একুশ শতকের এই আধুনিক যুগে যখন বিশ্বজুড়ে ছোট ছোট জাতিগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি বিলুপ্তির ঝুঁকির মুখে, তখন উত্তরের জনপদ গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে দেখা মেলে এক ভিন্নরকম প্রতিরোধের গল্প। এ গল্পের প্রধান চরিত্র হলেন সাঁওতাল নারীরা, যারা নিজেদের ভাষা সাঁওতালি এবং সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে নীরবে চালিয়ে যাচ্ছেন এক ধারাবাহিক সংগ্রাম। এটি শুধু একটি সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই নয়, বরং বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে টিকিয়ে রাখার এক সাহসী প্রয়াস।
সাঁওতাল সম্প্রদায়ের চিরায়ত ঐতিহ্য প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে প্রবাহিত হলেও, আধুনিকতার ছোঁয়া এবং মূলধারার সংস্কৃতির প্রবল প্রভাবে তাদের ভাষা ও জীবনযাত্রা ধীরে ধীরে ম্লান হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে গাইবান্ধার সাঁওতাল নারীরা কেবল ঘরের কাজ ও সন্তান পালনেই সীমাবদ্ধ নন, বরং হয়ে উঠেছেন তাদের জাতিসত্তার প্রধান রক্ষাকবচ। প্রথাগতভাবে সাঁওতাল সমাজে ভাষার বিস্তার ও সংরক্ষণের দায়িত্ব মায়েরাই পালন করেন। একজন সাঁওতাল মা তার শিশুকে সাঁওতালি ভাষায় প্রথম কথা বলা শেখান এবং বাড়িতে তাদের সঙ্গে এ ভাষাতেই কথা বলেন, গল্প শোনান ও গান শেখান।
স্থানীয় সাঁওতাল নেত্রী ললিতা মুর্মু বলেন, ‘আমাদের সমাজে নারী-পুরুষ উভয়েই কাজ করে, কিন্তু ভাষা ও সংস্কৃতির দায়িত্বটা নারীরাই বেশি পালন করে। একজন মা যদি তার বাচ্চাকে সাঁওতালি না শেখায়, তা হলে ভাষাটা শেষ হয়ে যাবে।’ তার এই কথায় স্পষ্ট হয়, একটি ভাষা টিকিয়ে রাখার পেছনে একজন মায়ের ভূমিকা কতটা অপরিহার্য।
সাঁওতাল নারীদের জীবনযাত্রা তাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। তারা নিজেরাই পোশাক তৈরি করেন, যেখানে তাদের নিজস্ব বুননশৈলী এবং নকশা ফুটে ওঠে। এ ছাড়া বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে তারা ঐতিহ্যবাহী ধামসা-মাদলের তালে নাচেন ও গান করেন। এই নাচ-গান শুধু উৎসবের অংশ নয়, বরং এর মাধ্যমে লোককথা ও ইতিহাস পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যায়। গাইবান্ধার সাঁওতাল পল্লীগুলোতে দেখা যায়, নারীরা দলবদ্ধ হয়ে সাঁওতালি লোকগীতি গাইছেন। এটি নতুন প্রজন্মকে তাদের শেকড়ের সঙ্গে যুক্ত রাখার একটি শক্তিশালী উপায়।
এ ছাড়া গাইবান্ধার সাঁওতাল নারীরা তাদের লোকশিল্পকেও বাঁচিয়ে রেখেছেন। তারা হাতে তৈরি মাটির জিনিসপত্র এবং পাটের ব্যাগ তৈরি করেন, যেখানে সাঁওতাল সংস্কৃতির বিভিন্ন মোটিফ ব্যবহার করা হয়। এসব লোকশিল্প কেবল তাদের জীবিকার উৎস নয়, বরং তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক।
এই সংগ্রামের পথ মোটেও মসৃণ নয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি মূলধারার সংস্কৃতির আগ্রাসন তাদের অস্তিত্বকে ক্রমাগত ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। অনেক সাঁওতাল শিশু বাংলা মাধ্যমের স্কুলে পড়ে নিজেদের মাতৃভাষা ব্যবহার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় সাঁওতাল নারীরা নিজেরাই এগিয়ে এসেছেন। তারা দলবদ্ধভাবে লোকজ গান-নাচের অনুষ্ঠান আয়োজন করেন এবং নিজেদের মধ্যে সাঁওতালি ভাষা চর্চার জন্য বিভিন্ন সাংস্কৃতিক দল গঠন করেছেন। কিছু কিছু এলাকায় তারা ছোট আকারের বিদ্যালয় বা সান্ধ্যকালীন শিক্ষাকেন্দ্র চালু করেছেন, যেখানে শিশুদের সাঁওতালি ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে শেখানো হয়। সাঁওতালদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় অবিলম্বে সাঁওতালদের জন্য পাঠ্যপুস্তক, জেলায় সাঁওতাল কালচারাল একাডেমি প্রতিষ্ঠাসহ তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় সরকারি উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন গোবিন্দগঞ্জের কামদিয়া ইউনিয়নের সাঁওতাল নারী সোনালী মার্ডি ও সুরভি মার্ডি। তারা বলেন, সাঁওতাল শিশুর বিকাশের জন্য মাতৃভাষা অত্যন্ত জরুরি। মাতৃভাষায় শিশুশিক্ষার কোনো বিকল্প হতে পারে না।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘অবলম্বন’-এর নির্বাহী প্রধান প্রবীর চক্রবর্তীও এই দাবির সঙ্গে একমত। তিনি বলেন, স্বাধীনতার দীর্ঘ সময় পরও বাংলাদেশে সাঁওতালদের নিজ
মাতৃভাষায় শিক্ষা লাভের দাবি উপেক্ষিত হয়ে আসছে। বর্তমানে সাঁওতালসহ দেশের প্রায় ৫০টির মতো ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ২০ লাখের বেশি শিশু বংশপরম্পরায় ভুলতে বসেছে তাদের নিজস্ব ভাষাগত ঐতিহ্য, লোকগাথা, প্রবাদ-প্রবচন ইত্যাদি। সাঁওতাল শিশুদের নিজ মাতৃভাষায় অক্ষরজ্ঞান না থাকায় তাদের সংস্কৃতিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই সাঁওতাল শিশুর নিজস্ব ভাষা ও নিজ ভাষার বর্ণলিপি শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। গাইবান্ধার সাঁওতাল নারীদের এই নীরব প্রতিরোধ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি জাতির পরিচয় তার ভাষা ও সংস্কৃতিতে নিহিত, আর সেই পরিচয় বাঁচিয়ে রাখার সবচেয়ে বড় শক্তি হলেন একজন নারী।
লেখক : গাইবান্ধা প্রতিনিধি