‘সাদা পাথর শেষ। এখন শুধু বালি আর বালি। পাথরের চিহ্ন আর অবশিষ্ট নেই বললেই চলে।’ এভাবেই হতাশা ব্যক্ত করছিলেন সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার কলাবাড়ি গ্রামের আব্দুল আলিম। তিনি বললেন, ‘লুটেরাচক্র সব পাথর লুটে নিয়েছে। যে সাদা পাথরের আকর্ষণে পর্যটকরা এখানে আসতেন, সেখানে আর পাথর নেই। লাগামহীন লুটপাটে প্রায় পাথরহীন হয়ে পড়েছে পর্যটন এলাকা সাদাপাথর।’
তখন ২০১৭ সাল। সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জ পাথরমহালের ধলাই নদীর উৎসমুখে পাহাড়ি ঢলে ভর করে নেমে আসে পাথর। পাঁচ একর জায়গাজুড়ে জমা হয় সেসব পাথর। উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ পাহারা বসায় সেখানে। এলাকাটি সংরক্ষিত করে। সাদা পাথরে বিস্তীর্ণ হয়ে উঠে জনপদ। পাহাড় বেয়ে আসা স্বচ্ছ পানির স্পর্শে বিপুল সৌন্দর্য নিয়ে চোখে ধরা দেয় পাথর। গ্রীষ্মের রৌদ্রজ্জ্বলে চাকচিক্যময় হয়ে উঠে কোমল পানি আর পরিষ্কার পাথর। আকাশের নীল আর সাদা মেঘের ভেলার আবরণে ছায়ামায়ার ছবি হয়ে ধরে দেয় সাদা পাথর। ওই বছরই দেশ-বিদেশের পর্যটকদের নজর কাড়ে সাদা পাথর। মুখর হয়ে উঠে দূর-বহুদূরের পর্যটকদের পদভারে।
এর আগেও ১৯৯০ সালে পাথর জমা হয়েছিল এখানে। লুটেরাদের কালো থাবায় সেসব পাথর নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল।
জানা যায়, সাদা পাথর এলাকার ওপারে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পাহাড়ি অঞ্চল লুংলংপুঞ্জি ও শিলংয়ের চেরাপুঞ্জি। সেখানকার ঝরনা থেকে বয়ে আসা পানিতে সারা বছর নদীতে পানি প্রবহমাণ থাকে। বৃষ্টিবহুল চেরাপুঞ্জির পাদদেশ থেকে বর্ষায় ঢলের পানির সঙ্গে পাহাড় থেকে পাথরখণ্ড এপারে নেমে আসে। ভেসে আসা এই পাথর উত্তোলিত বা আমদানি করা পাথরের চেয়ে দামি। এটির কদরও বেশি। ব্যবহৃত হয় স্থাপত্যকাজে।
সম্প্রতি পাহাড়ি ঢলের সাথে ধলাই নদীর উৎসমুখ সাদা পাথরে নতুন করে বিপুল পরিমাণ পাথর জমে। কিন্তু পাথরখেকো চক্র প্রকাশ্যেই সেসব পাথর লুট করে নিয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন শত শত নৌকা দিয়ে লুটের পাথর পরিবহন করা হচ্ছে সিলেট ভোলাগঞ্জ আঞ্চলিক সড়ক দিয়ে। শুধু সাদা পাথরের পর্যটন কেন্দ্রের পাথর নয়, নদী তীরের বালি ও মাটি খুঁড়ে চলেছে লুটপাটের মহোৎসব। ব্যাপক লুটপাটের কারণে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত এলাকাটি একেবারে বিরাণভূমিতে পরিণত হয়েছে। দিন-রাতে সাদা পাথর এলাকায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ফাঁড়ি এলাকা মাড়িয়ে জিরো পয়েন্ট দিয়ে পাথর লুট হলেও তা থামানো যায়নি।
ভোলাগঞ্জে সাদা পাথরে প্রকাশ্যেই চলছে পাথর লুট। ছবি: সময়ের আলো
সরেজমিনে জানা গেছে, গত দুই সপ্তাহে সাদা পাথর এলাকায় কয়েক দফা পাহাড়ি ঢল নামে। প্রতিবারই ঢলের তোড়ে স্তরে স্তরে পাথর ও বালু নামে। বালুর স্তর সরিয়ে পাথর লুটপাট হয়েছে। স্থানীয় লোকজন বলছেন, দুই সপ্তাহে অন্তত শতকোটি টাকার পাথর লুট হয়েছে।
সাদা পাথর পর্যটন সৃষ্টি ও তদারকিসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালের মার্চ মাস থেকে মধ্য জুলাই পর্যন্ত মোট ১৩ দফা পাহাড়ি ঢল নেমেছিল। তখন উপজেলা প্রশাসন প্রাথমিকভাবে হিসাব করেছে, ঢলের তোড়ে ওপার থেকে পাথরের অন্তত ১৩টি আস্তরণ পড়ে। পাঁচ একর জায়গার ওপরে অন্তত ২০ ফুট পুরু পাথরের স্তর জমে। তখন উপজেলা প্রশাসন লুটপাট ঠেকিয়ে পাথরগুলো সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ২০১৭ সাল থেকে এটি সাদা পাথর পর্যটন এলাকা হিসেবে পরিচিতি পায়।
স্থানীয় পশ্চিম ইসলামপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান শাহ মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন বলেন, উপজেলা প্রশাসনের চেষ্টায় ২০১৭ সালে পাথর সংরক্ষিত হয়েছিল। তখনকার জেলা প্রশাসক ও ইউএনও নিজ উদ্যোগে পাহারার ব্যবস্থা করেছিলেন।
ভোলাগঞ্জে সাদা পাথরে প্রকাশ্যেই চলছে পাথর লুট। ছবি: সময়ের আলো
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, পাহাড়ি ঢল নেমে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় পর্যটকরা সাদা পাথরে যাচ্ছেন না। এই সুযোগে চলছে লুটপাট। গত এক সপ্তাহে দিন ও রাতে হাজারখানেক বারকি নৌকা ব্যবহার করে পাথর লুট হয়েছে।
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. শাহাবুদ্দিন জানান, দুর্বৃত্ত চক্রের কারণে কোনো অবস্থাতেই সাদা পাথরে লুটপাট বন্ধ করা যায়নি। আমি ব্যক্তিগত উদ্যোগে পাহারার ব্যবস্থা করেও সুফল পাইনি।
সার্বিক পরিস্থিতিতে সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া পুলিশের পক্ষে একা কিছু করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) উজায়ের মাহমুদ আদনান। তিনি বলেন, সাদা পাথর লুটের ঘটনার খবর পেলেই ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে স্পেশাল টাস্কফোর্সের টিম অভিযান চালায়।
সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার খান মো. রেজা-উন-নবী বলেন, সাদা পাথর পর্যটন স্পট খুঁড়ে পাথর উত্তোলনের ভিডিওটি আমি দেখেছি। পর্যটন স্পটে এ ধরনের কাজ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একটি টিম সেখানে পাঠিয়েছি পরিদর্শনের জন্য। অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন বন্ধে আমরা পুলিশ, বিজিবির সমন্বয়ে অভিযান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
আরআর