একের পর এক যুদ্ধের দামামা, জাতিগত নিধন, বর্ণবাদী নিপীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনসহ বেশকিছু কারণে বিশ্বে হু হু করে বাড়ছে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা। বিশেষ করে অতিসম্প্রতি ভয়াবহ রূপ নেওয়া ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ, গাজায় ইসরাইলি গণহত্যা, ইউক্রেন-রাশিয়ার দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে চলমান রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতা এ সমস্যাকে আরও প্রকট করে তুলছে। একই সঙ্গে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে জড়ানো, মিয়ানমারে জান্তা সরকারের সঙ্গে আরাকান আর্মির গৃহযুদ্ধ, সিরিয়ার গৃহযুদ্ধসহ বিভিন্ন সংঘাতে অস্থিতিশীলতা থেকে বাঁচতে মানুষ নিজের সহায় সম্বল ছেড়ে অন্য দেশে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। এরকম উদ্বাস্তুদের আশ্রয় দানকারী দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বর্তমানে এ দেশে কয়েক লাখ বিহারি ও রোহিঙ্গা শরণার্থী অবস্থান করছে। এর মধ্যে ১৩ লাখেরও বেশি মিয়ানমারের রোহিঙ্গা শরণার্থী। যাদের প্রত্যাবাসনে কোনো আশার খবর দিতে পারছে না সংশ্লিষ্ট কেউ। উল্টো দেশের অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠেছেন তারা। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই আজ বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব শরণার্থী দিবস’।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য আরাকান আর্মি দখলে নেওয়ায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন অনেকটাই অন্ধকারে চলে গেছে। সেই সঙ্গে বিশ্বে নতুন করে শরণার্থী বৃদ্ধি পাওয়ার শঙ্কায় রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা কমার শঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে বাংলাদেশ ১৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিলেও এখনও জাতিসংঘের ১৯৫১ সালের শরণার্থীবিষয়ক কনভেনশন ও ১৯৬৭ সালের শরণার্থীবিষয়ক প্রটোকলে সই করেনি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ কনভেনশন ও প্রটোকলে সই না করায় শরণার্থী সংকট মোকাবিলা করা বাংলাদেশের জন্য দুরূহ। কেননা শরণার্থীদের প্রশ্নে দেশে কোনো নির্দিষ্ট আইন এখনও তৈরি করা হয়নি। এর ফলে বর্তমানে বিপুলসংখ্যক শরণার্থী জনগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ করা ও তাদের সুরক্ষার পাশাপাশি দেশের নাগরিকদের সঙ্গে সম্পর্ক নির্ধারণ, তাদের প্রাত্যহিক জীবনযাপন এবং সন্তানদের নাগরিকত্বের বিষয়টি সুরাহা করা সম্ভব নয়। যদিও শরণার্থীদের আইন ও অধিকারের প্রশ্নে বিশেষ আইন প্রণয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নির্দেশনা চেয়ে ২০১৭ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করা হলেও পরে সেটি খারিজ করে দেন আদালত। তবে বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে জাতিসংঘ সনদগুলোতে সই এবং শরণার্থীদের দেশীয় আইনের কাঠামোতে আনা জরুরি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
৬৯ শতাংশ শরণার্থী ৫ দেশের : জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিশ্বে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ১২ কোটি ১২ লাখ, যা ২০২৩ সালের চেয়ে ৬ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। বাস্তুচ্যুত মানুষের মধ্যে শিশু ৪০ শতাংশ (৪ কোটি ৪৯ লাখ) এবং শরণার্থীর সংখ্যা ৩ কোটি ৬৮ লাখ। আর বিশ্বে শরণার্থী হিসেবে বিভিন্ন দেশে থাকা মানুষের ৬৯ শতাংশের উৎস ৫ দেশ। এই ৫ দেশের মধ্যে ভেনেজুয়েলা থেকে ৬২ লাখ, সিরিয়া থেকে ৬০ লাখ, আফগানিস্তান থেকে ৫৮ লাখ, ইউক্রেন থেকে ৫১ লাখ ও দক্ষিণ সুদান থেকে ২৩ লাখ মানুষ বিভিন্ন দেশে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছে। ইউএনএইচসিআরের পরিসংখ্যান বলছে, ৩৭ শতাংশ শরণার্থী অবস্থান করছে ৫টি দেশে। এর মধ্যে ইরানে রয়েছে ৩৫ লাখ, তুর্কিতে রয়েছে ৩৩ লাখ, কলম্বিয়াতে রয়েছে ২৮ লাখ, জার্মানিতে ২৭ লাখ ও উগান্ডায় রয়েছে ১৮ লাখ। প্রতি বছর শরণার্থী হিসেবে জন্ম নিচ্ছে ২৩ লাখ শিশু। মোট শরণার্থীর ৭৩ শতাংশের আশ্রয়দাতা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত দেশ এবং ৬৭ শতাংশ শরণার্থীর আশ্রয়দাতা প্রতিবেশী দেশ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বর্তমানে ১৩ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছে। শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়ের (আরআরআরসি) তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে অবস্থানরত নিবন্ধিত রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ১০ লাখ ৫ হাজার ৫২০ জন। এর মধ্যে ২ লাখ ৪ হাজার ২৭৪টি পরিবার রয়েছে। বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের মধ্যে ৫২ শতাংশ শিশু, ৪৪ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক, ৪ শতাংশ বয়স্ক রয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের মধ্যে ৪ লাখ ৯২ হাজার ৭০৫ জন পুরুষ (৪৯%), ৫ লাখ ১২ হাজার ৮১৫ জন মহিলা (৫১%) রয়েছে। বাংলাদেশে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রতি বছর ৩০ হাজার নতুন শিশু জন্মগ্রহণ করছে।
অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার হুমকি রোহিঙ্গা : বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মুনীরুজ্জামান সময়ের আলোকে বলেন, রোহিঙ্গা সংকট মানবিক সমস্যা থেকে অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। কারণ তারা স্থানীয়দের সঙ্গে বিবাদ, খুনোখুনি, ডাকাতি, অপহরণের মতো ঘটনা ঘটিয়ে শান্তি বিঘ্নিত করছে। মিয়ানমার থেকে মাদকের চালান আনা, মানব পাচার ও অবৈধভাবে সীমান্তের ওপার থেকে অস্ত্র আনার মতো কাজ করে যাচ্ছে। এগুলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। এ ছাড়া আঞ্চলিক বিভিন্ন বিষয়ে তারা জড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে মিয়ানমার সেনাবাহিনীতে জনবল সরবরাহ, বিভিন্ন উগ্রবাদী সংগঠনে যুক্ত হওয়ার মতো কাজ করে যাচ্ছে, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন বিষয়ে তিনি বলেন, গত এপ্রিলের শুরুতে ব্যাংককে একটি সম্মেলন চলাকালে ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গা ফেরত নেওয়ার কথা জানানো হলেও বাস্তবে সেটি সম্ভব হবে না। কারণ রাখাইন বর্তমানে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আরাকান আর্মি পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, তারা রোহিঙ্গাদের ফেরত নেবে না। রোহিঙ্গারা আরসা ও আরএসও সংগঠনের মাধ্যমে আরাকান আর্মির সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়ায় তাদের প্রত্যাবাসন পথ আরও কঠিন হয়ে গেছে। এখন প্রত্যাবাসন নিয়ে কেউ কিছু বললে সেটি আশার বাণী ছাড়া কিছুই না।
বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে শরণার্থী বাড়ছে জানিয়ে মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মুনীরুজ্জামান বলেন, গাজা, সিরিয়া, ইউক্রেনের পর ইরানেও শরণার্থী বাড়বে বলে মনে হচ্ছে। যদি এভাবে শরণার্থী বাড়তে থাকে তা হলে রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশ যে সহায়তা পেত সেটি আরও কমে যাবে। কারণ দাতারা তখন অন্যদিকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নেবে।
অন্যদিকে এত বিপুলসংখ্যক শরণার্থীকে সহায়তা দিতে দিতে দাতারা ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছে। এমনিতেও যেভাবে আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন সেটি পাচ্ছে না বাংলাদেশ। অপরদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেও বাংলাদেশে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। ফলে এসব বিষয় চিন্তা করে বাংলাদেশকে প্রস্তুতি নিতে হবে।
শরণার্থীবিষয়ক কনভেনশনে সই করা জরুরি : সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া সময়ের আলোকে বলেন, বাংলাদেশ এখনও ১৯৫১ সালের শরণার্থীবিষয়ক কনভেনশন ও ১৯৬৭ সালের শরণার্থীবিষয়ক প্রটোকলে সই করেনি। এর কারণ হচ্ছে বাংলাদেশ শরণার্থীদের আশ্রয়দাতা হবে সেই চিন্তা কখনো ছিল না। তবে ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা ঢলের পর বিষয়টি বড় আকারে সামনে আসে। এরপর বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসনের দিকে বেশি ফোকাস করে। সম্প্রতি মানবিক করিডোর ইস্যুতে প্রত্যাবাসন বিষয়টি অনেকটাই দূরে চলে গেছে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে কূটনৈতিক আলোচনা অব্যাহত রাখতে হবে। একই সঙ্গে প্রত্যাবাসন যেহেতু সহসাই হচ্ছে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিতে জাতিসংঘের যে সনদগুলো রয়েছে সেগুলোতে সই করা জরুরি হয়ে গেছে। কেননা রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে ইতিমধ্যে ৫০ হাজারের বেশি শিশু জন্ম নিয়েছে। তাদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া শরণার্থীদের দেশীয় আইনে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মানুষও বাস্তুচ্যুত হয়ে ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বিহারিরা শরণার্থী হিসেবেই ছিল। অনেক বছর পরে উচ্চ আদালতের নির্দেশে তারা জাতীয় পরিচয়পত্র পায়। তবে তাদের পাসপোর্ট প্রাপ্তি নিয়ে অনেক জটিলতা দেখা দেয়। তারা এখনও সামাজিকভাবে একীভূত হতে পারেনি। উল্টো ক্যাম্পেই কাটছে জীবন। এর কারণ রাষ্ট্র তাদের পুনর্বাসনের জন্য সেভাবে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এ জন্য শরণার্থীদের নির্দিষ্ট আইনের কাঠামোর আওতায় আনা উচিত।
মোড়ল রাষ্ট্রে ‘ভয়েস রেইজ’ করতে হবে : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান সহযোগী অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী সময়ের আলোকে বলেন, একবিংশ শতাব্দী হওয়ার কথা ছিল মানবাধিকার রক্ষার শতাব্দী। কিন্তু বিশ্ব পুঁজির পেছনে ছুটতে গিয়ে অনেকে পরাক্রমশালী হয়ে যাচ্ছে। নেতৃত্বের হিপোক্রেসির জন্য সিরিয়া, ইরাক, ফিলিস্তিন, ইউক্রেন ও কাশ্মিরে কী ঘটেছে এটি সবারই জানা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বড় শঙ্কার জায়গা রোহিঙ্গা শরণার্থী। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে-নিকট ভবিষ্যতে এ রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের আশা নেই। কারণ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সময়েই বিষয়টি নুইয়ে গেছে। ভবিষ্যতে যে সরকারই আসুক তাদের সফল হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। তিনি আরও বলেন, মোড়ল রাষ্ট্রগুলো জাতিসংঘকে পিকনিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার নামে শরণার্থী সমস্যার মতো গুরুতর বিষয়গুলো জিইয়ে রাখছে। এ ক্ষেত্রে ওই মোড়ল রাষ্ট্রগুলোতে শরণার্থী সমস্যা নিয়ে ‘ভয়েস রেইজ’ করতে হবে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (অতিরিক্ত সচিব) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান সময়ের আলোকে বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ে বলার মতো কোনো তথ্য আমার কাছে নেই। এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, শরণার্থী দিবস হিসেবে ইউএনের উদ্যোগে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেবে রোহিঙ্গারা।
বিশ্ব শরণার্থী দিবস আজ : এবারও বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে পালিত হবে বিশ্ব শরণার্থী দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য-‘শরণার্থীদের সঙ্গে সংহতি’। দিবসটি উপলক্ষে বাংলাদেশেও নানা কর্মসূচি পালিত হবে। উল্লেখ্য, ২০০১ সালের ২০ জুন প্রথম বিশ্ব শরণার্থী দিবস পালিত হয়। ২০০০ সালের ডিসেম্বরের আগে দিবসটি আফ্রিকা শরণার্থী দিবস হিসেবে পালিত হতো। ১৯৫১ সালে শরণার্থীদের স্বীকৃতির বিষয়ে জাতিসংঘের সনদ গৃহীত হয়।