বিপর্যয় থেকে ঘুরে দাঁড়ানো

সালাহ উদ্দিন চৌধুরী

শেষ পাতা

২০২৫ সালটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য ছিল চরম চ্যালেঞ্জিং। ৫ আগস্ট-পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ পুলিশের ভাবমূর্তি চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। পুলিশের প্রতি

2025-12-30T05:16:17+00:00
2025-12-30T05:16:17+00:00
 
  সোমবার, ৮ জুন ২০২৬,
২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
সোমবার, ৮ জুন ২০২৬
শেষ পাতা
বিপর্যয় থেকে ঘুরে দাঁড়ানো
সালাহ উদ্দিন চৌধুরী
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫, ৫:১৬ এএম   (ভিজিট : ১০৯)
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ছবি : সংগৃহীত
২০২৫ সালটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য ছিল চরম চ্যালেঞ্জিং। ৫ আগস্ট-পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ পুলিশের ভাবমূর্তি চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। পুলিশের প্রতি জনসাধারণের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের জন্য পাল্টে ফেলতে হয় পোশাকও। কিন্তু তারপরও প্রত্যাশিত উন্নতি হয়নি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের পরিসংখ্যানে উঠে আসে পরিস্থিতি অবনমনের চিত্র। ২০২৫ সালে বছরজুড়েই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রতিটি সূচকই ছিল নিম্নগতি। ঘটে বেশ কিছু অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও।

৫ আগস্টের পর রাজধানীজুড়ে বিভিন্ন সংগঠনের ভিন্ন ভিন্ন দাবিতে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ সামাল দিতে ব্যতিব্যস্ত থাকতে হয়েছে পুলিশকে। দিতে হয়েছে ধৈর্যের পরীক্ষা। তারপরও বিক্ষোভ দমনে কিছু ক্ষেত্রে বল প্রয়োগ করতে গিয়ে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে পুলিশকে।

একই সঙ্গে বছরের অধিকাংশ সময়জুড়ে মব ভায়োলেন্স মোকাবিলা করতে গলদঘর্ম হতে হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। কিছু ক্ষেত্রে পুলিশ সদস্যরাই মবের শিকার হন।

বছরের শেষের কয়েক মাস দিবালোকে চাঞ্চ্যলকর কিছু হত্যাকাণ্ড জনমনে সৃষ্টি করে চরম আতঙ্কের। আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের পর জামিনপ্রাপ্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নতুন করে অপরাধ সাম্রাজ্য দখলের প্রতিযোগিতায় অস্থির হয়ে উঠে আন্ডারওয়ার্ল্ড। ঘটে বেশ কিছু লোমহর্ষক খুনের ঘটনা। যার ফলে পুলিশের সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠে।   

একই ভাবে ছিনতাই, ডাকাতি বিশেষ করে দেশের বিভিন্নস্থানে স্বর্ণের দোকানে ডাকাতি উৎকণ্ঠিত করে তুলে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের।

একই সঙ্গে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে ২০২৫ সালে। আদালত পাড়ায় খুনের ঘটনা আলোড়ন সৃষ্টি করে দেশজুড়ে। বিগত যেকোনো সময়ের তুলনায় এই বছরে নদীপথে পাওয়া যায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মরদেহ।

বছরের একটি বড় সময় ধরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল রোধে ব্যস্ত সময় কাটাতে হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। পলাতক ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মামলার তারিখ এবং পরে তার রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে তাণ্ডব চালায় দলটির নেতাকর্মীরা।

বছরের শেষ সময়ে জুলাই অভ্যুত্থানের প্রথম সারির নেতা ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহিদ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় খুনিদেরও নির্বিঘ্নে দেশ ছেড়ে পলায়নের ঘটনায় সবচেয়ে বেশি সমালোচনার মুখে পড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরবর্তী সময়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, ভাঙচুরের ঘটনা সামাল দিতে ব্যর্থতার দায়ে সমালোচিত হতে হয়েছে পুলিশ ও গোয়েন্দাদের। ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোতে আগুন দেওয়ার ঘটনায় আন্তর্জাতিক সমালেচানার মুখে পড়তে হয়   সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে।

তবে এত সব ব্যর্থতার পরও ঈদ, পূজাসহ বিভিন্ন ধর্মীয়, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান, ওসমান হাদির জানাজা এবং অন্যসব রাজনৈতিক দলের বড় অনুষ্ঠানগুলোতে কোনো ধরনের দুর্ঘটনা বা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। যা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সফলতা হিসেবে দেখা হয়েছে।

আগস্ট-পরবর্তী আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশে করা হয় ব্যাপক রদবদল। সর্বশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখেও পুলিশে বড় ধরনের রদবদল করা হয়েছে। বছরজুড়ে পুলিশের এসব বদলি, পদায়ন ছিল আলোচনায়। বছরজুড়ে বেশ কয়েকটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয় পুলিশকে।

গত ২১ জুলাই দুপুরে রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ীতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসের একটি ভবনে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর এফ-৭ বিজিআই মডেলের যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়। এ ঘটনায় প্রায় ৩৫ জন নিহত এবং ১৭২ জন আহত হয়। নিহত ও আহতদের মধ্যে বেশিরভাগই ১৮ বছরের নিচের শিশুশিক্ষার্থী, যাদের অধিকাংশই অগ্নিদগ্ধ হয়।

গত ১৪ অক্টোবর রাজধানীর রূপনগরের শিয়ালবাড়ীতে গার্মেন্টস ও কেমিক্যাল গোডাউনে অগ্নিকাণ্ডে ১৬ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়।

মব : জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে একের পর এক মব ভায়োলেন্স বা সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসে মবের ঘটনায় ১৮৪ জনে মৃত্যু হয়। সবচেয়ে বেশি ৭৮ জনের মৃত্যু হয় ঢাকায়।

আসকের তথ্যমতে, গত ১১ মাসে ২৮৩টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৯৮ জনের মৃত্যু হয়। আহত হয় ৪ হাজার ৪৭৬ জন। এরমধ্যে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে নিহত হয় ৩৯ জন। ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে ৩৭টি। ২৯১টি শিশুকে হত্যা করা হয়।

নদীতে মরদেহ : ২০২৫ সালে হত্যার পর পরিচয় গোপন করতে নদীতে মরদেহ ফেলে দেওয়ার সহজ কৌশল বেছে নেয় খুনিরা। নৌ-পুলিশের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৫ সালে প্রতি মাসে গড়ে ৪৩টি মরদেহ উদ্ধার করা হয় নদী থেকে, যা গত বছর ছিল মাসে গড়ে ৩৭টি।

পুলিশের পোশাক পরিবর্তন : গত ১৫ নভেম্বর, ২৫ থেকে বাংলাদেশ পুলিশের নতুন ‘আয়রন গ্রে’ রঙের ইউনিফর্ম চালু হয়েছে, যা প্রথমে ডিএমপি ও বিশেষায়িত ইউনিটগুলোতে কার্যকর করা হয়েছে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে দমন-পীড়নের অভিযোগ ওঠার পর থেকে সমালোচনার মুখে থাকা পুলিশ বাহিনীর সংস্কার ও পোশাক পরিবর্তনের দাবি উঠলে অন্তর্বর্তী সরকার নতুন পোশাক অনুমোদন করে। এরই অংশ হিসেবে মহানগর পুলিশে নতুন পোশাক দেওয়া হয়েছে। পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), ট্যুরিস্ট পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ, নৌ এই পোশাক পরছে। পুলিশ সদর দফতর সূত্র জানায়, এর আগে ২০০৪ সালে পোশাক পরিবর্তন করা হয়েছিল। প্রায় ২১ বছর পর পুলিশে আবার পোশাকে পরিবর্তন আনা হলো।

আদালতপাড়ায় হত্যাকাণ্ড : ২০২৫ সালে আদালতপাড়ায় একের পর এক হত্যাকাণ্ড জনমনে তৈরি করে আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা। ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও সুনামগঞ্জÑ সব জায়গাতেই দিনদুপুরে ঘটে এসব হত্যাকাণ্ড। এমনকি বিচারকের বাসায় ঢুকে পরিবারের সদস্যকেও হত্যার ঘটনা ঘটে।

নভেম্বরে দেশের দুটি আদালতে তিনজনকে খুনের পর আদালতসংশ্লিষ্টরা নিরাপত্তা ব্যবস্থার ত্রুটি ও গোয়েন্দা নজরদারির ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন উঠে।

পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতালের সামনে গত ১০ নভেম্বর পুলিশের তালিকাভুক্ত ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ তারিক সাইফ মামুনকে (৫৫) খুব কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এর আগে চলতি বছরের ৬ অক্টোবর সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলা আদালত প্রাঙ্গণে সাবেক স্বামীর ছুরিকাঘাতে নিহত হন শরীফা আক্তার (২৮) নামে এক গৃহবধূ। গত ৩০ নভেম্বর খুলনা নগরীর একটি আদালতে হাজিরা দিতে আসা দুই ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা।

চাঞ্চ্যলকর খুন :  বছরজুড়ে দেশব্যাপী একের পর এক চাঞ্চল্যকর খুনের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় জনমনে বেড়েছে আতঙ্ক। এক ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে অন্য আরেক ঘটনা ঘটেছে। সামনে নির্বাচন, অনাকাক্সিক্ষত অনেক ঘটনা আরও বাড়তে পারে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার মধ্যেও এসব ঘটনায় মানুষের মধ্যে যেন এক অজানা আতঙ্ক তাড়া করে ফিরছে।

গত ১২ ডিসেম্বর শুক্রবার দিবালোকে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা ৮ আসনের স্বতন্ত্র সম্ভাব্য প্রার্থী ওসমান হাদিকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি করার ঘটনা দেশ-বিদেশে ব্যাপক চাঞ্চল্যের জন্ম দেয়। গত ১৭ নভেম্বর রাজধানীর পল্লবীতে যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়াকে একটি দোকানের ভেতর গুলি করে হত্যা করা হয়। এর আগে, পুরান ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালত এলাকায় গুলি করে হত্যা করা হয় শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুনকে। চট্টগ্রামে বিএনপির এক রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার সময় ‘সন্ত্রাসী’ সারোয়ার হোসেন ওরফে বাবলাকে হত্যা করা হয়। ১৬ নভেম্বর খুলনার করিমনগরে আলাউদ্দিন মৃধাকে তার বাড়ির ভেতর গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। গত ৮ ডিসেম্বর রাজধানীর মোহাম্মদপুরে মা ও মেয়েকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় পুলিশ ঘাতক গৃহকর্মীকে গ্রেফতারও করে।

গত ১১ ডিসেম্বর পুরান ঢাকার শ্যামবাজারে আবদুর রহমান ভূঁইয়া (৫৫) নামে এক মসলা ব্যবসায়ীকে দোকানে ঢুকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়।

গত ৯ জুলাই রাজধানীর মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় ভাঙারি পণ্যের ব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগকে (৩৯)। হত্যার আগে ডেকে নিয়ে তাকে পিটিয়ে এবং ইট-পাথরের টুকরা দিয়ে আঘাত করে মাথা ও শরীরের বিভিন্ন অংশ থেঁতলে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে তাকে বিবস্ত্র করা হয়। তার শরীরের ওপর উঠে লাফায় দুর্বৃত্তরা।

ডিএমপির দেওয়া তথ্য মতে, ২০২৫ সালের প্রথম ১০ মাসে রাজধানীতে ১৯৮টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।

এএডি/


Loading...
Loading...
শেষ পাতা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: