প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর শুরু হতে যাওয়া জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮০-তম অধিবেশনের উচ্চ পর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিবেন। এ অধিবেশনে যোগদানের জন্য প্রধান উপদেষ্টা আগামী ২২ সেপ্টেম্বর একটি বাণিজ্যিক ফ্লাইটে নিউইয়র্কে পৌঁছাবেন। এবারের অধিবেশনে প্রধান উপদেষ্টার সফরসঙ্গী হিসেবে চারজন রাজনীতিবিদ জাতিসংঘে যাবেন। অধিবেশন শেষে প্রধান উপদেষ্টা আগামী ২ অক্টোবর দেশে ফিরবেন। প্রধান উপদেষ্টার জাতিসংঘ অধিবেশনে অংশগ্রহণ সম্পর্কে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে অনুষ্ঠিত ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বুধবার (১৭ সেপ্টেম্বর) এসব তথ্য জানান।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনে যাচ্ছেন চার জন রাজনীতিবিদ। যেহেতু, আমরা একটা পর্যায়ের দিকে যাচ্ছি, রাজনীতিবিদদের কাছেই দেশ পরিচালনার ভার হস্তান্তর করা হবে, কাজেই সেই হিসেবে আমরা তাদের প্রতিনিধিদলে অন্তর্ভুক্ত করছি। রাজনীতিবিদদের মধ্যে আছেন, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ও বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্য সচিব আখতার হোসেন।’
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘এ বছর জাতিসংঘের ৮০তম বর্ষপূর্তি এবং এ লক্ষ্যে সাধারণ বিতর্কের প্রতিপাদ্য হলো, ‘বেটার টুগেদার: এইটি ইয়ার্স এন্ড মোর ফর পিস, ডেভেলপমেন্ট এন্ড হিউম্যান রাইটস’। জাতিসংঘের তিনটি মূল স্তম্ভ- শান্তি ও নিরাপত্তা, উন্নয়ন এবং মানবাধিকার সবই সমানভাবে এবারের অধিবেশনে গুরুত্ব পাবে। বিশ্বব্যাপী আস্থার সংকট, সংরক্ষণবাদের উত্থান, বহুপাক্ষিক কূটনীতি এবং আলোচনার পথ উপেক্ষা করার ফলে সৃষ্ট যে তীব্র সংকট থেকে সংঘাতের সৃষ্টি হয়েছে, মানবাধিকার লঙ্ঘন ঘটছে, বিজ্ঞান ও তথ্য-প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির পাশাপাশি উদ্ভূত নানারকম বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা এবং টেকসই উন্নয়ন বাস্তবায়নে কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপের বিষয়ে সার্বিক আলোচনার ক্ষেত্রে এবারের প্রতিপাদ্যটি অত্যন্ত অর্থবহ।’
এবারের জাতিসংঘ অধিবেশনে বাংলাদেশের গুরুত্ব বিষয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘এ বছরের অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির সভাপতিত্বে রোহিঙ্গা ইস্যূতে উচ্চ পর্যায়ের একটি সভা অনুষ্ঠিত হবে। রোহিঙ্গা সঙ্কটকে কেন্দ্র করে জাতিসংঘ কর্তৃক সাধারণ পরিষদে এমন একটি উচ্চ-পর্যায়ের সভার আয়োজন এবারই প্রথম। উল্লেখ্য যে, গত বছর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রধান উপদেষ্টা প্রথম বারের মত সকল অংশীদারের অংশগ্রহণে জাতিসংঘ কর্তৃক এমন একটি উচ্চ-পর্যায়ের সভা আয়োজনের প্রস্তাব করেন। প্রধান উপদেষ্টার এই প্রস্তাব দ্রুত বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে, যার পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রসমূহ সর্বসম্মতিক্রমে একটি রেজ্যুলুশনের মাধ্যমে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির নেতৃত্বে উক্ত উচ্চ পর্যায়ের সভাটি আয়োজনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এই উচ্চ-পর্যায়ের সভা থেকে যেন রোহিঙ্গা সংকট দ্রুত সমাধানের একটি কার্যকর ও সময়াবদ্ধ পরিকল্পনা উঠে আসে তার জন্য আন্তর্জাতিক অংশীদার ও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গত মাসে (২৪-২৬ আগস্ট) আমরা কক্সবাজারের প্রথমবারের মতো একটি অংশীদারদের সংলাপের আয়োজন করি। এ ছাড়াও, আপনারা নিশ্চয়ই অবগত আছেন যে, জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তনিও গুতেরেস গত মার্চ মাসে বাংলাদেশ সফর করে রোহিঙ্গাদের সাথে সংহতি প্রকাশ করে কক্সবাজারে একসাথে ইফতার করেছিলেন। প্রতিনিয়ত বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে নতুন নতুন সংকটের উত্থানের পরেও সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতার কারণে রোহিঙ্গা সংকটে যে বিশ্বব্যাপী আলোচ্যসূচীতে পিছিয়ে পড়েনি। প্রথমবারের মত এ বিষয়ে জাতিসংঘের উচ্চ-পর্যায়ের সভার আয়োজন এবং স্বয়ং জাতিসংঘ মহাসচিব-এর সফর তারই প্রমাণ। আমরা এ উচ্চ-পর্যায়ের সভার সফল অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিচ্ছি।’
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘এ বছর একই সাথে বিশ্ব যুব কর্মসূচীর ৩০ বছর পূর্তি এবং নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা বিষয়ক ঐতিহাসিক রেজ্যুলুশনের ২৫ বছর পূর্তি হচ্ছে। ৩০তম বার্ষিকী উপলক্ষ্যে এবারের অধিবেশনে ২৫ সেপ্টেম্বর একটি উচ্চ পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ সভায় প্রধান উপদেষ্টা অংশগ্রহণ করবেন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে সংঘটিত যে গণঅভ্যুত্থানের কারণে আমরা আজ এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছি তার অগ্রভাগে ছিল মূলত দেশের তরূণ ও যুব সমাজ। এ ছাড়া, চলমান নানামুখী সংস্কার কার্যক্রমের সাথে সম্পৃক্ত থেকে অন্যতম অনুঘটক হিসেবেও দেশের তরূণ সমাজ ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ বিনির্মানের প্রত্যয় নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে বিশ্ব যুব কর্মসূচীর ৩০তম বার্ষিকী উপলক্ষ্যে আয়োজিত উচ্চ-পর্যায়ের সভায় অংশগ্রহণ করে আমরা আমাদের তরূণ ও যুব সমাজের আশা-আকাঙ্ক্ষা বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরতে পারব। ভবিষ্যৎ বিশ্বের পরিকল্পনা যেন আমাদের তরুণ সমাজের চাহিদা ও আশা-আকাঙ্ক্ষার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হয়, সেজন্য বিশ্বমঞ্চে এই সংক্রান্ত আলোচনায় আমাদের উচ্চ-পর্যায়ের সক্রিয় অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি । অন্যদিকে, বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ হিসেবে নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকেও বাংলাদেশ অংশগ্রহণ করবে।’
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর প্রধান উপদেষ্টা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ আলোচনা পর্বে বক্তব্য রাখবেন। তিনি তাঁর বক্তব্যে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রেক্ষিতে বিগত এক বছরে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া সংস্কার ও আগামী দিনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার দৃঢ় প্রত্যয় বিশ্বদরবারে তুলে ধরবেন বলে আশা করা যাচ্ছে। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের বলিষ্ঠ অবস্থান, বিশ্বব্যাপী সংঘাত, রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন ও এর প্রভাব, জলবায়ু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিকূলতা, উন্নয়নশীল দেশসমূহ হতে সম্পদ পাচার প্রতিরোধ, নিরাপদ অভিবাসন, অভিবাসীদের মৌলিক পরিষেবা প্রাপ্তির নিশ্চয়তা, জেনারেটিভ কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার পরিপ্রেক্ষিতে প্রযুক্তির টেকসই হস্তান্তর, এবং সর্বোপরি ফিলিস্তিন ও ইসরাইল-এর যুদ্ধ বিরতি ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রয়াস তাঁর বক্তব্যে উঠে আসবে। জাতিসংঘ মহাসচিবের স্বাগত অভ্যর্থনা, যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতির ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভ্যর্থনাসহ এ সফরকালে প্রধান উপদেষ্টা বেশ কয়েকটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে অংশগ্রহণ করবেন বলে আশা করা যাচ্ছে। আসলে, এ সময়ে অনেক বৈঠকের সিদ্ধান্ত শেষ মুহূর্তেও হয়ে যায়। সে বিবেচনায় নতুন বৈঠক তালিকায় যোগ হতে পারে; আবার সময়ের অভাবে কোনো বৈঠক বাদও যেতে পারে। জাতিসংঘ অধিবেশনের ফাঁকে প্রধান উপদেষ্টা ফিনল্যান্ডের রাষ্ট্রপতি আলেকজান্ডার স্টাব, নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রী ডিক স্কোফ, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার ফিলিপ্পো গ্রান্ডি, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) মহাপরিচালক অ্যামি পোপ, জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস, জাতিসংঘ মহাসচিবের মিয়ানমার-বিষয়ক বিশেষ দূত টম অ্যান্ড্রুজ, বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভার সঙ্গে বৈঠক করবেন। এছাড়া ইতালি, তুরস্ক, দক্ষিণ কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, কসভোর প্রতিনিধি দলের প্রধানের সঙ্গেও বৈঠক আয়োজনের প্রস্তুতি চলমান আছে।’
উপদেষ্টা বলেন, ‘এবারের সাধারণ অধিবেশনের সাইড লাইনে আমিও বেশ কয়েকটি ইভেন্টে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবো। এর মধ্যে বিশেষভাবে রয়েছে কমনওয়েলথভূক্ত দেশগুলোর মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক, পিসবিল্ডিং কমিশনের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক, গ্রুপ ৭৭ এর দেশগুলোর মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক, চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক, বিমসটেকের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক প্রভৃতি।
সময়ের আলো/এনএ