কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় (কুবি) প্রতিষ্ঠার ১৮ বছর পেরিয়ে গেলেও আজ অবধি স্থাপিত হয়নি নিজস্ব সাবস্টেশন। অহরহ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও নেই জেনারেটরের সুবিধা। এদিকে স্বাভাবিক আবহাওয়াতেও দৈনিক সাত থেকে আট বার বিদ্যুৎ বিভ্রাট কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য। চাহিদার তুলনায় কম ভোল্টেজ, ঘন ঘন লোডশেডিং এবং অনির্ভরযোগ্য সংযোগ বিরূপ প্রভাব ফেলছে পাঠদান, গবেষণা, অনলাইন ক্লাস ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রায়।
এ প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. হায়দার আলী বলেন, সাম্প্রতিক সিন্ডিকেট সভায় আমরা বিদ্যুৎ বিভ্রাটের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে আলোচনা করেছি। আমাদের বিদ্যুৎ সংযোগের লাইনটি বনজঙ্গল ঘেরা এলাকা দিয়ে এসেছে। ফলে সামান্য ঝড়-বৃষ্টিতেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো মাটির নিচ দিয়ে (আন্ডারগ্রাউন্ড) বিদ্যুৎলাইন স্থাপনের ব্যবস্থা করব। এ বিষয়ে সরকারের কাছে শিগগিরই লিখিত আবেদন জানানো হবে। আশা করি, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সমস্যা অনেকাংশে কমে আসবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে জেনারেটর সুবিধার বিষয়ে তিনি বলেন, বুয়েটে জেনারেটর সুবিধা রয়েছে। তবে এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। আপাতত আমরা এই প্রকল্পটি নিয়ে ভাবছি না।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সমসাময়িককালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (নোবিপ্রবি) জেনারেটর সুবিধা রয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি), ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগ থাকলেও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই কোনো স্বতন্ত্র বিদ্যুৎ সংযোগ বা জেনারেটর ব্যবস্থা। এরই মধ্যে গত ২২ মে বিদ্যুৎ সমস্যার দ্রুত সমাধান ও টেকসই বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বরাবর স্মারকলিপি দেন শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া শুক্রবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে একই সমস্যার সমাধানে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ মিছিল করেন শিক্ষার্থীরা।
শুধু শিক্ষার্থীরাই নন, শিক্ষকরাও একই সমস্যার ভুক্তভোগী। বারবার বিদ্যুৎ বিভ্রাটে পাঠদানের স্বাভাবিকতা হারিয়ে যাচ্ছে। ক্লাসরুম আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর হলেও বিদ্যুৎ বিভ্রাটে এসব প্রযুক্তি ব্যবহার সাময়িক সময়ের জন্য অকেজো হয়ে যাচ্ছে।
এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও বিজয়-২৪ হলের প্রাধ্যক্ষ ড. মোহাম্মদ মাহমুদুল হাছান খান বলেন, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে আবাসিক হলগুলোতে বিদ্যুৎ না থাকায় পানি সংকটের পাশাপাশি ইন্টারনেট সংযোগে সমস্যা দেখা দিচ্ছে যা শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবন ও শিক্ষাচর্চায় মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।
প্রকৌশল দফতর সূত্রে জানা যায়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করে কোটবাড়ী সাবস্টেশন। বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ৬০০ কিলোওয়াট অনুমোদন নেওয়া থাকলেও সর্বশেষ রেকর্ড পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৫০০ কিলোওয়াট সরবরাহ হয়েছে। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রকৌশলীর দাবি, রাইস কুকার, হিটার, ইলেকট্রিক চুলা ও আয়রন মেশিন ব্যবহারের ফলে ভোল্টেজের সমস্যা দেখা দেয়।
এ প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দফতরের সুপারিনটেনডিং ইঞ্জিনিয়ার মো. জাকির হোসেন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যুৎ সংযোগ কোটবাড়ী সাবস্টেশনের আওতাধীন। এই সাবস্টেশন থেকে কুমিল্লা বার্ড, পলিটেকনিক, ক্যাডেট কলেজ, টিটিসিসহ কোটবাড়ী এলাকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। ফলে সাবস্টেশনে কোনো মেরামত কাজ বা ঝড়-বৃষ্টিতে লাইনে গাছ বা ডালপালা পড়লেই পুরো এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
তিনি আরও বলেন, আবাসিক হলগুলোতে শিক্ষার্থীরা রাইস কুকার, হিটার, ইলেকট্রিক চুলা ও আয়রন মেশিন ব্যবহার করছেন যা নির্ধারিত সার্কিট ক্ষমতার চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ টানে। এর ফলে সার্কিট পুড়ে যাওয়া বা ওভারলোড হয়ে লাইন বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনাও ঘটে।
বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পিডিবি থেকে আমরা বর্তমানে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ চাহিদা (৬০০ কিলোওয়াট) জানিয়েছি তা পূরণ করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত আমাদের বিদ্যুৎ ব্যবহার সর্বোচ্চ ৫০০ কিলোওয়াটের মতো রেকর্ড করা হয়েছে। চাহিদার চেয়ে কম ব্যবহার হওয়ায় সরবরাহে ঘাটতির কোনো বিষয় নেই।
কোটবাড়ী সাবস্টেশনের উপসহকারী প্রকৌশলী পিন্টু বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের চাহিদা অনুযায়ী আমরা বিদ্যুৎ সরবরাহ করছি। এখন পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারে ডিমান্ড চার্জ (চাহিদাসীমা) অতিক্রম করেনি। যেহেতু কোটবাড়ী ফিডার (সাবস্টেশন) থেকে একাধিক প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয় তাই কোথাও কোনো সমস্যা হলে অন্য সংযুক্ত স্থানগুলোর সংযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সম্মিলিত ফিডারে লোডশেডিংও একযোগে হয়ে থাকে। কিছু সময়ের জন্য পাঁচ-দশ মিনিটের যে বিদ্যুৎ বন্ধ থাকে তা আসলে লোডশেডিং নয়। এটি লাইনে সমস্যা দেখা দিলে মেরামতের প্রয়োজনেই সাময়িকভাবে সংযোগ বন্ধ রাখা হয়।
সময়ের আলো/এমএইচ