জুলাই আন্দোলন ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অগ্নিগর্ভ অধ্যায়। তখন দেশজুড়ে শিক্ষার্থীরা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে রাজপথে নামে। এই আন্দোলনকে বেগবান করতে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) এগিয়ে আসে। মুক্তির পণ নিয়ে মিছিলে নামে। সুন্দরের আশায় রাজপথে নামে।
১৪ জুলাই মধ্যরাতে চুয়েট ক্যাম্পাসে শুরু হয় প্রতিবাদ, মানববন্ধন, মশাল মিছিল। প্রতিবাদী স্লোগানে মুখর হয় রাত। পরদিন ১৫ জুলাই চট্টগ্রামের ২ নম্বর গেট ও ষোলোশহরে শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সন্ত্রাসীরা হামলা চালায়।
১৬ জুলাই শহরে চুয়েট শিক্ষার্থীদের বহনকারী বাসে হামলার ঘটনা ঘটে। সে বাসে ছিলেন পানি সম্পদ কৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ফারজিয়া রাফা। তিনি বলেন, ‘হঠাৎ করে কি থেকে জানি কি হয়ে গেল। ওরা দুইটা গেট দিয়ে উঠে পেছনের সিট থেকে সামনের সিট পর্যন্ত যাকে যেভাবে পারে মারতে মারতে আসে। আমার বাম সাইডের হাতে অনেক বেশি লাগে। চুয়েট মেডিকেল এ আসার পর বুঝি কতটা নির্মমভাবে আমাদের ওপর হামলা হয়েছে। সেদিন রাবার পাইপ ছিল আমাদের ভাগ্য। যদি আরও ভয়ংকর কিছু থাকত, তাহলে আমাদের কী হতো বলতে পারি না।’
সে হামলার প্রতিবাদে আন্দোলনকারীরা উত্থাপন করে তিন দফা দাবি—হামলার বিচার, ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ এবং ‘হল ভ্যাকেন্ট’ আদেশ প্রত্যাহার। কিন্তু এর বদলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের জোরপূর্বক হল ছাড়তে বাধ্য করে। হল থেকে ফেরার পথে অনেকেই পথে পথে হামলার শিকার হন। চুয়েট শিক্ষার্থীরা এরপর দেয়ালচিত্র ও গ্রাফিতি অঙ্কনের মাধ্যমে প্রতিবাদের নতুন ভাষা তৈরি করে।
পানিসম্পদ কৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আমিনুল ইসলাম রকিব বলেন, ‘১৬ জুলাই রাতে ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীরা আমাদের বাসে উঠে শিক্ষার্থীদের আক্রমণ করে। তখনই সিদ্ধান্ত নিই, এই সন্ত্রাসী রাজনীতি আর কখনো চুয়েট ক্যাম্পাসে থাকবে না। আমরা হামলাকারীদের শনাক্ত করলেও প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।’
কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মাহি আব্দুল্লাহ বলেন, ‘জুলাইয়ে ক্যাম্পাস বন্ধ থাকায় সবাই নিজ নিজ এলাকায় প্রতিরোধ গড়ে তোলে। প্রত্যেকের নিজস্ব চোখে দেখা জুলাইয়ের এক একটা আত্মকাহিনি আছে। এই স্মৃতিচারণ আমাদের সেই উদ্দেশ্যকে স্মরণ করিয়ে দেয়, যে জন্য এত রক্ত ঝরেছে। চুয়েটের এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে শিক্ষার্থীরা যেভাবে সাহস, একতা ও প্রতিরোধের নজির স্থাপন করেছে, তা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’
গণিত বিভাগের অধ্যাপক নুরুন নাহার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, জুলাই ফিরে এলো, শ্রাবণে ফাগুন আনা আবাবিল পাখিগুলোতো আর ফিরে এলো না। জুলাই শুধু বিপ্লব নয়, জুলাই বিস্ময়, কান্না, বেদনা—জুলাই আমার বীর সন্তান হারানোর।’
চুয়েট শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন শুধু একটি প্রতিবাদ নয়, বরং বাংলাদেশের গণতন্ত্রের পুনর্জন্মের শপথ। চুয়েট সেই ইতিহাসের গর্বিত অংশ, যাদের গল্প অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে ভবিষ্যতের প্রতিটি প্রজন্মের কাছে।
আরআর