শারদীয় দুর্গোৎসবের মূল আকর্ষণ মহাষ্টমীতে ‘কুমারী পূজা’। মঙ্গলবার (৩০ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর গোপীবাগের রামকৃষ্ণ মিশনে এ পূজার আয়োজন করা হয়। এদিন রামকৃষ্ণ মিশনে সকাল ৬টা ৩৩মিনিটে মহাঅষ্টমী পূজা শুরু হয়। আর কুমারী পূজা শুরু হয় বেলা ১১টায়, যা দুপুর ১২টায় শেষ হয়। দেশের বিভিন্ন মণ্ডপে একই আয়োজন ছিলো। কুমারী বালিকার মধ্যে বিশুদ্ধ নারীর রূপ কল্পনা করে তাকে দেবী জ্ঞানে পূজা করেন ভক্তরা। এবার কুমারী পূজায় ছিল ভক্তদের উপচেপড়া ভিড়।
পূজার আয়োজকরা জানান, মহাষ্টমীর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ কুমারী পূজা। সাধারণত, এক থেকে ১৬ বছরের অজাতপুষ্প সুলক্ষণা ব্রাহ্মণ বা অন্য গোত্রের অবিবাহিত কুমারী নারীকে দেবী জ্ঞানে পূজা করা হয়। এবার কুমারী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে সাত বছর বয়সের লাবণ্য চট্টোপাধ্যায়।
শাস্ত্র মতে, কুমারী দেবীর নাম রাখা হয়েছে ‘মালিনী’। কুমারী দেবীর বাবার নাম বিজয় চট্টোপাধ্যায়। তাকে ভোরে স্নান করিয়ে নতুন কাপড় পরানো হয়। তারপর সাজিয়ে কপালে সিঁদুর, পায়ে আলতা ও হাতে ফুল দেওয়া হয়। পরে তাকে সুসজ্জিত আসনে বসিয়ে ষোড়শোপচারে (১৬ উপাদান) দেবীজ্ঞানে পূজা করা হয়। এ সময় চারদিকে শঙ্খধ্বনি, ঢাকের বোল, উলুধ্বনি ও দেবী স্তুতিতে মুখর হয়ে ওঠে।
বেলা ১১টায় ‘কুমারী মায়িকি জয়, দুর্গা মায়িকি জয়’ ধ্বনিতে কুমারী দেবীকে মণ্ডপে আনা হয়। এ সময় দুর্গা প্রতিমার সামনে কুমারী দেবীর বেদি স্থাপন করা হয়। পূজা শুরুতেই মন্ত্রপাঠ ও প্রার্থনা করা হয়। পরে পঞ্চ উপকরণে কুমারী দেবীকে আরাধনা করেন পুরোহিত ও ভক্তরা। পূজা চলাকালে ওই কুমারী ভক্তদের আশীর্বাদ করে। পূজার ফাঁকে ঢাক-ঢোল, শঙ্খ, কাঁসর ও ঘণ্টা ধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে মণ্ডপ। ভক্তরা ঘুরে ঘুরে উলুধ্বনি দেন। এরপর প্রসাদ বিতরণ করা হয়।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর বলেন, দেবীদুর্গাকে সম্মান জানাতেই অষ্টমীতে আয়োজন করা হয় কুমারী পূজার। কুমারী পূজার ১৬টি উপকরণ দিয়ে পূজার আনুষ্ঠানিকতার সূত্রপাত। এর মাধ্যমে নারী জাতির প্রতি সবাই শ্রদ্ধাশীল হবে।
তিনি বলেন, আধুনিক পৃথিবীতে সামাজিক, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক সংকট নিরসন করে অগ্রগামী হতে হলে মাতৃজাতির প্রতি যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শন করা উচিত। জগতের অনেক স্থানে নারীকে সম্মান দেওয়া হয় পত্নীরূপে বা সহকারিণীরূপে। কিন্তু, নারীর সবচেয়ে মহিমময় রূপ তার মাতৃরূপ। তাই মহাষ্টমী তিথিতে আমরা জগতের সব মাতৃজাতিকে উদ্দেশ্য করে কুমারী মাতাকে প্রণাম জানাই। তার মাধ্যমে আদ্যাশক্তিকে আমাদের প্রণাম নিবেদন করি।
শ্রীরাম কৃষ্ণের কথা মতে, কুমারী পূজার বিষয়ে বলা হয়েছে, শুদ্ধাত্মা কুমারীতে ভগবতীর রূপ বেশি প্রকাশ পায় এবং মাতৃরূপ উপলব্ধি করাই কুমারী পূজার প্রধান উদ্দেশ্য। শাস্ত্রে এক বছর বয়সী কন্যাকে সন্ধ্যা, দুইয়ে সরস্বতী, তিনে ত্রিধামূর্তি, চারে কলিকা, পাঁচে সুভাগা, ছয়ে উমা, সাতে মালনী, আটে কুজ্বিকা, নয়ে কালসন্দর্ভা, দশে অপরাজিতা, এগারোয় রুদ্রানী, বারোয় ভৈরবী, তেরোয় মহালক্ষ্মী, চোদ্দতে পীঠ নায়িকা, পনেরোতে ক্ষেত্রজ্ঞা এবং ষোলো বছরে তাকে অন্নদা নামে অভিহিত করা হয়।
মহাঅষ্টমী পূজায় রামকৃষ্ণ মিশনের পাশাপাশি ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির, রমনা কালী মন্দির, আনন্দময়ী আশ্রম, বরোদেশ্বরী কালীমাতা মন্দির ও শ্মশান, সিদ্ধেশ্বরী কালিমাতা, ভোলানাথ মন্দির আশ্রম, জগন্নাথ হল, ঋষিপাড়া গৌতম মন্দির, শাখারী বাজার পানিটোলা মন্দিরসহ বিভিন্ন মণ্ডপে সকাল থেকেই দেবী দর্শনে মানুষের উপচে পড়া ভীড় দেখা গেছে। সকালে অষ্টমী পূজার পুষ্পাঞ্জলি শুরু হলে ভীড় বাড়তে থাকে। ফুলে-ফলে ভরে যায় মন্দির চত্বর। সন্ধ্যা আরোতিতে ভীড় আরো বাড়ে।
পঞ্জিকানুযায়ী আগামীকাল বুধবার মহানবমী পূজা। এদিন সকাল ৩টা ৫ মিনিট পর মহানবমী আরম্ভ ও ৮টা ৫৮ মিনিটের মধ্যে মহানবমীর বিহিত পূজা শেষ হবে। অনেকের বিশ্বাস মহানবমীর দিন হচ্ছে দেবী দুর্গাকে প্রাণ ভরে দেখে নেওয়ার ক্ষণ। এই দিন অগ্নিকে প্রতীক করে সব দেবদেবীকে আহুতি দেওয়া হয়। অগ্নি সব দেবতার যজ্ঞভাগ বহন করে যথাস্থানে পৌঁছে দিয়ে থাকেন। এই দিনই দুর্গাপুজার অন্তিম দিন। পরের দিন কেবল বিজয়া ও বিসর্জনের পর্ব।
সময়ের আলো/এনএ