একের পর এক যান্ত্রিক ত্রুটি রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের নিত্য দিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। উড্ডয়ন করতে গিয়ে রানওয়েতেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকা, চাকা খুলে পড়া, চাকা ফেটে যাওয়া, কেবিনের ভেতরের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া, কমোডের ফ্ল্যাস কাজ না করা, ইঞ্জিনে অতিরিক্ত কম্পন, কেবিন প্রেশারে ত্রুটি, ল্যান্ডিং গিয়ারের দরজা ঠিকভাবে বন্ধ না হওয়াসহ একের পর এক যান্ত্রিক ত্রুটিতে গত ১ মাসে বহরে থাকা ১৯টি উড়োজাহাজের ১৬টি উড়োজাহাজের যান্ত্রিক ত্রুটির ঘটনা ঘটেছে। এতে শিডিউল বিপর্যয়, যাত্রী কমে যাওয়ার পাশাপাশি বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে বিমানকে।
সরকারের পক্ষ থেকে যখন বিমানের জন্য একযোগে ২৫টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তখন নিজেদের কাছে থাকা বোয়িংগুলোতে একের পর এক যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়াকে ‘ষড়যন্ত্র’ বলে মনে করছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। এ ঘটনার ব্যাখ্যা চেয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
বিমানের সংশ্লিস্টরা বলছে, সম্প্রতি বিমানের উড়োজাহাজগুলোতে যান্ত্রিক ত্রুটির ঘটনা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেড়েছে, এটা সন্দেহজনক। দেখা গেছে, সরকার নতুন করে ২৫টি বোয়িং কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যান্ত্রিক ত্রুটির ঘটনা বেড়েছে। এটা ষড়যন্ত্র হতে পারে, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একের পর এক যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বিমানের গ্রাহক হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া এসব ঘটনায় ফ্লাইট পরিচালনায় দায়িত্বশীলদের গাফিলতি আছে কিনা, হ্যাঙ্গারে কর্মরত প্রকৌশলীদের গাফিলতি রয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কারও বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সর্বশেষ সোমবার ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে দুপুর ২টা ৩৪ মিনিটে উড্ডয়ন করে বিমান বহরের ড্যাশ-৮ ২০০ মডেলের (টুইন টার্বোপ্রপ ইঞ্জিন) উড়োজাহাজ দিয়ে পরিচালিত ফ্লাইটটি কিছুক্ষণ উড়ার পর ত্রুটি দেখা দেওয়ায় ২টা ৫৫ মিনিটে সেটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফিরে আসে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জনসংযোগ শাখার মহাব্যবস্থাপক এ বি এম রওশন কবীর জানিয়েছেন, উড়োজাহাজটির ভেতরের কেবিনের তাপমাত্রা অত্যধিক বেড়ে যাওয়ায় সেটি ঢাকায় ফিরিয়ে আনা হয়।
রোববার সন্ধ্যায় (ইতালির স্থানীয় সময়) বোয়িং ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজটি রোম থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে আসার কথা থাকলেও ফ্ল্যাপে সমস্যার কারণে এখন সেটি রোমের লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি বিমানবন্দরে ‘গ্রাউন্ডেড’ অবস্থায় রয়েছে।
এর আগে গত শনিবার সকালে ঢাকা থেকে সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি এয়ারপোর্টে নামার পর বিমানের একটি বোয়িংয়ে সমস্যা দেখা দিলে ২ ঘণ্টা রানওয়েতে আটকে থাকে বিমানটি। সেটি সারিয়ে দুই ঘণ্টা বিলম্বে উড়োজাহাজটি যাত্রীদের নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা করে।
তার আগে বৃহস্পতিবার রাতে বিমানের আবুধাবিগামী একটি বোয়িং উড়োজাহাজ ওড়ার ১ ঘণ্টা পর আবার ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফিরে আসে। উড়োজাহাজটির তিনটি টয়লেটেরই ফ্লাশ একযোগে কাজ না করায় ভেতরে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়, পরে পাইলট সেটিকে ঢাকায় ফিরিয়ে আনেন।
তার একদিন আগে বুধবার ঢাকা থেকে ওড়ার একঘণ্টা পর মিয়ানমারের আকাশ থেকে ফিরে আসে ব্যাংককগামী বিমানের একটি বোয়িং ৭৩৭ উড়োজাহাজ। ওড়ার কিছুক্ষণ পর ইঞ্জিনে অতিরিক্ত কম্পন হচ্ছে বুঝতে পেরে ঢাকায় ফিরে আসেন পাইলট।
এর আগে গত ৩০ জুলাই সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ বিমানবন্দরে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে প্রায় ছয় ঘণ্টা আটকে ছিল বিমানের একটি বোয়িং ৭৩৭ উড়োজাহাজ। নির্ধারিত সময়ের ৬ ঘণ্টা পরে বিমানটি ঢাকায় ফেরানো হয়।
এর দুদিন আগে ২৮ জুলাই ওড়ার পর কেবিন প্রেশারে ত্রুটির সংকেত পেয়ে আবার ঢাকায় ফিরে আসে বিমানের দাম্মামগামী একটি বোয়িং ৭৭৭- ইআর উড়োজাহাজ। পরে যাত্রীদের অন্য উড়োজাহাজে দাম্মাম পাঠানো হয়।
এর চারদিন আগে গত ২৪ জুলাই দুবাই থেকে চট্টগ্রামে এসে যান্ত্রিক ত্রুটির মুখে পড়ে বিমানের আরেকটি বোয়িং ড্রিমলাইনার। উড্ডয়নের কিছু সময় পর পাইলট ল্যান্ডিং গিয়ারের দরজা ঠিকভাবে বন্ধ না হওয়ার বিষয়টি শনাক্ত করলে সেটি আবার চট্টগ্রামে ফিরে যায়। ত্রুটি মেরামত শেষে দুই ঘণ্টা পর সেটি আবার ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করে।
এর আট দিন আগে গত ১৬ জুলাই রাতে ‘চাকায় ত্রুটি’ দেখা দেওয়ায় বিমানের দুবাই থেকে চট্টগ্রাম হয়ে ঢাকা রুটের একটি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজকে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ‘গ্রাউন্ডেড’ করা হয়। বিমানের আরেকটি ফ্লাইটে চাকা ও যন্ত্রাংশ পাঠানো পর উড়োজাহাজটি মেরামত করা হয়। ৩০ ঘণ্টা বিলম্বে দেশে ফেরে উড়োজাহাজটি।
সংশ্লিস্টরা বলছেন, একের পর এক যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ফ্লাইট শিডিউল বিঘ্নিত হচ্ছে। এসব কারণে বিমানে নিয়মিত ভ্রমণকারীরা ত্ক্তি-বিরক্ত হয়ে অন্য এয়ারলাইন্স বেছে নিচ্ছেন। ফলে যাত্রী হারানোর পাশাপাশি রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বিমান কর্তৃপক্ষ। এতে লাভের বদলে বিমানের লোকসানের পাল্লা ভারী হচ্ছে।
বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব ঘটনার মূলে রয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের প্রকৌশল বিভাগে নিয়োজিত কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীদের অবহেলা এবং দায়সারা দায়িত্ব পালন। এছাড়া, পুরনো বহরের কারণে বিমানের কারিগরী সমস্যার হার তুলনামূলক বেশি। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও যন্ত্রাংশের সরবরাহ ব্যবস্থায় দুর্বলতা থাকায় বিদেশে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হলে দ্রুত সমাধান পাওয়া যায় না। এতে আর্থিক ক্ষতি যেমন হয়, তেমনি দেশের জাতীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থার ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমন ঘটনা বার বার হতে থাকলে যান্ত্রীরা নিরাপত্তাহীনতা ভুগে এবং সেই এয়ারলাইনস থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।
এ বিষয়ে অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম সময়ের আলোকে বলেন, উড়োজাহাজের অভাবে বিমান ফ্লাইট পরিচালনা করতে পারছে না। যেগুলো আছে সেগুলো প্রায়ই যান্ত্রিক ত্রুটিতে পতিত হয়ে ফ্লাইটে ব্যঘাত ঘটাচ্ছে।স্বাভাবিকভাবেই বিমানের উপর যাত্রীদের আস্থা কমে যাবে। তারা অন্য এয়ারলাইনসে ভ্রমণ করবে। এতে বিমানের আর্থিক ক্ষতিতে পড়বে। বার বার কেন যান্ত্রীক ত্রুটি হচ্ছে তা বের করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জনসংযোগ শাখার মহাব্যবস্থাপক এ বি এম রওশন কবীর সময়ের আলোকে বলেন, কেন বার বার যান্ত্রিক ত্রুটি হচ্ছে, এ বিষয়ে ইঞ্জিনিয়াররিং বিভাগের কাছে জবাব চাওয়া হয়েছে। বিমানের ২১টি উড়োজাহাজ ছিল। ড্রাই লিজের ২টি ফেরত দেওয়া হচ্ছে। এখন ১৯টি উড়োজাহাজের মধ্যে কয়েকটি মেইনটেন্যান্সের জন্য হ্যাঙ্গারে আছে। নিয়ম অনুযায়ী এগুলো রুটিন চেক করতে হয়। তখন কিছু দিন সময় লাগে।
তিনি বলেন, বিমানের উড়োজাহাজের স্বল্পতা রয়েছে। কয়েকটি রুটে ফ্লাইট কমাতে হয়েছে। বিমান নতুন উড়োজাহাজ কেনা এবং লিজ নেওয়ার চেষ্টা করছে। শিগগিরই বিমানের বহরে নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হবে।
আরআর