সাবেক প্রক্টর ও চেয়ারম্যানসহ তিন শিক্ষার্থীকে শাস্তির সিদ্ধান্ত

মোশফিকুর রহমান ইমন

শিক্ষা

গত বছরের ১৫ মার্চ ফেসবুক পোস্টে সহপাঠী আম্মান সিদ্দিকী ও সহকারী প্রক্টর দ্বীন ইসলামকে দায়ী করে কুমিল্লার নিজ বাড়িতে আত্মহত্যা

2025-03-19T00:38:59+00:00
2025-03-19T00:38:59+00:00
 
  রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬,
২১ আষাঢ় ১৪৩৩
রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬
শিক্ষা
সাবেক প্রক্টর ও চেয়ারম্যানসহ তিন শিক্ষার্থীকে শাস্তির সিদ্ধান্ত
অবন্তিকার আত্মহত্যা
মোশফিকুর রহমান ইমন
প্রকাশ: বুধবার, ১৯ মার্চ, ২০২৫, ১২:৩৮ এএম 
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ফাইরুজ সাদাফ অবন্তিকা। ছবি: সংগৃহীত
গত বছরের ১৫ মার্চ ফেসবুক পোস্টে সহপাঠী আম্মান সিদ্দিকী ও সহকারী প্রক্টর দ্বীন ইসলামকে দায়ী করে কুমিল্লার নিজ বাড়িতে আত্মহত্যা করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ফাইরুজ সাদাফ অবন্তিকা। দেশের আলোচিত ওই ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটি উচ্চতর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। দীর্ঘ তদন্ত শেষে কমিটি প্রতিবেদন দাখিল করেছে, যা চলতি বছরের ২ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯৯তম সিন্ডিকেটে উপস্থাপিত হয়েছে।

তদন্তে সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সরকার আলী আক্কাস ও সাবেক প্রক্টর অধ্যাপক ড. মোস্তফা কামালেরও নতুন সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মিলেছে। তাদের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ করা হয়েছে। এ ছাড়া অবন্তিকার বন্ধু আম্মান ছাড়াও দুই সহপাঠী লাকি আকতার ও রাগিব শাহরিয়ার রাফিকে আত্মহত্যার প্ররোচনার প্রমাণ পেয়েছে উচ্চতর তদন্ত কমিটি।

সিন্ডিকেট তদন্ত প্রতিবেদন আমলে নিয়ে আম্মানসহ তিন শিক্ষার্থীকে বিধি মোতাবেক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ও সাবেক চেয়ারম্যান-প্রক্টরের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনপূর্বক বিভাগীয় কার্যক্রম শুরুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে সাময়িক বরখাস্ত আরেক সহকারী প্রক্টর দ্বীন ইসলামের বিরুদ্ধে ফোজদারি মামলার তদন্ত চলমান থাকায় পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে সিন্ডিকেট সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্ত প্রতিবেদন ও ৯৯তম সিন্ডিকেটের সিন্ধান্ত নথি সময়ের আলোর এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, তদন্ত কমিটি নিশ্চিত করেছে যে, ফাইরুজ সাদাফ অবন্তিকার আত্মহত্যার ঘটনায় আম্মান সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিল। তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য শৃঙ্খলা বোর্ডে প্রেরণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। এ ছাড়া লাকি আকতারের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে যে, তিনি অবন্তিকার বিরুদ্ধে কুৎসামূলক বক্তব্য তৈরি এবং প্রচার করেছিলেন। তার কর্মকাণ্ডের কারণে অবন্তিকার মনে নিরাপত্তাহীনতার সৃষ্টি হয়, যা তদন্ত কমিটি প্রমাণ করেছে। তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য শৃঙ্খলা বোর্ডে প্রেরণের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

অবন্তিকার আরেক সহপাঠী রাগিব শাহরিয়ার রাফির বিরুদ্ধেও প্রমাণিত হয়েছে যে, তিনি জিডি করতে আম্মানের সঙ্গে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং অবন্তিকার বাবা-মাকে ক্যাম্পাসে আসতে বাধ্য করেছিলেন। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে অবন্তিকাকে কটুকথা বলা, বুলিং করা এবং পেছন থেকে অন্যান্য সহপাঠীদের অনুরূপ কাজে প্ররোচিত করার বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য শৃঙ্খলা বোর্ডে প্রেরণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।

এ ছাড়া অবন্তিকার সহপাঠী রিমি জামান, সামিরা আক্তার, মহসিনা আক্তার বন্যা, রিয়াজুল ইসলাম, গীতা মণ্ডল, মাহিমা আক্তার, আফসানা জাহান আঁখির বিরুদ্ধে আত্মহত্যার প্ররোচনায় তাদের সংশ্লিষ্টতা অনুমেয়। তবে সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণিত নয় মর্মে তদন্ত কমিটি মতামত প্রদান করায় তাদেরকে শিক্ষার্থী হিসেবে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার ও আচরণে আরও সতর্ক হওয়ার নির্দেশ দেয় সিন্ডিকেট সভা।

অন্যদিকে শিক্ষকদের বিষয়ে সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তে আরও বলা হয়, অবন্তিকার বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান হিসেবে অধ্যাপক ড. সরকার আলী আক্কাসের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে, তিনি অবন্তিকার আত্মহত্যার ঘটনার বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনা না করে কর্তব্যে অবহেলা করেছিলেন। তার বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও সরকারি কর্মচারী বিধিমালা অনুসারে অভিযোগ গঠনপূর্বক বিভাগীয় কার্যক্রম শুরুর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।

এ বিষয়ে আইন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সরকার আলী আক্কাস বলেন, তদন্ত কমিটি সঠিকভাবে গঠন হয়নি। এ রিপোর্ট পক্ষপাতমূলক। কোর্টে চ্যালেঞ্জ করলে এটা টিকবে না।

এ ছাড়া সাবেক প্রক্টর অধ্যাপক ড. মোস্তফা কামালের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে, তিনি অবন্তিকার আত্মহত্যার ঘটনায় প্রমাণিত অভিযোগগুলো যথাযথভাবে নিষ্পত্তি করতে ব্যর্থ হয়েছেন এবং বিষয়টি প্রশাসনকে অবহিত করেননি। তার বিরুদ্ধেও আইন অনুযায়ী কার্যক্রম শুরু করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।

এ বিষয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর অধ্যাপক ড. মোস্তফা কামাল বলেন, অবন্তিকা প্রক্টর অফিসে অভিযোগ দেওয়ার পর তাকে অফিস থেকে অফিসার দিয়ে ফোন দেওয়া হয়েছে, টিএনটি দিয়ে ফোন করা হয়েছে। বারবার ফোন করার পরও সে রিসিভ করেনি অফিসেও আসেনি। সে আমার কাছে বলেনি যে সে কীভাবে বিচার চাচ্ছে। তার তো আমার কাছে বলতে হবে সে কীভাবে বিচার চাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ফেব্রুয়ারিতে আমি দায়িত্ব ছেড়েছি। দায়িত্ব ছাড়ার আগে অফিসে সবকিছু বুঝিয়ে দিয়েছি। অবন্তিকার মৃত্যুর সময় আমি প্রক্টরের দায়িত্বে ছিলাম না। তদন্ত কমিটির তদন্ত রিপোর্ট পক্ষপাতমূলক। তার আত্মাহত্যার সময় আমি প্রক্টরের দায়িত্বে ছিলাম না। সে অভিযোগ দিয়েছে অফিসে। তাকে বারবার ফোন দিয়েও যোগাযোগ করা যায়নি।

অবন্তিকার আত্মহত্যার পর সাময়িক বরখাস্ত শিক্ষক দ্বীন ইসলামের বিষয়ে সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তে বলা হয়, ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক দ্বীন ইসলামের বিরুদ্ধে আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ফাইরুজ সাদাফ অবন্তিকার আত্মহত্যার ঘটনার প্ররোচনায় সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে ফৌজদারি আদালতে দায়েরকৃত মামলার তদন্ত চলমান থাকায় পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো।

এ বিষয়ে ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষক দ্বীন ইসলাম বলেন, সামাজিকভাবে অনেক হেনস্থার মধ্যে আছি। শারীরিক ও মানসিকভাবেও অসুস্থ। বিশ্ববিদ্যালয় এবং পুলিশের তদন্তের প্রেক্ষিতে আমি যদি দোষী হই, সে দায় নিতে প্রস্তুত আছি। কিন্তু আজ এক বছরের ওপরে তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করছে না। গত ২ জানুয়ারি ৯৯তম সিন্ডিকেটে তদন্ত রিপোর্ট উপস্থাপন করা হয়। আমি দোষী না নির্দোষ এটা লেখেনি। মামলার তদন্ত রিপোর্টের ওপর নির্ভর করে তারা পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত নেবে। অবন্তিকার পোস্টে আমার নামে যৌন হয়রানির অভিযোগ নেই। কিন্তু কেন তারা আমার সঙ্গে এমন করছে, এখানে রাজনৈতিক কোনো বিষয় আছে কি না আমি বুঝতে পারছি না।

তিনি আরও বলেন, মামলায় আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা পায়নি। ফরেনসিক, পোস্ট মোর্টেম রিপোর্ট, কল রেকর্ড এবং সিসি ক্যামেরা ফুটেজসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডকুমেন্টসেও না। কারণ সে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে প্রক্টরের কাছে। সহকারী প্রক্টরের কাছে লিখিত অভিযোগ করার বিধান নেই। প্রক্টর অফিসে প্রক্টর বরাবর আবেদন করলে সহকারী প্রক্টররা তদন্ত করে। আর ওই অভিযোগের তদন্তের দায়িত্ব কাউকেই দেওয়া হয়নি। এ ছাড়া পুলিশের সুরতহাল রিপোর্টে অবন্তিকার আত্মহত্যার সময় ৯টার দিকে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু ফরেনসিক রিপোর্টে তার পোস্টের সময় এসেছে ৯টা ৫৫ মিনিট। আত্মহত্যার এক ঘণ্টা পর সে পোস্ট করেছে। এটা কীভাবে সম্ভব!

তদন্ত প্রতিবেদন বিষয়ে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জাকির হোসেন বলেন, গত জুনের ১৩ তারিখে আমরা তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। এটা কেন প্রকাশ হচ্ছে না বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানে। নতুন প্রশাসন আসার পরও তাদের জানানো হয়েছে প্রতিবেদনটি জমা আছে। বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা বিষয়ক উচ্চ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে চীন সফরে থাকায় তদন্ত প্রতিবেদন এখনও কেন প্রকাশ হচ্ছে না এ বিষয়ে জানতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. রেজাউল করিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

এদিকে, এক বছর পেরিয়ে গেলেও ফৌজদারি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন মেলেনি। আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে অবন্তিকার মা তাহমিনা বেগমের করা এই মামলা বর্তমানে তদন্ত করছেন কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, আমরা মামলার সাক্ষী ও অবন্তিকার পরিবার থেকে তদন্তের ক্ষেত্রে তেমন কোনো সহায়তা পাচ্ছি না। তবে অবন্তিকা ও আসামিদের মুঠোফোনের ফরেনসিক পরীক্ষা হয়েছে। সেখানে ভালো কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। চেষ্টা করছি দ্রুত তদন্ত কাজ শেষ করার।

এ বিষয়ে অবন্তিকার মায়ের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, আমার মেয়েটা আমার কাছে নেই। অবন্তিকার আত্মহত্যার ঘটনায় যারা জড়িত, দোষী তাদের শাস্তি চাই।



Loading...
Loading...
শিক্ষা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: