বিষাদের স্মৃতি নিয়ে খুলল মাইলস্টোন স্কুল, পাঠদান শুরু বুধবার

নিজস্ব প্রতিবেদক

শিক্ষা

বিমান দুর্ঘটনায় ভয়াবহ ট্র্যাজেডিতে সহপাঠীদের হারানোর বিষাদের স্মৃতি ও ক্ষত বুকে নিয়ে রোববার সীমিত পরিসরে খুলেছে রাজধানীর উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল

2025-08-03T22:32:21+00:00
2025-08-03T22:32:21+00:00
 
  শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬,
১৯ আষাঢ় ১৪৩৩
শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬
শিক্ষা
বিষাদের স্মৃতি নিয়ে খুলল মাইলস্টোন স্কুল, পাঠদান শুরু বুধবার
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: রোববার, ৩ আগস্ট, ২০২৫, ১০:৩২ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
বিমান দুর্ঘটনায় ভয়াবহ ট্র্যাজেডিতে সহপাঠীদের হারানোর বিষাদের স্মৃতি ও ক্ষত বুকে নিয়ে রোববার সীমিত পরিসরে খুলেছে রাজধানীর উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ। যদিও এদিন কোন ক্লাস হয়নি।

স্কুল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগামী বুধবার (৬ আগস্ট) থেকে পাঠদান কার্যক্রম শুরু হবে। শিক্ষার্থী ট্রমার মধ্যে আছে, আতঙ্কিত, তাদের কাউন্সেলিং করানো হচ্ছে। অভিভাবকদেরও কাউন্সেলিং করানো হচ্ছে। আগামী তিন মাস কাউন্সেলিং চালানো হবে। গত ২১ জুলাইয়ের বিমান দুর্ঘটনার পর শিক্ষার্থীদের মানসিক সহায়তা দিতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

কলেজের জনসংযোগ কর্মকর্তা শাহ বুলবুল জানান, নবম শ্রেণি থেকে ঊর্ধ্বতন শ্রেণির কয়েক হাজার শিক্ষার্থী রোববার সকালে ক্যাম্পাসে আসে এবং শিক্ষার্থীরা যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের আত্মার মাগফিরাত, আহত ব্যক্তিদের দ্রুত আরোগ্য কামনায় আয়োজিত দোয়া এবং শোক অনুষ্ঠানে অংশ নেয়। পরে নিজেদের মধ্যে কুশলাদি বিনিময় করে বাসায় ফিরে যায়।

রোববার (৩ আগস্ট) সকাল সোয়া ১০টার দিকে দিয়াবাড়ি গোলচত্বর-সংলগ্ন মাইলস্টোন কলেজে গিয়ে দেখা যায়, ইউনিফর্ম পরা শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে। কিছু কিছু শিক্ষার্থীর কাঁধে ব্যাগ রয়েছে।

কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী আরাফাত বলেন, সকাল সাড়ে ৮টায় এসেছি। কোনো ক্লাস হয়নি। টিচাররা আমাদের সঙ্গে কথা বলেছেন, ভালো-মন্দ খোঁজখবর নিয়েছেন। পরে দোয়া মাহফিলে অংশ নিয়েছি। এখন বাসায় চলে যাচ্ছি।

শিক্ষার্থী বেশি হওয়ায় কলেজ শাখার শিক্ষার্থীরা তিন ধাপে (সকাল ৯টা, সাড়ে ১০টা ও দুপুর ১২টা) শোক ও দোয়া অনুষ্ঠানে অংশ  নেয়। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মাইলস্টোনের লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) কামালউদ্দীন মিলনায়তনে গিয়ে দেখা যায়, দ্বিতীয় ধাপের শোক ও দোয়া অনুষ্ঠান  হয়। পুরো মিলনায়তনে শিক্ষার্থীতে পরিপূর্ণ। তাদের মধ্যে শোকের আবহ বিরাজ করছে।

অনুষ্ঠানে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা কর্নেল (অব.) নুরন নবী বলেন, যে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে গেল, যে ২৭টি ছোট শিশু নিঃশেষ হয়ে গেল, কীভাবে এটা আমরা মেনে নিতে পারি? আমাদের দুজন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। পাঁচজন শিক্ষক এখনো হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন। সঙ্গে আছে আরও ৩৩ জন শিক্ষার্থী। কী সান্ত্বনা দেব আমি এদের বাবা-মায়েদের? মাইলস্টোনের এক শিক্ষক দম্পতি দুর্ঘটনায় তাদের সন্তান হারিয়েছেন। এই শোক কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না।

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে নুরন নবী আরও বলেন, আমি অনেকের বাসায় গিয়েছি, যারা তাদের সন্তানদের হারিয়েছেন। কী সান্ত্বনা দেব? মা নির্বাক হয়ে আছেন, কথা বলতে পারছেন না। বাবাও শোকে পাথর হয়ে আছেন। এই শোক কাটিয়ে ওঠার নয়। এই শোক মা-বাবাদের তাদের মৃত্যুর সময়ও যন্ত্রণা দেবে।

মাইলস্টোন কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ জিয়াউল আলম বলেন, এ সময়ে কোনো ক্লাস বা পরীক্ষা হবে না। এর পরিবর্তে, শিক্ষার্থীরা শিক্ষক ও সহপাঠীদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ ও কথা বলার সুযোগ পাবে, যাতে ধীরে ধীরে ট্রমা কাটিয়ে মানসিক স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনা যায়।

তিনি বলেন, ২১ জুলাইয়ের বিমান দুর্ঘটনার পর থেকে পুরো ক্যাম্পাস শোকাচ্ছন্ন। এখন আমাদের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হচ্ছে শিক্ষার্থীরা, তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা।

অধ্যক্ষ বলেন, ‘আমার জীবনের সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা গত ২১ জুলাই ফেস করেছি। আমি আমার কক্ষ ভবন-১-এ কাজ করছিলাম। হঠাৎ একটা শব্দ। জানালা দিয়ে দেখি আগুন। দৌড়ে যাই। তখনো বিন্দুমাত্র সন্দেহ হয়নি কেউ এটাতে চলে যেতে পারে। হঠাৎ যখন দেখি এক শিক্ষার্থী ও এক ম্যাডাম পড়ে আছে, আমি শকড হই। মুহূর্তের জন্য নিজেকে হারিয়ে ফেলি।’

কলেজ শাখার শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে জিয়াউল আলম বলেন, তোমাদের ছোট ক্লাস টু, থ্রি ও ফোরের শিক্ষার্থীরা, তারা এখনো ট্রমাটাইজড। তোমরা অনেককেই হয়তো চেনো। তাদের বাসা তোমরা ভিজিট করতে যাও। ওদের সময় দাও।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে অধ্যক্ষ বলেন, নিজেদের এই ট্রমা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। যারা চলে গেছে, তাদের অনেকের বড় ভাইবোন তোমাদের সহপাঠী। ওদেরও সময় দাও, ট্রমা থেকে বের করে আনো। নিহত ব্যক্তিদের অভিভাবকদেরও সময় দাও। কলেজের এই গুমোট পরিবেশ, অস্বস্তিকর পরিবেশ থেকে আমরা বের হয়ে আসতে চাই। যদি আমরা এগিয়ে আসি, একে অন্যের পাশে দাঁড়াই, আশা করি দ্রুত এই অবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব।

অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে অধ্যক্ষ জিয়াউল আলম বলেন, যেসব শিক্ষার্থী ট্রমার মধ্যে আছে, আতঙ্কিত, তাদের কাউন্সেলিং করানো হচ্ছে। অভিভাবকদেরও কাউন্সেলিং করানো হচ্ছে। আগামী তিন মাস কাউন্সেলিং চালানো হবে। বেশির ভাগ অভিভাবক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পুরোপুরি খুলে দেওয়ার পক্ষে বলে জানান অধ্যক্ষ। 

তিনি বলেন, অভিভাবকেরা চাচ্ছেন, শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে আসুক। একজন আরেকজনের সঙ্গে দেখা হলে, শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বললে, তাদের ভেতরে যে আতঙ্ক, গুমোট অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে। তাই আগামী বুধবার থেকে পাঠদান কার্যক্রম শুরু হবে।

কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও উপদেষ্টা কর্নেল (অব.) নুরন নবী বলেন,  বিমান দুর্ঘটনার ঘটনায় ট্রমায় থাকা শিক্ষার্থীরা চাইলেই অন্য যে কোনো শাখায় বদলি হতে পারবে। আবার কেউ চাইলে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান বা যেখানে ইচ্ছা যেতে পারে। এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে।

তিনি বলেন, যদি কোনো শিক্ষার্থী এখান থেকে অন্য কোনো ক্যাম্পাস বা শাখায় যেতে চায়, তবে অভিভাবকদের আমরা বলেছি- তাদের যেখানে খুশি সেখানে নিয়ে যান। তবে এমন জায়গায় নিয়ে যান, যেখানে তার বন্ধু-বান্ধব আছে, যেন সে মানসিক স্বস্তি খুঁজে পায়।

দুর্ঘটনায় আক্রান্ত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসায় সরকারের ভূমিকার প্রশংসা করে নুরুন নবী বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় খুব সহযোগিতা করছে। ইতোমধ্যে ভারত, চীন ও সিঙ্গাপুর থেকে দক্ষ চিকিৎসক আনা হয়েছে। এ ধরনের মানসিক ট্রমা কাটিয়ে উঠতে উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন, সরকার সেটা নিশ্চিত করছে।

রোববার বিকালে সংবাদ মাধ্যমে পাঠানো এক বার্তায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে এখনো ৩৪ জন দগ্ধ রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর মধ্যে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ২৮ জন, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ৫ জন এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে একজন রোগী ভর্তি রয়েছেন। এর আগের দিন বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন ৪১ জন। আর বিমান দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত মোট মৃত্যু হয়েছে ৩৪ জনের।

সময়ের আলো/জেডআই


Loading...
Loading...
শিক্ষা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: