দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের বাজার দখল করে আছে মিয়ানমার থেকে আসা মাদক ইয়াবা। দেশে প্রচলিত মাদকগুলোর মধ্যে এই ইয়াবার বিস্তার ঠেকানোই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করা হয়। কিন্তু এর ফাঁকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সারা দেশে ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছে আলোচিত মাদক আইস (ক্রিস্টাল মেথ) ও কোকেনের। সময়ের সঙ্গে ধরা পড়তে শুরু করেছে বড় বড় চালান। বিভিন্ন সীমান্ত পথে এসব মাদক ইয়াবার মতোই ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র। তৈরি হচ্ছে সেবনকারীদের নতুন বাজার। যা উদ্বেগ ছড়াচ্ছে জনমনে।
সবশেষ গত সোমবার একই দিনে ১৩০ কোটি টাকা মূল্যের সাড়ে ৮ কেজি কোকেন ও ১ কেজি ৬০০ গ্রাম আইস জব্দ করা হয়। যা আইস ও কোকেনের ক্ষেত্রে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চালান বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ইয়াবা, কোকেন ও আইস ছাড়াও গাঁজা, ফেনসিডিল ও হেরোইনেও সয়লাব হয়ে গেছে সারা দেশ। বিশেষ করে পটপরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্বলতাকে সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়ে সারা দেশেই তৎপরতা বাড়িয়েছে মাদক কারবারিরা। সারা দেশে তারা তাদের কার্যক্রম চলমান রেখেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক মাদক কারবারি সিন্ডিকেটের সদস্যরা বাংলাদেশকে টার্গেট করে অতীতের তুলনায় সবচেয়ে বেশি সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এতে করে হেরোইন, আফিম ও কোকেন ছাড়াও অপ্রচলিত ভয়াবহ মাদকের চালান বাড়তে পারে দেশে। আবার বাংলাদেশকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশে মাদক পাচারও বেড়েছে। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে সত্যিকার জিরো টলারেন্স নীতি বলতে যেটি বোঝায় মাদকের ক্ষেত্রে সরকারকে সে রকম নীতি গ্রহণ করতে বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় ৪৫৩ কেজি আইস (মিথাইল অ্যামফিটামিন) জব্দ করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সংস্থা (ডিএনসি, পুলিশ, বিজিবি, র্যাব ও কোস্ট গার্ড)। এর মধ্যে ২০২০ সালে ৫৫ গ্রাম, ২০২১ সালে ৪ কেজি ৯৫৯ গ্রাম, ২০২২ সালে ৬ কেজি ৪৮২ গ্রাম, ২০২৩ সালে ৩ কেজি ৮৪৮ গ্রাম, ২০২৪ সালে ২ কেজি ৬৬৮ গ্রাম ও চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত ৫ মাসে ১ কেজি ৬ গ্রাম আইস জব্দ করা হয়।
সবশেষ গত শুক্রবার রাজধানীর শেখেরটেক এলাকা থেকে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চালান ১ কেজি ৬০০ গ্রাম ‘আইস’ উদ্ধার হয়। অর্থাৎ দেশে আইসের প্রবাহ দিন দিন যেমন বাড়ছে, একই সঙ্গে বাড়ছে আইস সেবনকারীর সংখ্যাও।
অন্যদিকে এখনও দেশে কোকেনের বাজার জমে না উঠলেও বিস্তার থেমে নেই। বিশেষ করে ২০২১ সালের পর দেশে কোকেনের বিস্তার বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে।
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০২১ সালে দেশে সব সংস্থা মিলে মাত্র ১ কেজি ৫৫ গ্রাম কোকেন জব্দ করেছিল। এরপর ২০২২ সালে ৪ কেজি ৫৭ গ্রাম, ২০২৩ সালে ১৩ কেজি ৩ গ্রাম জব্দ করা হয়। সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ২০২৪ সালে জব্দ করা ১৩০ কেজি ১৮৪ গ্রাম কোকেন। যা বিগত এক যুগে জব্দ কোকেনের পরিমাণের দ্বিগুণের চেয়েও বেশি। সবশেষ গত সোমবার রাতে রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাড়ে ৮ কেজি কোকেনসহ গায়েনার এক যাত্রীকে আটক করা হয়েছে। তার নাম এমএস কারেন পেতুলা স্টাফেল।
শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর এই তথ্য জানিয়ে বলেছে, জব্দ করা কোকেনের দাম প্রায় ১৩০ কোটি টাকা। শুধু যে কোকেন ও আইসের ভয়াবহ বিস্তার ঘটছে বিষয়টি তেমনও নয়। ইয়াবা, হেরোইন, গাঁজা, ফেনসিডিল, মদ ও বিয়ারেও সয়লাব সারা দেশ।
ডিএনসি সূত্র জানিয়েছে, ২০২৪ সালে ডিএনসিসহ সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ২ কোটি ২৮ লাখেরও বেশি ইয়াবা জব্দ করে। তবে চলতি ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র চার মাসে এ মাদক জব্দ হয় ১ কোটি ৩৮ লাখেরও বেশি। এর আগে ২০২৩ সালে ৪ কোটি ২৯ লাখ, ২০২২ সালে ৪ কোটি ৫৮ লাখ এবং ২০২১ সালে ৫ কোটি ৩০ লাখের বেশি ইয়াবা জব্দ করা হয়। এ ছাড়াও ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে সব সংস্থা মিলে ২ হাজার ১৯৩ কেজি হেরোইন, ২২৩ কেজি আফিম, ৪ লাখ ৭৮ হাজার ৬৫২ কেজি গাঁজা, ৩৩ লাখ ৪৩ হাজার ৬৩৭ বোতল ও ৬৪৬ লিটার ফেনসিডিল জব্দ করা হয়। আর চলতি বছরের প্রথম ৪ মাসে ৬৩ কেজি হেরোইন, ১ লাখ ৭৫ হাজার ২২৭ পিস ও ৭৬ লিটার ফেনসিডিল, ৮০০ গ্রাম আফিম, ৩৫ হাজার ১২১ কেজি গাঁজা, ৬৮ হাজার ৪৬৫ বোতল ও ৫ হাজার ১১৯ লিটার বিদেশি মদ, ৮ হাজার ৫২১ ক্যান ও ৫ হাজার ৩৫৪ বোতল বিয়ার জব্দ করা হয়েছে।
ডিএনসির গবেষণায় বলা হয়েছে, ভৌগোলিক কারণেই বাংলাদেশ মাদকের ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষ করে এশিয়ার গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল (মিয়ানমার, লাওস ও থাইল্যান্ড), গোল্ডেন ক্রিসেন্ট (ইরান, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান), গোল্ডেন ওয়েজ (ভারতের হিমাচল প্রদেশ, উত্তর প্রদেশ, অরুণাচল প্রদেশ, নেপাল ও ভুটানের কিছু অংশ) নামে পরিচিত মাদক চোরাচালানের তিনটি প্রধান অঞ্চলের কেন্দ্রে বাংলাদেশের অবস্থান। এতে আন্তর্জাতিক মাদক কারবারিরা বাংলাদেশকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, বাংলাদেশে মাদক চক্রে আফ্রিকার দেশ নাইজেরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা জড়িয়ে পড়েছেন।
কোকেন ও আইসের সবচেয়ে বড় চালান জব্দ : গত সোমবার রাতে রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১৩০ কোটি টাকা মূল্যের সাড়ে ৮ কেজি কোকেনসহ গায়েনার নাগরিক এমএস কারেন পেতুলা স্টাফেল নামে এক নারীকে আটক করা হয়েছে।
শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর জানিয়েছে, গত সোমবার রাতে গোপন খবর আসে দোহা থেকে কাতার এয়ারওয়েজের একটি উড়োজাহাজ ঢাকায় আসছে। এই উড়োজাহাজে থাকা এক যাত্রী মাদক চোরাচালানে সম্পৃক্ত থাকতে পারেন। এই তথ্যের ভিত্তিতে শুল্ক গোয়েন্দারা শাহজালাল বিমানবন্দরে সতর্ক অবস্থান নেন। উড়োজাহাজটি রাত আড়াইটার দিকে বিমানবন্দরে অবতরণ করে। শুল্ক গোয়েন্দারা সঙ্গে সঙ্গে যাত্রীর পরিচয় নিশ্চিত হন। পরে তার ব্যাগেজ স্ক্যানিং করে ২২টি ডিম্বাকৃতির ফয়েল পেপারে মোড়ানো কোকেন পান তারা। পরে ডিএনসির বিমানবন্দর ইউনিটের পরীক্ষায়ও এগুলো কোকেন বলে প্রমাণিত হয়।
জানা গেছে, কারেন পেতুলা স্টাফল নামের যে নারীকে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিপুল পরিমাণ কোকেনসহ গ্রেফতার করা হয়েছে, একই অপরাধে তাকে নিজের দেশ গায়ানায় জেল খাটতে হয়েছিল। ২০১৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর গায়ানার চেদ্দি জাগান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১ দশমিক ১৪২ কেজি (২ দশমিক ৫ পাউন্ড) কোকেনসহ ধরা পড়েছিলেন স্টাফল। দোষ স্বীকার করে নিলে দেশটির আদালত তাকে চার বছরের কারাদণ্ড এবং ২৩ লাখ ডলার জরিমানা করেছিল। কিন্তু জামিনে বেরিয়ে আবারও পাচারে জড়িয়েছেন ওই নারী।
অন্যদিকে মঙ্গলবার ডিএনসির এক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত সোমবার পৃথক অভিযানে ইয়াবা, দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আইসের চালান ও ভয়ংকর মাদক টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনল (কুশ) উদ্ধার করা হয়েছে। এ সময় চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতাররা হলেন-মো. খাইরুল ইসলাম ওরফে রিয়ান (২৬), মিলন মোল্লা, শুকুর মোহাম্মদ রিপন (৫০) এবং শহিদুল ইসলাম (৪৫)।
জানা যায়, বায়তুল আমান হাউজিং সোসাইটির ওই বাসা থেকে ৪ হাজার ইয়াবাসহ মো. খাইরুল ইসলাম ওরফে রিয়ান নামের একজনকে গ্রেফতার করা হয়। পরবর্তী সময়ে রিয়ানের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একই দিন শেখেরটেক এলাকায় অভিযান চালানো হয়। এ সময় একাধিক মাদক মামলার আসামি মিলন মোল্লার কাছ থেকে ১ কেজি ৬০০ গ্রাম ‘আইস’ উদ্ধার করা হয়। যা দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চালান।
ডিএনসির দাবি, এসব মাদকের মূল মালিক পলাতক আসামি সৌরভ ইসলাম শান্ত ওরফে তোফায়েল হোসেন শান্ত এবং ইয়াছমিন আক্তার আঁখি। সৌরভ ইসলাম শান্তকে ডিএনসি তালিকাভুক্ত ‘মাদক গডফাদার’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। তার নামে বিভিন্ন থানায় মাদক ও অস্ত্র আইনে একাধিক মামলা রয়েছে।
এ ছাড়া ডিএনসির উপপরিচালক মো. মেহেদী হাসানের নেতৃত্বে একই দিন পল্টন ডাক ভবনের বৈদেশিক ডাকঘরে অভিযান চালিয়ে অস্ট্রেলিয়া থেকে আসা ২৮০ গ্রাম টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনল (কুশ) উদ্ধার করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে শহিদুল ইসলামকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তার স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে শুকুর মোহাম্মদ রিপনকে গ্রেফতার করে ডিএনসি।
ট্রানজিট হিসেবেও ব্যবহার হচ্ছে বাংলাদেশ: গত সোমবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রাজধানীর গুলশানের মাদানী অ্যাভিনিউ থেকে মো. তরিকুল ইসলাম (৩৭) নামে এক আন্তর্জাতিক মাদক কারবারিকে গ্রেফতার করে ডিএনসি। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গ্রিন রোডের একটি বাসা থেকে দেড় লাখ ট্রামাডল বড়িসহ আরও একজনকে গ্রেফতার করা হয়।
গ্রেফতারের ৩১ ঘণ্টার মধ্যে তরিকুল জামিন পাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়। পরে তার জামিন বাতিল করা হয়। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন। এই অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া ডিএনসির ঢাকা মেট্রো (উত্তর) কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (এডি) মো. মেহেদী হাসান বলেন, ভারত থেকে আসা ট্রামাডল ট্যাবলেট বাংলাদেশ হয়ে বিদেশে পাচার করতে চেয়েছিলেন তরিকুল। অর্থাৎ ট্রামাডল ট্যাবলেটের ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে বাংলাদেশ। শুধু ট্রামাডল ট্যাবলেট নয় হেরোইন, কোকেন ও ইয়াবার মতো মাদকের নিরাপদ ট্রানজিট হিসেবে বাংলাদেশকে ব্যবহার করা হয় বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে।
মাদক নিয়ন্ত্রণে যা বলছেন ডিএনসির কর্মকর্তারা : ডিএনসির অতিরিক্ত মহাপরিচালক (যুগ্ম সচিব) মোহাম্মদ গোলাম আজম বলেন, মাদক যে পরিমাণে সয়লাব হচ্ছে সেই পরিমাণে উদ্ধার হচ্ছে না-এটি অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই। এরপরও ডিএনসি স্বল্প জনবল নিয়ে সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছে। বিভিন্ন সীমান্ত পথ মাদক ঢুকছে। এগুলো নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে। পাশাপাশি আমরা মনে করছি টেকনোলজি আরও আধুনিক করা গেলে আরও বেশি মাদক জব্দ করা যাবে। আরও বেশি মাদক কারবারি গ্রেফতার হবে। এ ছাড়াও মাদকের ল্যাব আধুনিক করা হয়েছে। যাতে মাদক মামলার আলামত ও প্রমাণ আরও সুদৃঢ় হয়।
ডিএনসির ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক একেএম শওকত ইসলাম বলেন, কোকেনের যে চালানটি ধরা পড়েছে সেটি গায়ানার এক নারী ব্রাজিল থেকে দোহা হয়ে ঢাকায় নিয়ে আসেন। দেশে মাদকের আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেটের তৎপরতা রুখে দিতে আমরা সোচ্চার রয়েছি। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ মাদকের উৎপাদনকারী দেশ না হলেও বিভিন্ন মাদকে সয়লাব হচ্ছে দেশ। এটি প্রতিরোধে ডিএনসির তৎপরতা অব্যহত থাকবে।
এমএইচ