেয়েও অনেক অনেক বেশি চমকপ্রদ, মর্মস্পর্শী এবং বুদ্ধিদীপ্ত। ওপরের আলোচনার প্রেক্ষিতে এ নিবন্ধকার মনে করে অণুগল্প এবং ঝলকগল্পের মধ্যে আঙ্গিকগত দিক এক নয়। বরং এ কথা বলা যায় যে, ঝলকগল্পের শ্রেণিভুক্ত এক বা একাধিক প্রকারভেদের অন্তর্ভুক্ত ধারা হলো অণুগল্প।