নীলাভ ও পরিষ্কার আকাশে সাদা তুলোর মতো মেঘ ভেসে বেড়ায়। চারপাশে জমে ওঠে শিউলি ফুলের গন্ধ, ভোরবেলা টুপটাপ ঝরে পড়ে শিউলি। ধানের শীষ ভরে ওঠে, মাঠে সবুজের সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে সোনালি আভা। বর্ষার ঘন মেঘ কেটে গিয়ে হাল্কা রোদমাখা উজ্জ্বল দিন। কাশফুল যেন এই শরতের স্মারক। কাশফুলে ভরে ওঠে নদীর ধার, বিলের পাড় কিংবা খোলা মাঠ। প্রকৃতিতে ছড়িয়ে পড়েছে কাশফুলের শুভ্র রূপ। কাশফুলের এই সৌন্দর্য উপভোগে ছুটে যান অনেকেই। প্রকৃতিতে এসেছে শরৎ, ঢাকা নগরীর আশপাশের কিছু স্থানে কাশফুল ফুটেছে। সেই দৃশ্য দেখতে পরিবারের সদস্য ও বন্ধুদের নিয়েও অনেকে যান।
ঢাকা থেকে পোস্তগোলা সেতু পেরিয়ে সারিঘাট রোড ধরে সামনে গেলেই খালের পাশে দেখা মিলবে দিগন্তজুড়ে কাশফুলের। সারিঘাট হলো কাশফুলের স্বর্গরাজ্য। এখানকার দিগন্তজোড়া শুভ্র কাশফুলের সৌন্দর্য সবাইকে মুগ্ধ করে। পাশেই টলটলে স্বচ্ছ পানির খাল। ঠিক খালের ধার ঘেঁষেই প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে উঠেছে অপার সৌন্দর্যমণ্ডিত এই ফুল। খালের পাড়ে রংবেরঙের নৌকায় খালে ঘুরে বেড়ায় প্রকৃতিপ্রেমীরা।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের উত্তরা তৃতীয় পর্যায়ের সম্প্রসারিত প্রকল্পের অংশ দিয়াবাড়ীতে। ভরে গেছে শরতের শুভ্র কাশফুলে। মেট্রোরেলের ‘উত্তরা সেন্টার স্টেশনে’ নেমে রাস্তার পূর্ব পাড়ে খানিকটা পথ এগোলেই রাজউকের খালি প্লটগুলোয় দেখা যাবে কাশফুল। নগরের যান্ত্রিক পরিবেশ থেকে একটু প্রকৃতির সান্নিধ্যে আসা নগরবাসী হাঁটতে থাকেন এই পথ ধরে। লোকসমাগমের কারণে বেশ কিছু হালকা খাবারের দোকানপাটও গড়ে উঠেছে সেখানে। এ ছাড়া যেখানে কাশফুল সেখান থেকে অল্প দূরত্বেই রয়েছে বউবাজার। সেখানে পাওয়া যায় রকমারি খাবার। হাঁসের মাংস, গরুর কালাভুনা, সামুদ্রিক মাছ, হরেক পদের পিঠা, চটপটি ও ফুচকাসহ বিভিন্ন পদের চা। সেখান থেকে আরও কিছুটা উত্তর দিকে এগোলে পাওয়া যাবে বেশ কয়েকটি অত্যাধুনিক রেস্টুরেন্ট। সেখানেও রয়েছে নানা পদের খাবার।
আফতাবনগর হাউজিংয়ে খালি জায়গা প্রতি বছর শরতের কাশফুলে ছেয়ে যায়। পাশ দিয়ে সরু হয়ে বয়ে যাওয়া তুরাগ নদের মৃত অংশ রামপুরা খালের আশপাশেও দেখা মিলবে কাশফুলের ছোট ছোট ঝাড়। অল্প সময়ে কাশফুলের ছোঁয়া পেতে এটি একটি আদর্শ জায়গা।
৩০০ ফিট সড়কে নীলা মার্কেট অনেক আগে থেকেই খাদ্যরসিকদের কাছে পরিচিত। এই সড়কের দুই পাশের কাশবনের জন্য বেশ কয়েক বছর ধরে প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছেও জনপ্রিয়। মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধের পশ্চিম পাশে ঢাকা উদ্যান হাউজিংয়ের প্লটগুলো থেকে শুরু করে বুড়িগঙ্গা নদীর তীর পর্যন্ত কাশফুল দেখা যায়। চিরচেনা বুড়িগঙ্গা তীরের মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধের কাছেই এই কাশবন। কেরানীগঞ্জের ঘাটারচর, বছিলা ও মধুসিটি আবাসন প্রকল্পের ভেতরে শরতে কাশফুল ফোটে। এসব এলাকায় পরিবার-পরিজন নিয়ে অনেকই ভিড় জমান কাশফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে। নৌকায় ঘুরে বেড়ানো ও নাগরদোলাসহ নানান খাবার-দাবারের আয়োজন তৈরি হয়েছে সেসব এলাকা ঘিরে। কেউ সেলফি তুলছে, কেউ ভিডিও করছেন, আবার কেউ সময়টি নিজেদের মতো করে উপভোগ করছেন। দূর থেকে দেখলে মনে হবে এ যেন কাশফুলের বন।
ষড়ঋতুর বাংলাদেশে বর্ষার পর আগমন ঘটে শরতের। বাংলা বর্ষপঞ্জিতে ভাদ্র ও আশ্বিন মিলে শরৎকাল। প্রকৃতির রূপ-বৈচিত্র্যের পরিবর্তন ঘটলেও শরৎকাল ধরা দেয় তার আলাদা রূপ-বৈচিত্র্যে। এই কাশফুলের শুভ্র হাসিই জানান দেয় শরৎ এসেছে। ভ্যাপসা-অস্বস্তিকর গরমের অবসান ঘটিয়ে আসছে শীত। তাই কাশফুল আর শরৎকাল যেন মিলেমিশে একাকার।
কাশফুল মূলত ছন গোত্রীয় বহুবর্ষজীবী এক ধরনের ঘাস। এরা উচ্চতায় তিন থেকে ছয় ফুটেরও বেশি হয়। ছনের কচি পাতা গরু-ছাগলের খাদ্য হিসেবেও পরিচিত। নদ-নদীর পাড়, জলাভূমি, চরাঞ্চল ছাড়াও রুক্ষ এলাকাতেও কাশ জন্মে। তবে নদ-নদীর পাড়ে এদের বেশি দেখা যায়। নদীর তীরে পলিমাটির স্তর থাকায় খুব সহজেই এর মূল সম্প্রসারিত হয়। ছুটির দিনে পোস্তগোলার সারিঘাটে পরিবার-পরিজন নিয়ে কাশফুল দেখতে আসা রফিকুল ইসলাম বলেন, কাশফুলের সৌন্দর্য দেখতে নদীর পাড়ে ছুটে আসা। খুব ভালো লাগে। কাশফুল মনে করিয়ে দেয় প্রকৃতিতে এখন শরৎকাল। এর সৌন্দর্য অন্যরকম।
জান্নাতুল মাওয়া বলেন, কাশফুল যেন প্রকৃতির এক সুন্দর প্রতীক। ইট-পাথরের শহুরে জীবনে নগরবাসীকে এ যেন প্রকৃতির কাছাকাছি নিয়ে আসে। এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে তিনি পরিবারের সবাইকে নিয়ে এসেছেন বলে জানান।
আরআর