ভোক্তাদের ওপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা

চট্টগ্রাম ব্যুরো

শেষ পাতা

ব্যবসায়ীদের তীব্র আপত্তির মুখেও চট্টগ্রাম বন্দরে ৫৬ সেবা খাতের মাশুল ৪১ শতাংশ বাড়ানোর প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। গত রোববার মধ্যরাতে

2025-09-16T10:02:38+00:00
2025-09-16T10:02:38+00:00
 
  শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬,
২০ আষাঢ় ১৪৩৩
শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬
শেষ পাতা
ভোক্তাদের ওপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা
চট্টগ্রাম বন্দরে বাড়তি মাশুল কার্যকর
চট্টগ্রাম ব্যুরো
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৫, ১০:০২ এএম 
সংগৃহীত ছবি
ব্যবসায়ীদের তীব্র আপত্তির মুখেও চট্টগ্রাম বন্দরে ৫৬ সেবা খাতের মাশুল ৪১ শতাংশ বাড়ানোর প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। গত রোববার মধ্যরাতে জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী বাড়তি মাশুল সোমবার থেকেই কার্যকর হয়েছে। গত দুই সপ্তাহ আগে ১ সেপ্টেম্বর থেকে ১৯টি প্রাইভেট আইসিডিতে কনটেইনার হ্যান্ডলিংসহ সেবা খাতের চার্জ ৫০ শতাংশ বাড়ানো হয়। এবার বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রস্তাবিত মাশুল কার্যকর করল। সোমবার সেবা খাত থেকে মাশুল আদায় শুরু হয়েছে। আইসিডির পাশাপাশি বন্দর কর্তৃপক্ষ নতুন হারে মাশুল আদায় শুরু করায় ব্যবসায়ীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, মাশুল নিয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে। প্রত্যাশা ছিল সমঝোতা আলোচনা চূড়ান্ত হওয়ার পর নতুন হারে মাশুল আদায় শুরু হবে। কিন্তু সমঝোতার আগেই প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। এতে আমদানি-রফতানি বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

চট্টগ্রাম বন্দর সূত্র জানায়, ১৯৮৬ সালে সবশেষ মাশুল বাড়ানো হয়। এরপর মাঝেমধ্যে মাশুল বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ব্যবসায়ীদের আপত্তি ও বিরোধিতার কারণে কখনো কার্যকর হয়নি। সোমবার প্রায় ৪০ বছর পর নতুন হারে মাশুল বাড়ানো হয়েছে। রোববার চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এসএম মনিরুজ্জামান স্বাক্ষরিত গেজেট প্রকাশ হয়। এরপর সোমবার থেকে আদায় শুরু হয়েছে। গেজেট অনুযায়ী সব ধরনের কনটেইনার হ্যান্ডলিং, জাহাজের আসা-যাওয়া, জেটিতে বার্থিং, বহির্নোঙরে জাহাজ অবস্থান করাসহ মোট ৫৬ সেবা খাতে মাশুল বেড়েছে। মাশুল সবচেয়ে বেশি বেড়েছে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে। এখন থেকে ২০ ফুট দৈর্ঘ্যরে প্রতিটি কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে আগের চেয়ে আরও ৪ হাজার ৩৯৫ টাকা বাড়তি মাশুল দিতে হবে। এসব কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে আগে মাশুল দিতে হতো ১১ হাজার ৮৪৯ টাকা। পুরোনো ও নতুন মাশুল মিলিয়ে এখন মোট হ্যান্ডলিং চার্জ দিতে হবে ১৬ হাজার ২৪৩ টাকা। কনটেইনার হ্যান্ডলিং ছাড়াও নানা খাতে মাশুল বেড়েছে। বন্দরে জাহাজ প্রবেশে প্রতি মুভমেন্টের জন্য সর্বনিম্ন পাইলটিং চার্জ ধরা হয়েছে ৮০০ মার্কিন ডলার। চট্টগ্রাম বন্দর জেটি ও বহির্নোঙরে চলাচলকারী দেশি-বিদেশি জাহাজ বন্দরের নিজস্ব পাইলট দ্বারা পরিচালনা বাবদ এই মাশুল আদায় করা হবে। নাইট নেভিগেশন ভ্যাসেলের জন্য ২৫ শতাংশ, বার্থ শিফটিংয়ের জন্য প্রতি মুভমেন্টে ৮০ ডলার, কর্ণফুলী নদীর বাইরের অংশে পাইলটিংয়ের জন্য ৫০ শতাংশ অতিরিক্ত মাশুল নির্ধারণ করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর এলাকায় পোর্ট লিমিটের মধ্যে লাইটার ও ট্যাঙ্কার ভ্যাসেল ওয়ার্কিং চার্জ ধরা হয়েছে প্রতি গ্রস টনেজ দশমিক ১৭ ডলার। এর সঙ্গে ডেঞ্জারাজ গুডস ভ্যাসেলের ক্ষেত্রে ঘোষিত চার্জের ২৫ শতাংশ, ডেড ভ্যাসেলের জন্য ৫০ শতাংশ, লাইটারেজ ভ্যাসেলের জন্য ৫০ শতাংশ অতিরিক্ত মাশুল নির্ধারণ করা হয়েছে।

টাগ বোট ব্যবহারের মাশুল হিসেবে প্রত্যেক মুভমেন্টে প্রতি ২০০ টন থেকে ৫ হাজার গ্রস টনেজের জন্য কর্ণফুলী নদীর মধ্যে ৬১৫ ডলার, বাইরে ১ হাজার ২৩০ ডলার, ৫ হাজার টন থেকে ১০ হাজার গ্রস টনেজের জন্য কর্ণফুলী নদীর মধ্যে ১ হাজার ২৩০ ডলার, বাইরে ২ হাজার ৪৬০ ডলার, ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার গ্রস টনেজের জন্য বন্দর চ্যানেলের ভেতরে ২ হাজার ৫০ ডলার, বাইরে ৪ হাজার ১০০ ডলার এবং ২০ হাজার গ্রস টনেজের ওপরের জন্য ভেতরে ৩ হাজার ৪১৫ ডলার ও বাইরে ৬ হাজার ৮৩০ ডলার মাশুল নির্ধারণ করা হয়। কর্ণফুলী নদীর মধ্যে ৪ ঘণ্টার বেশি সার্ভিসের জন্য ২৫ শতাংশ, কর্ণফুলী নদীর বাইরে ৬ ঘণ্টার বেশি সার্ভিসের জন্য ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত চার্জ ধরা হয়েছে।

জাহাজে পানি সরবরাহের ক্ষেত্রে মেইন সাপ্লাই লাইন থেকে প্রতি ১ হাজার লিটারের জন্য ২ দশমিক ৯২ ডলার, বন্দরের লরি দিয়ে (৫ কিলোমিটারের নিচে) প্রতি ১ হাজার লিটারের জন্য ৬ পয়েন্ট ২৩ ডলার, ৫ কিলোমিটারের ওপরে প্রতি ১ হাজার লিটারের জন্য ৮ দশমিক ২৩ ডলার, বন্দরের ওয়াটার বোট ব্যবহার করে কর্ণফুলী নদীর মধ্যে প্রতি ১ হাজার লিটারের জন্য ১২ দশমিক ৪৬ ডলার এবং পতেঙ্গা লাইট হাউস থেকে ৭ নটিক্যাল মাইলের মধ্যে ১ হাজার লিটারের জন্য ১৮ দশমিক ৬৯ ডলার, পতেঙ্গা লাইট হাউস থেকে ৭ নটিক্যাল মাইলের বাইরে প্রতি ১ হাজার লিটারের জন্য ২৪ দশমিক ৯৬ ডলার এবং বন্দরের বাইরের কোনো পক্ষ থেকে পানি সরবরাহ নিলে প্রতি ১ হাজার লিটারে ওয়াসার দরের ২০ শতাংশ বেশি হারে ওভারহেড মাশুল কার্যকর হয়েছে।

সেবা খাতের চার্জের মধ্যে ক্রেন ব্যবহারের জন্যও নতুন মাশুল কার্যকর করা হয়েছে। বন্দরের ক্রেন ব্যবহারের জন্য (কি গ্যান্ট্রি, মোবাইল হার্বার, একই ধরনের অন্য যন্ত্র) প্রতি মুভমেন্টে পণ্যভর্তি কনটেইনারপ্রতি ২১ ফুটের নিচে ২০ দশমিক ৮০ ডলার, ২১ থেকে ৪০ ফুটের জন্য ৩১ দশমিক ২০ ডলার এবং ৪০ ফুটের ওপরের জন্য ৩৫ দশমিক ১০ ডলার, খালি কনটেইনারের ক্ষেত্রে প্রতি ২১ ফুটের নিচে ১০ দশমিক ৪০ ডলার, ২১ থেকে ৪০ ফুটের জন্য ১৫ দশমিক ৬০ ডলার এবং ৪০ ফুটের ওপরের জন্য ১৭ দশমিক ৫৫ ডলার, জেটি ক্রেন ব্যবহারের জন্য ক্রেনপ্রতি ৮ ঘণ্টার জন্য ১০ টনের নিচে ৫৮ দশমিক ২৪ ডলার, ১০ থেকে ৪০ টনের জন্য ১৭৪ দশমিক ৭২ ডলার এবং ৪০ টনের ওপরে ২৯১ দশমিক ২০ ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে।

এদিকে চট্টগ্রাম বন্দরে বাড়তি মাশুল কার্যকর করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, এভাবে মাশুল বাড়ালে আমদানি-রফতানি বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাজারে বাড়বে পণ্যের দাম। এতে সাধারণ ভোক্তারাও চাপে পড়বেন।

চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ সময়ের আলোকে বলেন, মাশুল সর্বোচ্চ ১০ থেকে ২০ শতাংশ বাড়ানো যায়। এভাবে এক লাফে ৪১ শতাংশে চার্জ বা মাশুল বাড়ানোর মধ্যে এক ধরনের শুভঙ্করের ফাঁকি আছে, যা ব্যবসায়ী বা বন্দর ব্যবহারকারী ছাড়া কেউ জানে না। আমরা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন খাতে বাড়তি চার্জ দিয়ে আসছি। নতুন করে ৪১ শতাংশ বাড়ানোর কথা বলা হলেও বাস্তবে আরও বেশি চার্জ বা মাশুল বেড়েছে। আমরা মনে করি দ্রুত আলোচনা করে অতিরিক্ত মাশুল যৌক্তিক হারে আদায় করার ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি বলেন, আনসিন বা গোপন মাশুল আদায় বন্ধ করে দুর্নীতি দূর করে মাশুল কার্যকর করলে কোনো সমস্যা নেই। গোপন মাশুল দিয়েই আমাদের সর্বস্বান্ত হওয়ার মতো অবস্থা। এ সময় নতুন করে মাশুল কার্যকর করায় সাধারণ ভোক্তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ আমদানি ব্যয় বাড়লে বাজারে পণ্যের দাম বাড়বে। সেই বাড়তি দাম ক্রেতাদের বহন করতে হবে।

ফ্রেড ফরওয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি খায়রুল আলম সুজন বলেন, মাশুল বেশি প্রস্তাব করায় আমরা কমানোর দাবি জানিয়েছিলাম। আমাদের সঙ্গে ঢাকায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে বৈঠকও করা হয়। বৈঠকে মাশুল কমানোর ব্যাপারে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু রোববার মাশুল কার্যকরের গেজেট প্রকাশের পর সোমবার থেকে কার্যকর হয়েছে। এভাবে এক লাফে এত মাশুল বেড়ে যাওয়া কখনো প্রত্যাশা ছিল না। বলতে গেলে বাড়তি মাশুল গুনে ব্যবসা করা আমাদের জন্য এখন কঠিন হয়ে গেছে।

সময়ের আলো/জেডআই


Loading...
Loading...
শেষ পাতা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: