ঈদের পাঁচ দিনে চিকিৎসা নিলেন ১৫২০ জন

গোলাম মোস্তফা

শেষ পাতা

কুরবানির ঈদের আগে ও পরে গত ৫ দিনে ঢাকার জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে (পঙ্গু হাসপাতাল) মোট চিকিৎসা নিয়েছেন

2025-06-11T05:35:01+00:00
2025-06-11T05:35:01+00:00
 
  শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬,
১৯ আষাঢ় ১৪৩৩
শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬
শেষ পাতা
ঈদের পাঁচ দিনে চিকিৎসা নিলেন ১৫২০ জন
পঙ্গু হাসপাতাল
গোলাম মোস্তফা
প্রকাশ: বুধবার, ১১ জুন, ২০২৫, ৫:৩৫ এএম 
সংগৃহীত ছবি
কুরবানির ঈদের আগে ও পরে গত ৫ দিনে ঢাকার জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে (পঙ্গু হাসপাতাল) মোট চিকিৎসা নিয়েছেন ১৫২০ জন। গড়ে প্রতিদিন ৩০০-এরও বেশি মানুষ আহত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে। আহতদের মধ্যে হাসপাতালে মোট ভর্তি হয়েছেন ৪২২ জন, যার হার ২৭ দশমিক ৭৬ শতাংশ। আর জরুরি অপারেশন করতে হয়েছে ৪৬৬ জনের। যার হার শতকরা ৩০ দশমিক ৬৬ শতাংশ। আহতদের মধ্যে কেউ কেউ ঈদের সময়ে পশু কুরবানি দিতে গিয়ে আহত হয়েছে।  আবার অনেকেই মোটরবাইক কিংবা অটোরিকশা-সিএনজি দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত হয়েছে। তাদের কারও হাত-পা কেটে ফেলার মতো অবস্থা হয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। সারা জীবন তাদের পঙ্গুত্ব বয়ে বেড়াতে হবে।

হাসাপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীগের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। একইসঙ্গে রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

মঙ্গলবার সরেজমিন পঙ্গু হাসপাতালে মারাত্মক দুর্ঘটনার শিকার হওয়া রোগীদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগের দৃশ্য দেখা গেছে। আর আহত রোগী ও স্বজনদের আহাজারিতে যেন ভারী হয়ে উঠছে হাসাপালের আকাশ-বাতাস। সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে কারও কারও এক হাত কিংবা দুই হাত, আবার কারও এক পা কিংবা দুই পাই ভেঙে গেছে। অনেকের হাত-পা ছাড়াও  বুক, পেট ও মাথাসহ বিভিন্ন জায়গা গুরুতর জখম হয়েছে। শরীরের চামড়া ছিলে গেছে। পুরো শরীরের ব্যান্ডেজ লাগালো। কারও কারও জরুরি অপারেশনের প্রয়োজন পড়ে। কোনো কোনো রোগীর হাতে-পায়ে লোহার রড লাগানোর পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসক। তাই হাত-পা কেটে ফেলার শঙ্কায় ভুগছেন ওই রোগীরা। অপারেশন রুম থেকে শুরু করে এক্সরে রুমসহ বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার রুমে লেগে রয়েছে দীর্ঘ লাইন। রোগী ও স্বজনদের ভিড়ে পা ফেলার জায়গা নেই। এ ছাড়াও হাসপাতালে জরুরি বিভাগে কিছুক্ষণ পরপর অ্যাম্বুলেন্স, সিএনজি ও অটোরিকশা করে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রোগীরা আসছেন।

রোগী ও স্বজনদের চোখে-মুখে ছিল উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার ছাপ। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অনেকেই জানান, ঈদের আনন্দ এখন বিষাদে পরিণত হয়েছে তার পরিবারের মধ্যে। এমনকি শেষ পর্যন্ত পা কেটে ফেলতে হয় কি না- সেই দুচিন্তায় হাসপাতালে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন অনেকেই।

তেমনই একজন হলেন- আরমান হোসেন। ক্যাজুয়ালটি-১ নম্বর ওয়ার্ডে ঈদের দিন থেকে তিনি ভর্তি রয়েছেন। তার বাড়ি পাবনার ফরিদপুরে।
 
তার বাবা আশিক হোসেন সময়ের আলোকে জানান, ঈদের আগের দিন শনিবার রাতে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে গিয়ে মোটরবাইক অ্যাকসিডেন্ট করেন। তার এক হাতের হাড় ভেঙে গেছে। আরেক হাতের হাড় না ভাঙলেও সেটার অবস্থাও খুব খারাপ।

তিনি বলেন, অ্যাকসিডেন্ট করার রাতেই পাবনা থেকে প্রথমে রাজশাহী মেডিকেলে নিয়ে যাই। সেখানে রাত কাটানোর পর ঈদের দিন সকালে পঙ্গুতে নিয়ে আসি। তাই আমার পুরো পরিবারের ঈদের দিন কেটেছে হাসপাতালের বিছানায়। একমাত্র ছেলের জন্য চরম দুচিন্তায় আছি। আদৌ কী আমার ছেলে ভালো হবে!
  
কীভাবে তার চিকিৎসা চলবে, পরিবার কীভাবে চলবে, সে চিন্তাই সারাক্ষণ মাথায় ঘুরছে বলেও জানান আশিক হোসেন
সোমবার মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার হন কিশোরগঞ্জের ইসলাম উদ্দিন। মঙ্গলবার হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসেন।

তিনি সময়ের আলোকে বলেন, ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিলাম। বেঁচে আছি সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া। কিন্তু জরুরি বিভাগে এক ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করছি। শয্যা পাচ্ছি না। জানি না এভাবে আর কতক্ষণ থাকতে হবে। শয্যা পাব কি-না সেটারও নিশ্চয়তা পাচ্ছি না।
  
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, গত ৫ জুন  জরুরি বিভাগ থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন মোট ২৫৩ জন। এর মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৭০ জন এবং অপারেশন লেগেছে ৬৪ জনের। শুক্রবার ভর্তি হয়েছেন ৩১৬ জন এবং অপারেশন লেগেছে ৮৯ জনের। ঈদের দিন চিকিৎসা নিয়েছেন ৩২৫ জন। এর মধ্যে ভর্তি হয়েছেন ১২২ জন এবং অপারেশন লেগেছে ১০২ জনের। রোববার চিকিৎসা নেন ৩৩০১ জন। এর মধ্যে ভর্তি হয়েছেন ৯২ জন এবং অপারেশন লেগেছে ৭৫ জনের। আর সোমবার জরুরি বিভাগ থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন ৩২৫ জন। এর মধ্যে ভর্তি হয়েছেন ৯৭ জন এবং অপারেশন লেগেছে ১০২ জনের। অর্থাৎ কুরবানির ঈদের আগে ও পরে গত ৫ দিনে ঢাকার জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে (পঙ্গু হাসপাতাল) মোট চিকিৎসা নিয়েছেন ১৫২০ জন। এর মধ্যে ভর্তি হয়েছেন ৪২২ জন এবং অপারেশন লেগেছে ৪৬৬ জনের। মোট আহতদের ৮১ জন পশু কুরবানি দিতে গিয়ে কিংবা পশু কেনার সময় লাথিতে আহত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন।

হাসপাতালে জরুরি বিভাগের চিকিৎসকরা বলেন, এখানে স্বাভাবিক সময়ে গড়ে ২০০ রোগী আসেন। কিন্তু এখন গড়ে ৩০০-এরও বেশি রোগী আসছে। ফলে রোগীর চাপ সামাল দিতে আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। মারাত্মক দুর্ঘটনার শিকার হওয়া রোগীদের ভর্তি করা হচ্ছে। আর বাকিদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে।

চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে,  মূলত ঈদের সময় সড়ক ফাঁকা থাকে। ফাঁকা রাস্তায় বেপরোয়া গতিতে যানবাহন চলাচলে দুর্ঘটনা বাড়ে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। আর দুর্ঘটনায় আহতদের অধিকাংশই ঢাকার বাইরে থেকে এসেছেন। এর একটি বড় অংশ বয়সে তরুণ, যারা মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন। তাই দুর্ঘটনা রোধে চালকদের সচেতনতা ও গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে যেসব নিয়মকানুন এবং দিকনির্দেশনা আছে, সেগুলো মেনে চলার চলার পরামর্শ দেন তারা।

পঙ্গু হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. আবুল কেনান সময়ের আলোকে বলেন, প্রতি বছরই ঈদের সময়ে দুর্ঘটনা বাড়ে তাই স্বাভাবিক সময়ের রোগীর চাপ অনেক বেড়েছে। কারণ এই সময়ে রাস্তাঘাট ফাঁকা থাকে। তাই মোটরসাইকেল-অটোরিকশা এবং সিএনজিসহ নানা ধরনের যানবাহনের দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মানুষ গুরুতর আহত হয়। আবার অনেকেই কুরবানি দিতে গিয়ে গরুর লাথি-গুঁতা কিংবা ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আহত হয়ে হাসপাতালে এসেছেন। কারও কারও রগ কেটে গেছে। এর কারণ হলো- তারা কেউ প্রফেশনাল কসাই নন। অতি উৎসাহ নিয়ে শখ করে গরু জবাই করতে গিয়ে এ ধরনের দুর্ঘটনার শিকার হন। এ ধরনের অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা এড়াতে সর্তক থাকতে হবে।

এ ছাড়া সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সবাইকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন,  ফাঁকা রাস্তায় বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহন চালানো এবং অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহনের কারণে বেশি সড়ক দুঘটনার ঘটনা ঘটছে। তারা নিজেরাও নিজেদের সর্বনাশ করে এবং অন্যেরও ক্ষতি করছে। তাই চালকদেরও গাড়ি চালানোর ব্যাপারে সর্তক থাকতে হবে এবং ট্রাফিক সিস্টেম মেনে চলতে হবে। একইসঙ্গে ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল বন্ধ করতে হবে। তা না হলে কোনোভাবেই দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হবে না।

সময়ের আলো/এমএইচ


Loading...
Loading...
শেষ পাতা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: