কর কাঠামো আধুনিকায়নে গুরুত্ব

মোফাজ্জল বিদ্যুৎ

ব্যবসা বাণিজ্য

দেশের প্রত্যক্ষ কর ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন, ন্যায্য, করদাতাবান্ধব ও বিনিয়োগবান্ধব করার লক্ষ্যে নতুন ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে গুরুত্ব দিয়েছে বর্তমান সরকার। এরই

2025-06-03T03:48:15+00:00
2025-06-03T03:48:15+00:00
 
  শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬,
৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
ব্যবসা বাণিজ্য
কর কাঠামো আধুনিকায়নে গুরুত্ব
মোফাজ্জল বিদ্যুৎ
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩ জুন, ২০২৫, ৩:৪৮ এএম   (ভিজিট : ২৪৭)
ছবি : সংগৃহীত
দেশের প্রত্যক্ষ কর ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন, ন্যায্য, করদাতাবান্ধব ও বিনিয়োগবান্ধব করার লক্ষ্যে নতুন ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে গুরুত্ব দিয়েছে বর্তমান সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় আয়করের বিধানে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন, সংশোধন ও পরিমার্জন করা হয়েছে।

সোমবার (২ জুন) আগামী অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপনকালে এসব তথ্য জানান অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ।

বাজেটের সার-সংক্ষেপ উপস্থানকালে তিনি বলেন, অর্থ আইন, ২০২৪-এর মাধ্যমে ২০২৫-২৬ করবর্ষের জন্য ভবিষ্যৎ সাপেক্ষে করহার ও সারচার্জ নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর ধারাবাহিকতায় অর্থ অধ্যাদেশ ২০২৫-এর মাধ্যমে ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ করবর্ষের করহার ও সারচার্জ নির্ধারণ করা হয়েছ। ফলে করদাতারা ২০২৫-২৬, ২০২৬-২৭ এবং ২০২৭-২৮ এই তিন করবর্ষের জন্য প্রযোজ্য করহার সম্পর্কে আগাম ধারণা লাভ করতে সক্ষম হবেন। তবে প্রস্তাবিত ও পরবর্তী দুই বছরের করহার পরবর্তী সরকার পরিবর্তন করতে পারবেন।

অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ করবর্ষের জন্য স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতার ক্ষেত্রে করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। গেজেটভুক্ত জুলাই গণঅভ্যুত্থান ২০২৪-এ আহত ‘জুলাই যোদ্ধা’ করদাতাদের ক্ষেত্রে করমুক্ত আয়ের সীমা ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে স্বাভাবিক ব্যক্তি ও হিন্দু অবিভক্ত পরিবার করদাতাদের জন্য ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ করবর্ষে মোট আয়করমুক্ত আয়ের সীমা অতিক্রম করলে ন্যূনতম করের পরিমাণ এলাকা নির্বিশেষে ৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন করদাতাদের ন্যূনতম করের পরিমাণ ১ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, কর পরিপালন সহজীকরণ করার জন্য লিস্টেড কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে ২.৫ শতাংশ করহার সুবিধাপ্রাপ্তির শর্ত শিথিল করে আয়, ব্যয় ও বিনিয়োগের পরিবর্তে সব ধরনের আয় ব্যাংক ট্রান্সফারের মাধ্যমে সম্পন্ন করার শর্ত আরোপ করা হয়েছে। এ ছাড়া পুঁজিবাজারে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করা মার্চেন্ট ব্যাংকের করহার ৩৭.৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৭.৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।

বাজেট উপস্থাপনকালে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, আগামী ২০২৬-২৭ এবং ২০২৭-২৮ করবর্ষের জন্য সম্পদ সারচার্জের বিদ্যমান হার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ন্যূনতম কর-কে সারচার্জ পরিগণনার ভিত্তি না রেখে স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতার করযোগ্য আয়ের ওপর নিয়মিত করহার প্রয়োগ করে করের ওপর সম্পদ সারচার্জ পরিগণনা করার বিধান করা হয়েছে। কর পরিপালন উৎসাহিত করার লক্ষ্যে কর ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠায় অর্থ অধ্যাদেশ ২০২৫-এর মাধ্যমে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।

পদক্ষেপগুলো সংক্ষেপে উপস্থাপন করেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ন্যূনতম করের কারণে কোনো করদাতাকে নিয়মিত করের যে পরিমাণ অতিরিক্ত কর প্রদান করতে হয় তা পরবর্তী করবর্ষগুলোতে সমন্বয় করার সুযোগ রাখা। কৃষি উৎপাদনকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে কোনো স্বাভাবিক ব্যক্তির ‘কৃষি হইতে আয়’ অনধিক ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত করমুক্ত রাখা।

অর্থ উপদেষ্টা বলেন, বেসরকারি চাকরিজীবীদের করযোগ্য আয় পরিগণনার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বাদযোগ্য অঙ্কের পরিমাণ সাড়ে ৪ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা করা হয়েছে। চাকরিরত কর্মচারীদের কিডনি, লিভার, ক্যানসার, হার্টের চিকিৎসার পাশাপাশি মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার ও কৃত্রিম অঙ্গ প্রতিস্থাপন সংক্রান্ত চিকিৎসা ব্যয় বাবদ প্রাপ্ত অর্থ করমুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের আয় এবং জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের সর্বজনীন পেনশন স্কিম থেকে সুবিধাভোগীর কোনো আয় এবং জিরো কুপন ইসলামিক ইনভেস্টমেন্ট সার্টিফিকেট থেকে উদ্ভূত আয়করমুক্ত করা হয়েছে।

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশি-বিদেশি লাভজনক ও নামিদামি কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে লিস্টেড এবং নন-লিস্টেড কোম্পানির করহারের ব্যবধান ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭.৫ শতাংশ করা হয়েছে। এ ছাড়া পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ ও লেনদেন বৃদ্ধি উৎসাহিতকরণে সিকিউরিটিজ লেনদেনের মোট মূল্যের ওপর ব্রোকারেজ হাউসগুলোর কাছ থেকে উৎসে কর সংগ্রহের হার শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।

কর কাঠামোর বিদ্যমান অসামঞ্জস্যতা দূরীকরণ এবং কর জাল সম্প্রসারণে অর্থ অধ্যাদেশ ২০২৫-এর মাধ্যমে কার্যক্রম গৃহীত হয়েছে বলে জানান অর্থ উপদেষ্টা। সেগুলো হলো- সম্ভাব্য মুনাফার পরিমাণ বিবেচনায় ঠিকাদারি কাজ থেকে উৎসে কর কর্তনের সর্বোচ্চ হার ৭ শতাংশের স্থলে ৫ শতাংশে কমানো হয়েছে। প্রকৃত বিক্রয়মূল্যে সম্পত্তি রেজিস্ট্রেশনের লক্ষ্যে জমি হস্তান্তর থেকে উৎসে কর সংগ্রহের বিদ্যমান মূলধনী মুনাফা করহার কমিয়ে এলাকাভেদে বিদ্যমান হার ৮, ৬ ও ৪ শতাংশের স্থলে যথাক্রমে ৬, ৪ ও ৩ শতাংশ করা হয়েছে। সম্ভাব্য মুনাফার পরিমাণ বিবেচনায় ১৫২টি পণ্যের ওপর আমদানি পর্যায়ে হ্রাসকৃত ২ শতাংশ হারে অগ্রিম কর আরোপ করা। পরিবেশবান্ধব রিসাইক্লিং শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামাল সরবরাহের ক্ষেত্রে উৎসে কর কর্তনের হার ৩ শতাংশের স্থলে ১ দশমিক ৫ শতাংশে নির্ধারণ এবং গ্যাস বিতরণে নিযুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে উৎসে কর কর্তনের হার ২ শতাংশের স্থলে শূন্য দশমিক ৬ শতাংশে নির্ধারণ করা হয়েছে।

গৃহীত কার্যক্রমের মধ্যে আরও রয়েছেÑইন্টারনেট সেবা থেকে উৎসে কর কর্তনের হার ১০ শতাংশের স্থলে ৫ শতাংশ, সিকিউরিটিজের সুদ থেকে উৎসে কর কর্তনের হার ৫ শতাংশের স্থলে ১০ শতাংশ, বিদ্যুৎ কেনার অর্থ পরিশোধকালে উৎসে কর কর্তনের হার ৬ শতাংশের স্থলে ৪ শতাংশ নির্ধারণ, সম্ভাব্য মুনাফার পরিমাণ বিবেচনায় সিগারেট প্রস্তুতকারকের কাছ থেকে নিট বিক্রয়মূল্যের ওপর ৩ শতাংশের স্থলে ৫ শতাংশ হারে অগ্রিম কর সংগ্রহের বিধান, স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতার ক্ষেত্রে টার্নওভার করের আওতামুক্ত সীমা ৩ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ কোটি টাকা এবং মোবাইল অপারেটরদের টার্নওভার করের পরিমাণ ২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১.৫ শতাংশে করা হয়েছে। এদিকে করদাতাদের জন্য কর প্রদান, রিটার্ন দাখিল, দলিলপত্র সংরক্ষণসহ কর পরিপালনের আনুষ্ঠানিকতা সহজীকরণে কয়েকটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ।

তিনি বলেন, তহবিল, এতিমখানা, অনাথ আশ্রম ও ধর্মীয় উদ্দেশে প্রতিষ্ঠিত কোনো প্রতিষ্ঠানকে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে। উৎসে কর কর্তনকারী কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রতি মাসের পরিবর্তে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে উৎসে করের রিটার্ন দাখিলের বিধান করা হয়েছে। জমি বা জমিসহ স্থাপনা হস্তান্তরকালে দলিল মূল্যের অতিরিক্ত কোনো অর্থ গৃহীত হলে ব্যাংক বিবরণীসহ দালিলিক প্রমাণাদি দ্বারা যাচাইযোগ্য হওয়া সাপেক্ষে অতিরিক্ত অর্থের ওপর মূলধনী আয়ের জন্য প্রযোজ্য হারে কর প্রদানের বিধান করা হয়েছে। সেই সঙ্গে স্বনির্ধারণী পদ্ধতিতে দাখিলকৃত রিটার্ন অডিট সংক্রান্ত মাঠ পর্যায়ে সৃষ্ট জটিলতা নিরসন করে অডিট কার্যক্রমকে কার্যকর ও সহজীকরণের উদ্দেশ্যে অডিট সংশ্লিষ্ট বিধান প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া বিদ্যমান ৪৫টি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ উপস্থাপনের বাধ্যবাধকতা শিথিল করে ক্রেডিট কার্ডসহ ১২টি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে কেবলমাত্র টিআইএন সার্টিফিকেট দাখিলের বিধান করা হয়েছে বলে বক্তব্যে উল্লেখ করেন অর্থ উপদেষ্টা।

অন্যদিকে কর অব্যাহতি যৌক্তিকীকরণের অংশ হিসেবে কর অব্যাহতির সুবিধার মেয়াদ ৩০ জুন ২০২৫ তারিখে শেষ হবে এমন কতিপয় ক্ষেত্রে কর অব্যাহতির মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়নি বলে জানান অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ।

বাজটে উপস্থাপনকালে তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে কর অব্যাহতি এবং হ্রাসকৃত হারে কর প্রদানের সুযোগপ্রাপ্ত কতিপয় খাতের জন্য প্রযোজ্য বিদ্যমান হ্রাসকৃত করহার সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপনগুলো বাতিল করা হয়েছে। তবে এসব কাজে জড়িত প্রান্তিক পর্যায়ের খামারি এবং উদ্যোক্তাদের উৎসাহ প্রদানের জন্য এসব খাত থেকে প্রাপ্ত অনধিক ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আয়করমুক্ত রাখা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন অর্থ উপদেষ্টা।

সময়ের আলো/এমএইচ


Loading...
Loading...
ব্যবসা বাণিজ্য- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: