সফলতার চেয়ে ব্যর্থতার পাল্লাই ভারী বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি)। নির্মাণের পর আড়াই বছরেও চালু করা যায়নি গভীর সমুদ্রের তলদেশের পাইপলাইন। ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্পে বছরে ৮০০ কোটি টাকা সাশ্রয় এখনও হয়নি। আলোর মুখ দেখেনি আলোচিত মেগা প্রকল্প। জ্বালানি তেল পরিবহন আটকে আছে ঠিকাদার নিয়োগ জটিলতায়। অপরদিকে ইতিবাচক ধারায় আছে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি)। ঘুরে দাঁড়ানো এই প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের ধারা অব্যাহত আছে। গত বছরের মতো এবারও নিট মুনাফা বেড়েছে। বহরে যুক্ত হয়েছে নতুন জাহাজ।
বছরে ৮০০ কোটি টাকা সাশ্রয়ের পাইপলাইন প্রকল্প হাতে নিয়ে হইচই পড়ে গিয়েছিল জ্বালানি সেক্টরে। প্রকল্পটির নাম ‘ইনস্টলেশন অব এসপিএম উইথ ডবল পাইপলাইন’। শুরুতে প্রকল্প ব্যয় ধরা হয় ৪ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা। পরে তিন দফা বাড়িয়ে সংশোধিত ব্যয় দাঁড়ায় ৮ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা। প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ করে চায়না পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড (সিপিপিইসি)। পাইপলাইনটির শুরুর অবস্থান কক্সবাজারের মহেশখালীর কালারমারছড়া ইউনিয়নে উপকূল থেকে ছয় কিলোমিটার পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরে। সেখানে স্থাপন করা হয় সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম)। এসপিএম থেকে ৩৬ ইঞ্চি ব্যাসের দুটি আলাদা পাইপলাইন নির্মাণ হয়েছে।
দুটি লাইনের মাধ্যমে ক্রুড অয়েলের পাশাপাশি পরিশোধিত জ্বালানি তেল খালাসের পরিকল্পনা আছে। ১৬ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে সেই পাইপলাইনে প্রথমে তেল নিয়ে আসা হবে কালারমারছড়ার সোনারপাড়া পাম্প স্টেশনে। কিছু পরীক্ষার পর স্টোরেজ থেকে পাম্পিং করা হবে ৭৪ কিলোমিটার আরেকটি পাইপলাইনে। এসব তেল পৌঁছানো হবে আনোয়ারা উপজেলার সমুদ্র উপকূলে। সেখান থেকে ৩৬ কিলোমিটার দীর্ঘ আরেকটি পাইপলাইন হয়ে তেল নিয়ে যাওয়া হবে পতেঙ্গায় ইআরএলের স্টোরেজ ট্যাঙ্কে। কিন্তু নির্মাণের পর প্রতীক্ষিত পাইপলাইন চালু না হওয়ায় পরিকল্পিত তেল পরিবহন আর হয়নি। এতে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে বিপিসি। কবে তেল পরিবহন শুরু হবে তাও নিশ্চিত করতে পারছে না কর্মকর্তারা। বারবার নতুন নতুন সময়ের তথ্য জানানো হলেও শেষ পর্যন্ত চালু করা যায়নি সেই পাইপলাইন।
তেল সেক্টরের সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রকল্পের সমীক্ষায় বড় ধরনের গোঁজামিল ছিল। প্রকল্প কাজের তদারকিও ছিল যেনতেনভাবে। প্রতীক্ষিত সময়ে তেল খালাস শুরুর পর প্রকল্পের বড় ধরনের ত্রুটি ধরা পড়ে। এরপর চুপসে যান বিপিসির কর্মকর্তারা। বছরে ৮০০ কোটি টাকা সাশ্রয়ের কথা বলা হলেও পরিবহন শুরু না হওয়ায় বিপুল অর্থ গচ্ছা যাচ্ছে।
এ ব্যাপারে বিপিসির সিনিয়র মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন্স অ্যান্ড প্ল্যানিং) মণি লাল দাশ সময়ের আলোকে বলেন, গভীর সাগর থেকে স্টোরেজ ট্যাঙ্ক পর্যন্ত পাইপলাইন প্রস্তুত আছে। তেল অপারেশন বা পরিচালন নিয়ে ঠিকাদার নিয়োগ হলেই আবার পরিবহন শুরু হবে।
প্রথম দফা টেন্ডারে নানা জটিলতায় ঠিকাদার নিয়োগ হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, আবার নতুন করে ঠিকাদার নিয়োগ প্রক্রিয়া চলছে। নিয়োগ হলেই শুরু হবে গভীর সাগরের তলদেশের পাইপলাইনে তেল পরিবহন।
সাফল্যের ধারাবাহিকতা বিএসসিতে : বিপিসির ব্যর্থতার পাল্লা ভারী হলেও সাফল্যের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখেছে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি)। সংস্থার ছোট বহর বড় হচ্ছে। নতুন নতুন আধুনিক জাহাজ যুক্ত হচ্ছে বহরে। নতুন জাহাজগুলো কোনোটি প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকায় ভাড়ায় দেওয়া হয়েছে। কর সমন্বয়ের পর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিএসসির নিট মুনাফা হয়েছে ৩০৬ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। এক অর্থবছরে এই পরিমাণ লাভ সংস্থাটির ৫৪ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিএসসির মোট আয় ছিল ৫৯৬ কোটি ১৮ লাখ টাকা এবং ব্যয় ছিল ৩১১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। ওই অর্থবছরে কর-পরবর্তী নিট মুনাফা ছিল ২৪৯ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে বিএসসির নিট আয় বেড়েছে প্রায় ৫৬ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।
গত ২২ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম নগরীর বোট ক্লাবে আয়োজিত বিএসসির ৪৮তম বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) মুনাফার বিস্তারিত তুলে ধরেন সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক। অনুষ্ঠানে নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন বক্তব্য রাখেন।
বিএসসির পক্ষ থেকে জানানো হয়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিএসসির পরিচালন আয় ছিল ৫৯০ কোটি ৯৮ লাখ টাকা এবং অন্যান্য খাত থেকে আয় হয়েছে ২০৭ কোটি ৩০ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে মোট আয় দাঁড়ায় ৭৯৮ কোটি ২৮ লাখ টাকা। অন্যদিকে পরিচালন ব্যয় ছিল ২৮৯ কোটি ৯২ লাখ টাকা এবং প্রশাসনিক ও আর্থিক খাতে ব্যয় হয়েছে ১২৬ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। ফলে মোট ব্যয় দাঁড়ায় ৪১৬ কোটি ২৭ লাখ টাকা। বিএসসি পরিচালনা পর্ষদ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের নিট মুনাফা থেকে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ২৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ (ক্যাশ ডিভিডেন্ড) প্রদানের সুপারিশ করে। চীন সরকারের ঋণ সহায়তায় ৬টি নতুন জাহাজ ক্রয় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। যার মধ্যে বর্তমানে ৫টি জাহাজ বিএসসির বহরে রয়েছে। সর্বশেষ জাহাজটি চলতি ডিসেম্বরে পৌঁছার কথা থাকলেও আসেনি। আগামী বছর জাহাজটি বহরে যুক্ত হবে বলে জানান কর্মকর্তারা।
এ ব্যাপারে ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক বলেন, বহরে আরও নতুন জাহাজ যুক্ত হবে। এতে জাহাজ ভাড়া বাবদ বিএসসির আয় বাড়বে। বহরে পুরোনো কোনো জাহাজ নেই। সব নতুন হওয়ায় প্রত্যাশিত হারে ভাড়া দেওয়া সহজ হয়েছে। সাফল্যের বর্তমান ধারাবাহিকতা সামনেও অব্যাহত থাকবে বলে আমাদের বিশ্বাস।
এএডি/