রক্তদহ বিলের রক্তাক্ত ইতিহাস

এএফএম মমতাজুর রহমান আদমদীঘি (বগুড়া)

খবর

‘রক্তদহ বিল’ বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের একটি অন্যতম বৃহৎ বিল। মোট ১৩টি খাল ও অন্যান্য আরও কয়েকটি জলপথ রক্তদহ বিলের মধ্য দিয়ে

2025-09-22T08:47:09+00:00
2025-09-22T08:47:09+00:00
 
  শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬,
২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬
খবর
রক্তদহ বিলের রক্তাক্ত ইতিহাস
এএফএম মমতাজুর রহমান আদমদীঘি (বগুড়া)
প্রকাশ: সোমবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৫, ৮:৪৭ এএম   (ভিজিট : ২০৬)
ফাইল ছবি
‘রক্তদহ বিল’ বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের একটি অন্যতম বৃহৎ বিল। মোট ১৩টি খাল ও অন্যান্য আরও কয়েকটি জলপথ রক্তদহ বিলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। মূল বিলটি ১০৫ হেক্টর এলাকাজুড়ে হলেও এর ব্যাপ্তি প্রায় ৫০ কিলোমিটার।

জাতীয় তথ্য বাতায়নসহ একাধিক সূত্রে জানা যায়, ১৭৮৬ সালে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত এই বিলে ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে লিপ্ত হয়েছিলেন ফকির সন্ন্যাসী নেতা মজনু শাহ। সেই লড়াইয়ে অনেক ইংরেজ সৈন্য আহত হয়েছিল। এ ছাড়া মজনু শাহের সৈন্যরা আহত হয়। সৈন্যদের রক্তে বিলের পানি লাল হয়ে গিয়েছিল সেদিন। ওইদিন থেকেই বিলটির নতুন নামকরণ করে রাখা হয় রক্তদহ বিল। এই বিলের আগের নাম ছিল বিল ভোমরা। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত এই বিলের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পলাশী পরবর্তী ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের এক রক্তাক্ত ইতিহাস। বগুড়া শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে আদমদীঘি উপজেলার সদর ইউনিয়নের সান্তাহার, নওগাঁর রানীনগরের পারইল এবং আত্রাই উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে এই বিলের অবস্থান।

রক্তদহ বিলকে ঘিরে যে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস রয়েছে তা হয়তো অনেকেরই অজানা। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাকে হত্যা করার পর ইংরেজরা এই বাংলার রাজ ক্ষমতার অধিকারী হয়ে বসে। মীর জাফর, ঘষেটি বেগম, জগৎশেঠ ও উর্মিচাঁদসহ কতিপয় চক্রের কর্মকাণ্ডে স্বাধীনতা হারিয়ে বাঙালি হতভম্ব হয়ে পড়েন। বছরের পর বছর ধরে ইংরেজদের অত্যাচার সহ্য করে যাওয়ায় যেন নিয়তি হয়ে দাঁড়ায়। পলাশী পরবর্তী সময়ে যে কয়জন স্বাধীনচেতা মানুষ ইংরেজদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান তাদের মধ্যে ফকির মজনু শাহ অন্যতম। পলাশী যুদ্ধের মাত্র ৬ বছর পর ফকির মজনু শাহ ইংরেজবিরোধী সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়ে দীর্ঘদিন ধরে তা নানা কৌশল চালিয়ে যেতে থাকেন। মজনু শাহ বর্ধমান ভারতের ৪০ মাইল দূরে বসবাস করতেন। সহস্রাধিক অস্ত্রধারী সহচরকে নিয়ে তিনি প্রায় প্রতি বছরই তৎকালীন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধিকারভুক্ত বাংলা ও বিহারের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালাতেন। তার অভিযানের অঞ্চল ছিল প্রধানত বিহারের পানিয়া এবং বাংলার রংপুর, দিনাজপুর, রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, ময়মনসিংহ, কুচবিহার, জলপাইগুড়ি ও মালদা জেলা। প্রকৃতপক্ষে এ দেশের ব্রিটিশ শাসনের প্রথম যুগে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইংরেজ বণিকের দল ও তাদের অনুচর জমিদার মহাজনদের বিরুদ্ধে মজনু শাহের আন্দোলন ফকির বিদ্রোহ আন্দোলন নামেও পরিচিত। বগুড়ার মহাস্থানগড়ে মজনু শাহ প্রধান ঘাঁটি গড়ে তোলেন। 

১৭৭৬ সালে সেখানে একটি দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন মজনু শাহ। পরবর্তী সময়ে এই দুর্গ থেকেই বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করতেন তিনি। তার মধ্যে এই রক্তদহ বিলের অভিযান অন্যতম। ১৭৮৬ সালের আগস্ট মাসে চাঁপাপুর থেকে বারো কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিম স্থানে (বর্তমান মূল রক্তদহ) সেখানে লেফটেন্যান্ট আইন শাইনের সঙ্গে বগুড়া থেকে প্রায় ৩৫ মাইল দূরবর্তী এক স্থানে তার ও তার বাহিনীর সংঘর্ষ হয়েছিল। প্রথমে সেই জায়গা সম্পর্কে কারও কোনো ধারণা ছিল না। পরবর্তীতে বহু গবেষণার পর জানা যায়, ওই স্থানটি আদমদীঘি থানার রক্তদহ বিল। ঐতিহাসিক সেই যুদ্ধে অসংখ্য ইংরেজ ও ফকির বাহিনীর সদস্য নিহত হয়। নিহতদের রক্তের শ্রোত বিল দিয়ে প্রবাহ হতে দেখা যায়। তখন থেকেই ইংরেজ সমর্থিত হিন্দু জমিদারদের অনুসারীরা এটিকে নাম দেয় ফকির কাটার বিল। আর সাধারণ মানুষরা ইংরেজ বা জমিদারদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ ছিল সেই ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষের মানুষগুলো এ বিলের নাম দেয় রক্তদহ বিল। যা এখনও বিদ্যমান। ওই যুদ্ধে কোচ নামের এক ব্যক্তি নিহত হয়। ফকির মজনু শাহ তাকে বিলের মধ্যে সমাধিস্থ করেন। বর্তমানে সেখানে অশত্থ ও বটগাছের দ্বারা ছায়াশীতল একটি মাজার রয়েছে। এই রক্তদহ মাজারটি স্থানীয়ভাবে রক্তদহ দরগা নামে সুপরিচিত।

প্রায় ৯০০ একর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই বিলে একটা সময় প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। বিল থেকে প্রাপ্ত মাছ এই এলাকার চাহিদা পূরণ করে নাটোর, জয়পুরহাট ও নওগাঁ জেলার দক্ষিণ-পূর্ব এলাকার মাছের চাহিদা পূরণ হতো। বর্তমানে এ বিলে আর আগের মতো মাছ নেই। তবে শুষ্ক মৌসুমে ধানের বাম্পার ফলন হয় এই বিলে। রক্তদহ বিলের আশপাশের গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবারেরই নিজস্ব নৌকা আছে। তাদের কেউ কেউ বিলে ঘোরার জন্য নৌকাগুলো ঘণ্টায় ভাড়া দিয়ে থাকেন। এদিকে বিলের আশপাশের সড়কের সৌন্দর্য বৃদ্ধির কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন আদমদীঘি উপজেলার প্রকৌশলী সাজেদুর রহমান। তিনি বলেন, রক্তদহ বিলটি ঐতিহ্যবাহী একটি বিল। বিলের আশপাশের সড়কের কাজ করাসহ সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে আরও অনেক কাজ করা হবে। আমরা আবেদন করেছি, বরাদ্দ পেলে কাজ শুরু করব।

এ ছাড়া ঐতিহাসিক রক্তদহ বিলকে ঘিরে নওগাঁ বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করেছে বেশ কয়েকটি উন্নয়ন পরিকল্পনা। এর মধ্যে রক্তদহ বিল খনন, বিলের চারপাশ দিয়ে পর্যটকদের চলাচলের রাস্তা নির্মাণ, নৌকার সহজ যাতায়াত পথ সৃষ্টি করা, চারপাশ দিয়ে পরিবেশ ও পাখিবান্ধব গাছ রোপণ, বিলের সব সংযোগখাল খনন করাসহ নানা পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন নওগাঁ বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রেজাউল ইসলাম রেজা। তিনি জানান, রক্তদহ বিল শুধু এই অঞ্চলের নয় পুরো বাংলাদেশের সম্পদ। কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ না করায় ঐতিহ্যবাহী বিলটি বর্তমানে তার যৌবন হারিয়ে ফেলেছে। সময়োপযোগী সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করে তা বাস্তবায়ন করতে পারলে বিলকে ঘিরে এই অঞ্চলটি আবারও ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হবে। বর্তমানে যে সংখ্যক পর্যটক রক্তদহ বিল, পাখি পল্লীর সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসছেন তখন আরও বেশি সংখ্যক পর্যটকরা এখানে আসবেন। দেশের অন্যান্য পর্যটন কেন্দ্রের মতো রক্তদহ বিল এলাকাটিও এক আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে সুপরিচিতি লাভ করতে সক্ষম হবে। জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে যতগুলো বরেন্দ্রের অন্তর্ভুক্ত খাল রয়েছে সেগুলো সংস্কার করার মাধ্যমে কৃষক ও পরিবেশবান্ধব করতে দ্রুতই পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

এএডি/


Loading...
Loading...
খবর- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: