একসময় অপ্রচলিত এবং প্রায় অনালোচিত ফল হিসেবে বিবেচিত হলেও বর্তমানে কৃষকদের মধ্যে লটকন চাষে আগ্রহ লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। পুষ্টিগুণে ভরপুর ও অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হওয়ায় চাষিরা এখন বাণিজ্যিকভাবে লটকন আবাদে ঝুঁকছেন, যা দেশের ফল উৎপাদন খাতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। উত্তরের জেলা গাইবান্ধার চাষিরাও অপ্রচলিত এ ফল চাষে দিন দিন আগ্রহী হয়ে উঠছেন। সম্প্রতি তাদের কাছে লাভজনক ফল হিসেবে এর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে। লটকন একটি উচ্চমূল্যের ফল। বাজারে এর চাহিদা প্রচুর এবং দামও ভালো পাওয়া যায়। একবার গাছ রোপণ করলে দীর্ঘ বছর ফলন পাওয়া যায়, যা কৃষকদের জন্য টেকসই আয়ের উৎস। অন্যান্য অনেক ফলের তুলনায় লটকন গাছের পরিচর্যা তুলনামূলকভাবে কম। একবার চারা রোপণ করা হলে নিয়মিত সার ও পানির জোগান দিলেই ভালো ফলন পাওয়া যায়। এ ছাড়া লটকন গাছ বিভিন্ন রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ প্রতিরোধে সক্ষম। ফলে কীটনাশকের ব্যবহার কম হয়, যা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
আম, জাম, লিচু এবং কাঁঠালের পাশাপাশি গাইবান্ধায় পাকতে শুরু করেছে সুস্বাদু ও পুষ্টিগুণ সম্পন্ন টক-মিষ্টি রসে ভরা মৌসুমি ফল লটকন। বৃষ্টিভেজা বর্ষায় যেসব মৌসুমি ফলের দেখা মেলে এর মধ্যে লটকন ছোট-বড় সবারই মন কেড়ে নেয়। গাইবান্ধা সদর উপজেলার বল্লমঝাড় ইউনিয়নের মাঠেরপাড় গ্রামের চাষিরা জানান, স্বল্প ব্যয় আর নামমাত্র পরিচর্যায় গাছে অভাবনীয় ফলন আসায় দিন দিন বাড়ছে লটকন চাষ। এখন বাজারে লটকন বিক্রি করছেন তারা। ভালো দাম পেয়ে চাষিরা সবাই খুশি।
সাদুল্লাপুর উপজেলার ভাতগ্রাম ইউনিয়নের কৃষ্ণপুর গ্রামের কৃষক মাহাবুব আলম তানজিল বলেন, বাণিজ্যিকভাবে লটকন আবাদের লক্ষ্য নিয়ে ঈশ্বরদী থেকে চারা এনে তিনি লটকন বাগান গড়ে তুলেছেন। চারা রোপণের তিন বছর পর থেকে গাছে ফল ধরতে শুরু করে। লটকন চাষে কম পরিশ্রমে ভালো ফলন পাওয়া যায়। একেকটি গাছে দুই থেকে তিন মণ ফল পাওয়া যায়। প্রতি কেজি লটকন ৬০-৮০ টাকা দরে বিক্রি করা যায়। বাগানের ৬০টি গাছ থেকে তিনি প্রতি মৌসুমে ন্যূনতম তিন লক্ষাধিক টাকার লটকন বিক্রি করছেন। প্রতি বছর বেপারিরা এসে বাগান থেকে লটকন কিনে নিয়ে যায়। গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যানুসারে, জেলার সাত উপজেলায় প্রায় সাড়ে ১৭ হেক্টর জমিতে লটকন বাগান রয়েছে। এ ছাড়া গোবিন্দগঞ্জ ও সাদুল্লাপুর উপজেলায় বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে গড়ে ওঠা দুটি বাগানে সহস্রাধিক গাছ রয়েছে।
কৃষিবিদ সাদেকুল ইসলাম গোলাপ জানান, বিশ্বের প্রায় সাত শতাধিক অপ্রচলিত ফলের মধ্যে লটকন অন্যতম। লটকন একটি সুস্বাদু ও পুষ্টিকর ফল। লটকনের রস মিষ্টি ও স্বাদ সামান্য টক। দক্ষিণ এশিয়ার এ ফল ভারত ও মালয়েশিয়ায় প্রচুর উৎপাদিত হয়। ঐতিহ্যগতভাবে লটকন বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্ষিপ্তভাবে উৎপাদিত হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর বাণিজ্যিক সম্ভাবনা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে নরসিংদী, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, সিলেট এবং পঞ্চগড় অঞ্চলের মাটি ও জলবায়ু লটকন চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী হওয়ায় ওইসব এলাকায় লটকনের বাণিজ্যিক উৎপাদনে বাগান তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, যদিও লটকন চাষের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে, কিন্তু কিছু চ্যালেঞ্জও বিদ্যমান। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো উন্নত জাতের লটকন চারার সহজলভ্যতা এবং ফল সংরক্ষণে আধুনিক প্রযুক্তির অভাব। অনেক সময় একসঙ্গে প্রচুর ফল পেকে যাওয়ায় বাজারজাতকরণে সমস্যা হয় এবং কৃষক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন। তবে কৃষিবিজ্ঞানীরা লটকনের উন্নত জাত উদ্ভাবন এবং এর প্রক্রিয়াকরণ ও সংরক্ষণ পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা করছেন। লটকন থেকে জেলি, আচার এবং জুস তৈরির সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে, যা এর বাজার পরিসরকে আরও প্রসারিত করবে।
পুষ্টিবিদরা বলছেন, ১০০ গ্রাম লটকনে খাদ্যশক্তি আছে ৯২ কিলোক্যালরি। প্রতি ১০০ গ্রাম লটকনে ভিটামিন সি আছে ১৭৮ মিলিগ্রাম, ক্যালসিয়াম ১৬৯ মিলিগ্রাম, শর্করা ১৩৭ মিলিগ্রাম, পটাশিয়াম ১৭৭ মিলিগ্রাম, ভিটামিন বি-১ ১৪.০৪ মিলিগ্রাম, ভিটামিন বি-২ শূন্য দশমিক ২০ মিলিগ্রাম, আমিষ ১ দশমিক ৪২ গ্রাম, লৌহ ১০০ মিলিগ্রাম, চর্বি শূন্য দশমিক ৪৫ গ্রাম আর খনিজ পদার্থ আছে ৯ গ্রাম। এতে আরও আছে ভিটামিন সি, থায়ামিন ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট। ফলে লটকন খেলে মুখে ঘা হবে না। শরীর সুস্থ রাখতেও ফলটি বিশেষ কাজের। এর জলীয় অংশ রক্তশূন্যতা কমায়, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখে। এটি ত্বকের রুক্ষতা কমায়, শরীরে পানির সমতা ঠিক রাখে। এটি আর্থরাইটিস ও চর্মরোগের জন্য দারুণ উপকারী। কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতেও ভালো কাজ করে। লটকন খেলে বমিভাব কমে, খাওয়ায় রুচি বাড়ে। মানসিক চাপ কমাতেও ফলটি বিশেষ কার্যকর। তৃষ্ণা নিবারণে লটকন অতুলনীয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর গাইবান্ধার উপপরিচালক মো. খোরশেদ আলম বলেন, লটকন চাষে কৃষকদের ক্রমবর্ধমান আগ্রহ নিঃসন্দেহে দেশের কৃষি অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এটি শুধু কৃষকদের আয় বৃদ্ধি করবে না, বরং দেশের পুষ্টি চাহিদা মেটাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর লটকন চাষিদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও সহায়তা প্রদান করছে। মাঠপর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তারা চাষিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছেন। এসব উদ্যোগ লটকনকে এ অঞ্চলের একটি অর্থকরী ফলে পরিণত করতে সাহায্য করবে বলে আশা করছি।
সময়ের আলো/এমএইচ