খালেদার ক্ষমতা ও প্রতিরোধের এক জীবন

সময়ের আলো ডেস্ক

শেষ পাতা

চলতি ডিসেম্বরের শুরুতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) একজন তৃণমূলকর্মী ৪৮ বছর বয়সি টিপু সুলতান ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে একটি প্ল্যাকার্ড

2025-12-31T01:11:50+00:00
2025-12-31T01:11:50+00:00
 
  সোমবার, ৮ জুন ২০২৬,
২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
সোমবার, ৮ জুন ২০২৬
শেষ পাতা
খালেদার ক্ষমতা ও প্রতিরোধের এক জীবন
আলজাজিরার বিশ্লেষণ
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫, ১:১১ এএম   (ভিজিট : ১৭৪)
গ্রাফিক : সময়ের আলো
চলতি ডিসেম্বরের শুরুতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) একজন তৃণমূলকর্মী ৪৮ বছর বয়সি টিপু সুলতান ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে একটি প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে অবস্থান নেন। তাতে লেখা ছিল- আমি খালেদা জিয়াকে আমার কিডনি দান করতে চাই। সুলতান ও তার প্ল্যাকার্ডের ভিডিওটি দ্রুত ভাইরাল হয়ে পড়ে ১৭ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশে। কারণ তখন থেকেই দেশজুড়ে উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ২৩ নভেম্বর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই পরিস্থিতি ছিল অনিশ্চিত। 

টিপু সুলতান এরপর থেকে হাসপাতালের গেটের বিপরীত ফুটপাথে দিন কাটাতে থাকেন। প্রতিজ্ঞা করেন, সুস্থতার খবর না পাওয়া পর্যন্ত তিনি সেখানেই থাকবেন। তিনি আলজাজিরাকে বলেন, তিনি আমার মায়ের মতো। গণতন্ত্রের জন্য তিনি সবকিছু ত্যাগ করেছেন। তিনি আরও যোগ করেন, আমার একমাত্র প্রার্থনা, আল্লাহ যেন তাকে আসন্ন নির্বাচনটা দেখে যাওয়ার সুযোগ দেন।  ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের কথা উল্লেখ করছিলেন তিনি। কিন্তু সেই প্রার্থনা পূরণ হলো না। ৩০ ডিসেম্বর শীতের ভোরে, ৭৯ বছর বয়সে হাসপাতালে মারা গেলেন খালেদা জিয়া। দলীয় বিবৃতিতে এ তথ্য জানায় বিএনপি। ফেসবুকে দেওয়া বিবৃতিতে দলটি জানায়, আমাদের প্রিয় জাতীয় নেত্রী আর আমাদের মাঝে নেই। আজ ভোর ৬টায় তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। 

খালেদা জিয়ার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ও গণঅভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে নির্বাসিত। ফলে খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাজনীতির এক দীর্ঘ অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল। কেননা তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে এই দুই নেত্রী রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন, যারা পরিচিত ছিলেন ‘বেটলিং বেগমস’ নামে। বেগম উপাধিটি মুসলিম সমাজে সাধারণত ক্ষমতাধর নারীদের জন্য ব্যবহৃত হয়। তবে গণহত্যাকারী পলাতক হাসিনার মতোই খালেদা জিয়ার উত্তরাধিকারও একরৈখিক নয় বরং অনেকটা ধূসর। একদা দুজনই গণতন্ত্রের পক্ষে, স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়েছেন। তবে কখনো খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ ওঠেনি। আলজাজিরা লিখেছে, তবে খালেদা জিয়া ছিলেন প্রবলভাবে বিভাজন সৃষ্টিকারী এক রাজনৈতিক চরিত্র। বিরোধী দলে থাকাকালে তার কঠোর অবস্থান, নির্বাচন বর্জন, দীর্ঘ আন্দোলন এবং ক্ষমতায় থাকাকালে দুর্নীতির অভিযোগ ইত্যাদি মিলিয়ে তিনি যেমন সমর্থকদের মধ্যে গভীর আনুগত্য তৈরি করেছিলেন, তেমনি সমালোচকদের মধ্যে জন্ম দিয়েছিলেন গভীর অবিশ্বাস। 

খালেদা জিয়ার উত্থান : খালেদা জিয়ার জন্ম ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট, দিনাজপুরে। তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের পূর্ববঙ্গ, বর্তমান বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে। তার বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ছিলেন ফেনীর বাসিন্দা। দেশভাগের আগে তিনি ভারতের জলপাইগুড়িতে চা ব্যবসা করতেন। পরে পরিবারসহ পূর্ববঙ্গে চলে আসেন, যা ১৯৪৭-এর পর পূর্ব পাকিস্তান হয়। খালেদা জিয়া দিনাজপুর গভর্নমেন্ট গার্লস হাই স্কুলে পড়াশোনা করেন, পরে ভর্তি হন সুরেন্দ্রনাথ কলেজে। রাজনীতিতে তার প্রবেশ কোনো উচ্চাকাক্সক্ষার ফল ছিল না। তা ছিল এক গভীর বিপর্যয়ের পরিণতি। 

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে তার স্বামী, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন। জিয়া দেশকে ধারাবাহিক অভ্যুত্থানের অস্থিরতা থেকে স্থিতিশীল করেছিলেন। তার মৃত্যুতে বিএনপি হঠাৎ করেই প্রতিষ্ঠাতাবিহীন হয়ে পড়ে। যদিও স্বামী রাষ্ট্রপতি থাকাকালে খালেদা জিয়া সক্রিয় রাজনীতিতে ছিলেন না, তবু বিএনপির শীর্ষ নেতারা মনে করেন, তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে এবং জিয়ার উত্তরাধিকার বহন করতে পারবেন। 

জিয়ার মৃত্যুর পর ভাইস প্রেসিডেন্ট আবদুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি হন। কিন্তু ১৯৮২ সালের মার্চে সেনাপ্রধান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানে ক্ষমতা দখল করে সামরিক আইন জারি করেন। এই অস্থির পরিস্থিতিতেই খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্থান শুরু। ১৯৮২ সালে বিএনপির সাধারণ সদস্য, ১৯৮৩ সালে ভাইস চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন তিনি। পরবর্তী সময়ে তিনবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। এই সময়ের মধ্যেই তার ব্যক্তিগত জীবনেও নেমে আসে একের পর এক ট্র‍্যাজেডি। বড় ছেলে তারেক রহমান ২০০৮ সালে সামরিকসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে গ্রেফতার হয়ে নির্বাসনে যান। ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো ২০১৫ সালে বিদেশে হৃদরোগে মারা যান। ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মিথ্যা দুর্নীতি মামলায় দণ্ডিত হয়ে দীর্ঘ সময় কারাবন্দি থাকেন খালেদা জিয়া। তার স্বাস্থ্য ক্রমেই ভেঙে পড়ে। পরে নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমানের বিরুদ্ধে মামলাগুলো প্রত্যাহার হয়। তিনি গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী বলেন, খালেদা জিয়ার পুরো জীবন ছিল সংগ্রামে ভরা। তবু তিনি ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যের চেয়ে দেশকে বেছে নিয়েছেন। সে কারণেই তিনি রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে এক সময়ের প্রতীকী নেতা হিসেবে স্মরণীয়। 

রাজনীতির আগের খালেদা জিয়া : রাজনীতিতে আসার আগে খালেদা জিয়াকে যারা চিনতেন, তারা তাকে শান্ত, সংযত ও ভদ্র একজন মানুষ হিসেবেই দেখেছেন। ১৯৬০ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানকে বিয়ে করেন। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের পর জিয়ার উত্থান, ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতি হওয়া এবং ১৯৭৮ সালে বিএনপি গঠন এই রাজনৈতিক উত্তরাধিকারই পরে বহন করেন খালেদা জিয়া। ১৯৭৮ থেকে ১৯৮১ পর্যন্ত তিনি ঢাকা সেনানিবাসের মইনুল রোডের একটি সাধারণ সামরিক বাসভবনে থাকতেন। সে সময় তার স্বামীর এডিসি ছিলেন ক্যাপ্টেন (পরে কর্নেল) হারুনুর রশীদ খান। হারুনুর রশীদ খান বলেন, তিনি নিজেই সংসার সামলাতেন, অতিথিদের স্বাগত জানাতেন। কখনো তাকে উচ্চস্বরে কথা বলতে দেখিনি। ৩০ মে ১৯৮১-এর ভোরে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার খবর আসে। হারুনুর রশীদ বলেন, রেডিওতে ঘোষণার সময় তিনি আমার চোখের দিকে তাকালেন। কিছু না বলেই বুঝে গেলেন। তিনি মাটিতে বসে পড়লেন। এই ঘটনার পরই খালেদা জিয়ার জীবন চিরতরে বদলে যায়। 

প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী : এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মধ্য দিয়েই খালেদা জিয়া হয়ে উঠেন বেসামরিক রাজনীতির প্রধান মুখ। ১৯৯১ সালে সামরিক শাসনের অবসানের পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করে এবং খালেদা জিয়া হন বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচিত নারী প্রধানমন্ত্রী। 

শাসন, সাফল্য ও বিতর্ক : খালেদা জিয়া তিন দফায় প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ১৯৯১-৯৬, স্বল্প সময়ের জন্য ১৯৯৬ এবং ২০০১-০৬ সালে। সমর্থকদের মতে- তার সরকার অর্থনৈতিক উদারীকরণ, পোশাক শিল্পের বিস্তার, শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বাড়াতে ভূমিকা রাখে। ২০০৬ সালে মেয়াদ শেষে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৭ শতাংশ। তবে বিতর্কও কম ছিল না। সার সংকট, কৃষক নিহত হওয়ার ঘটনা, তারেক রহমানকে ঘিরে হাওয়া ভবন বিতর্ক, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা, অস্ত্র চোরাচালান মামলা সব মিলিয়ে তার শাসনামল প্রশ্নবিদ্ধ হয়। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির সামরিক সমর্থিত রাজনৈতিক পালাবদলের মধ্য দিয়ে তিনি ও হাসিনা দুজনই রাজনীতির বাইরে চলে যান। 

উত্তরাধিকার ও ভবিষ্যৎ : খালেদা জিয়ার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক উত্তরাধিকার গণতন্ত্রের প্রশ্নে আপসহীনতা। তিনি দেশ ছাড়েননি, প্রতিশোধমূলক ভাষা ব্যবহার করেননি, এমনকি ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার পতনের পরও সংযমের আহ্বান জানিয়েছিলেন। এখন প্রশ্ন একটাই খালেদা জিয়া-পরবর্তী বিএনপি কোথায় যাবে? দৃষ্টি এখন তার একমাত্র জীবিত পুত্র তারেক রহমানের দিকে। ফেব্রুয়ারির নির্বাচন শুধু সরকার গঠনের লড়াই নয়। এটি একটি রায়ও। জনগণ বাংলাদেশকে কি খালেদা জিয়ার উত্তরাধিকার তার পুত্রের হাতে তুলে দিতে প্রস্তুত? এটাই এখন প্রশ্ন। 

সময়ের আলো/এনএ 

  বিষয়:   আলজাজিরার বিশ্লেষণ  খালেদার ক্ষমতা  প্রতিরোধ  এক জীবন 


Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: