ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ,
বৃষ্টির শব্দ আর এক গভীর অভাবের ভাষা হয়ে ওঠে একটি সন্ধ্যার গল্প। সন্ধ্যার নির্জনতায় এক কাপ চা শুধু পানীয় নয়, হয়ে ওঠে একান্ত অনুভবের মাধ্যম। যে চলে গিয়েছে, তারও কোনো না কোনো ছায়া থেকে যায়, ধোঁয়ার মতো—অস্পষ্ট, অথচ উপস্থিত।
এই শহরে কিছু সন্ধ্যা বড্ড ব্যক্তিগত। যখন জীবনের সমস্ত শব্দ মুছে যায়—রিকশার ঘণ্টা থেমে যায়, ফোনের স্ক্রিন নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে, তখনই আসে এমন এক সময়, যাকে শুধু ‘সন্ধ্যা’ বললে কম বলা হয়। যেন একধরনের শূন্যতা, যেখানে অতৃপ্তি মিশে থাকে, কুয়াশার মতো। ঠিক সেই সময়টায় দরকার পড়ে এক কাপ চায়ের। আর সেই চায়ের ধোঁয়ার ভেতরেই ভেসে ওঠে এমন এক মুখ—যে আসলে আর আসে না, ঠিক চলে যায়ও না।
তখনই ভারি গলায় কবীর সুমন গেয়ে ওঠে, ‘এক কাপ চায়ে আমি তোমাকে চাই….ডাইনে ও বায়ে আমি তোমাকে চাই….দেখা না-দেখায় আমি তোমাকে চাই…’ গানটা যতবার বাজে, ততবারই মনে হয়—এই পৃথিবীতে কিছু চাওয়া থাকে, যেগুলো সেভাবে উচ্চারিত নয়, কিন্তু প্রবল।
এমনই কোনো এক সন্ধ্যায় কেউ চুপচাপ বসে থাকে চায়ের কাপ হাতে। কোনো মুখ পাশে নেই, অথচ মনে হয় কারও নিঃশ্বাস ঠিক পাশেই লেগে আছে।
চায়ের সঙ্গে জুড়ে থাকে মানুষের অনেক গল্প। কোনোটা ভালোবাসার, কোনোটা বিচ্ছেদের, কেউ ফিরে আসার, কেউ কখনোই না আসার। কারও কাছে চা মানে প্রতীক্ষা। কারও কাছে চা মানে একটি মুখ—যাকে আর দেখা যায় না আবার ভুলেও যাওয়া যায় না।
মফস্বলের চায়ের দোকানগুলোতে এখনো বাজে পুরনো গান, যেখানে এখনো কেউ দ্বিতীয় কাপ রেখে দেয়, জানে কেউ আসবে না—তবু কাপটা পড়ে থাকে। আপনমনে ভাবে অপেক্ষার কিছু রীতি আছে, যা কখনো ভাঙে না।
জানালার পাশে বসে থাকা কোনো এক সন্ধ্যায় হঠাৎ হাওয়া এসে চোখে-মুখে লাগে। চায়ের কাপ ঠোঁটে নিয়ে কেউ বোঝে—এই অনুপস্থিতিটাও একধরনের উপস্থিতি।
কখনো কখনো চা শুধু চা থাকে না। সেটা হয়ে ওঠে কোনো স্পর্শ, নিঃশ্বাস, কোনো অব্যক্ত সংলাপ। কেউ হয়তো জিজ্ঞেস করবে—রেখে দেওয়া ‘দ্বিতীয় কাপটা কার জন্য?’ জবাবে বলা হয়—‘এক কাপ চায়ে আমি তোমাকে চাই—এটাই আমার সবচেয়ে ব্যক্তিগত বৃষ্টি।”
কিছু অনুভব, যাদের কোনো ঠিকানা নেই—তবু তারা ঠিক সময়মতো ফিরে আসে। বৃষ্টির মতো চায়ের ধোঁয়ার মতো। তোমার মতো।
আরআর