বিশেষ এক ব্যক্তির প্রতিষ্ঠানকে ‘বিশেষ সুবিধা’ দিয়ে সার আমদানির কার্যাদেশ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে। নিয়ম ভেঙে একই কার্যাদেশে দুটি দেশের অনুকূলে ভিন্ন ভিন্ন দরে একটি লটের সার আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ওই ব্যক্তির প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ম ভেঙে শর্তসাপেক্ষে সম্মতিপত্র দেওয়ার পরও মন্ত্রণালয় থেকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। অথচ যারা নিয়ম মেনে এবং সময় মতো কৃষি মন্ত্রণালয়কে সম্মতিপত্র প্রদান করেছে তাদের কার্যাদেশ প্রদান করা হয়নি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব ও একজন যুগ্ম সচিবের যোগসাজসে এ ধরনের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ জুলাই সাড়ে ৯ লাখ টন সার আমদানির একটি দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে ৫ লাখ ১৫ লাখ টন টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি আমদানির কার্যাদেশ প্রদান করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়। বাকি ৪ লাখ ৩৫ হাজার টনের আমদানির জন্য পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হয়। এই ৫ লাখ ১৫ হাজার মেট্রিক টন নন ইউরিয়া সার আমদানির কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে মোট ১৯টি প্রতিষ্ঠানকে। এর মধ্যে এক ব্যক্তির মালিকানাধীন দুটি প্রতিষ্ঠান এবং ওই ব্যক্তির আত্মীয়ের এক প্রতিষ্ঠানের নামেই মোট ২ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন সার আমদানির কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। যা আমদানির জন্য দেওয়া মোট কার্যাদেশের ৪০ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এমনকি, এই ব্যক্তিকে যে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে সেখানেও বিশেষ সুবিধা দিতে দেখা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এক ব্যক্তির অনুকূলে এত বেশি সার আমদানির কার্যাদেশ দেওয়াতে এক ধরনের ঝুকি তৈরি হয়েছে। কোনো কারণে তিনি সময়মত সার সরবরাহ করতে না পারলে নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া কৃষির পণ্য উৎপাদনের সর্বোচ্চ মৌসুমে সারের ঘাটতি তৈরি হতে পারে।
জানা গেছে, বড় কার্যাদেশ পাওয়া দুটি প্রতিষ্ঠান হলো—দেশ ট্রেডিং কর্পোরেশন এবং বাল্ক ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল। দুটি কোম্পানির স্বত্বাধিকারী হলেন আমিনুর রশিদ খান। অন্য কোম্পানি এন.আর.কে হোল্ডিং-এর স্বত্বাধিকারী নায়েব রশিদ খান, যিনি আমিনুর রশিদ খানের ঘনিষ্ট আত্মীয় হিসেবে পরিচিত। এই প্রতিষ্ঠানের নামে কার্যাদেশটি আমিনুর রশিদ খানই নিয়েছেন বলে জানা গেছে। নির্দিষ্ট দেশ থেকে সার আমদানির জন্য ভিন্ন ভিন্ন দর অনুমোদন করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়। একই কার্যাদেশে দুটি দেশের জন্য ভিন্ন ভিন্ন দর প্রদান করলেও পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে একসঙ্গে। যে সুবিধাটা বাকি ১৮ আমদানিকারকের কাউকেই দেওয়া হয়নি। বাকি আমদানিকারকদেরকে অবশ্য নিয়ম অনুযায়ী একটি লটের বিপরীতে একটি নির্দিষ্ট দামে একক দেশের অনুকূলেই সার আমদানির কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে।
অথচ এই আমদানিকারক কৃষি মন্ত্রণালয়কে শর্ত সাপেক্ষে সম্মতিপত্র প্রদান করেছিলেন। যে ধরনের সম্মতিপত্রের বিপরীতে কার্যাদেশ দেওয়া অবৈধ।
আমিনুর রশিদ খানের কোম্পানিগুলোর সম্মতিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সরকার নির্দিষ্ট দেশের বিপরীতে একটি দর নির্ধারণ করলেও প্রতিষ্ঠানটি সব অরিজিনের জন্য একই দর প্রস্তাব করেছিল। আবার সরকারের দরপত্রের শর্ত দেওয়া হয়েছিল যে,আমদানিকারক কার্যাদেশ পাওয়ার পর যেদিন এলসি খুলবেন সেদিনের সোনালি ব্যাংকের ডলার রেট ধরে সরকার পেমেন্ট করবেন। কিন্তু তিনি তার সম্মতিপত্রে শর্ত দিয়েছিল- সরকার যেদিন পেমেন্ট করবে সেদিনের সোনালি ব্যাংকের ডলার রেটকে আমলে নিতে হবে। কিন্তু এ ধরনের শর্তসাপেক্ষে দেওয়া সম্মতিপত্রে কাজ দেওয়া পুরোপুরি অবৈধ বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তারপরও তার কোম্পানিগুলোকে কার্যাদেশ দিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়।
অথচ তার আগে যারা স্বচ্ছ এবং নিয়ম মেনে সম্মতিপত্র দিয়েছিল তাদেরকে কাজ দেওয়া হয়নি। একইসঙ্গে তাকে দেওয়া কার্যাদেশের মধ্যেও বাড়তি সুবিধা দেওয়া হয়েছে। সবাইকে কার্যাদেশ পাওয়ার পর পণ্য জাহাজীকরণের জন্য যে সময় দেওয়া হয়েছে, সেখানে আমিনুর রশিদের প্রতিষ্ঠানকে ১০ দিনের সময় বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া তথ্যাদি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দেশ ট্রেডিং কর্পোরেশনের নামে একটি কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে ৩০ হাজার মেট্রিক টন টিএসপি সার আমদানির জন্য। এই ৩০ হাজার টনের জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে দুটি দেশের দর অনুমোদন করা হয়েছে। মরক্কো থেকে ৬৯৪ মার্কিন ডলার এবং লেবানন থেকে ৬৮৮ মার্কিন ডলার। কিন্তু কোন দেশ থেকে কতটুকু আমদানি করবে তা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়নি। একইভাবে বাল্ক ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের নামে ৪০ হাজার টন ডিএপি সার আমদানির একটি কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই সার একইসঙ্গে দুটি দেশ থেকে আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ৮৭৪ মার্কিন ডলারে মিশর থেকে এবং ৮৪৮ ডলারে চীন থেকে আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আবার দরপত্র জমা দেওয়ার সময় আমিনুর রশিদের কোম্পানিগুলো সর্বোচ্চ দর প্রস্তাব করলেও তাদেরকে প্রায় ১০০ ডলার কমিয়ে দিয়ে কার্যাদেশ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
একইভাবে দেশ ট্রেডিং করপোরেশনকে ৩০ হাজার টনের একটি এবং বাল্ক ট্রেড ইন্টারন্যাশনালকে ৩০ হাজার টন করে দুটি কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে মোট ৯০ হাজার টন টিএসপি আমদানির জন্য। এখানে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানকে টিএসপি আমদানির কার্যাদেশ দেওয়া হয়নি। একইভাবে ৩ লাখ ৩৫ হাজার মেট্রিক টনের ডিএপি আমদানির কার্যাদেশ দিয়েছে মন্ত্রণালয়, যেখানে ৪০ হাজার মেট্রিক টন করে বাল্ক ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের নামে দুটি এবং একই পরিমাণে এন.আর.কে. গ্লোবালের নামে একটি কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। ডিএপির ক্ষেত্রে মামুনের প্রতিষ্ঠানগুলোকে মোট ১ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা ছিল, নির্দিষ্ট দেশভিত্তিক নির্ধারিত দর উল্লেখ করে এই সম্মতিপত্র দেওয়ার কথা। তবে বাল্ক ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল টিএসপি আমদানির জন্য ৭০৪ ডলার দাম উল্লেখিত সব অরিজিনের জন্য (দেশভিত্তিক) চিঠি দেয়। অথচ ৭০৪ ডলার দর নির্ধারণ করা ছিল শুধু তিউনেশিয়ার জন্য। মরক্কোর জন্য ছিল ৬৯৪ ডলার, লেবানন ও মিশরের জন্য ৬৮৮ ডলার করে দাম নির্ধারণ করে দিয়েছিল কৃষি মন্ত্রণালয়। অথচ বাল্ক ট্রেড টিএসপি আমদানির যে দুটি কার্যাদেশ পেয়েছে সেগুলো মরক্কো এবং লেবানন থেকে আমদানির জন্য। আবার প্রতিষ্ঠানটি এই সম্মতিপত্রের সঙ্গে নিয়ম অনুযায়ী কোনো ম্যানুফেকচার সার্টিফিকেট সংযুক্ত করেনি। এই ধরনের সম্মতিপত্রে কার্যাদেশ দেওয়ার সুযোগ নেই, এগুলো বাতিল হওয়ার কথা। অথচ তাকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ সার আমদানির জন্য দুটি দেশের মূল্য উল্লেখ করে কার্যাদেশ দেওয়ার কোনো নজির নেই। কৃষি মন্ত্রণালয়ে আলোচনা রয়েছে, সার ব্যবস্থাপনা ও উপকরণ উইং-এর অতিরিক্ত সচিব আহমেদ ফয়সাল ইমাম ও যুগ্ম সচিব মো. খোরশেদ আলম এই কার্যাদেশ পাইয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে ভুমিকা রেখেছেন।
এ বিষয়ে কৃষি সচিব মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বলেন, সারের ক্ষেত্রে তারা প্রাইভেট সেক্টরের ওপর নির্ভরতা কমাচ্ছেন। আগে নিয়ম ছিল ফার্স্ট লোয়েস্ট, সেকেন্ড লোয়েস্ট ও থার্ড লোয়েস্ট। তারা যে দাম দিত, সেই দামে সার আনা হতো। এখন ফার্স্ট লোয়েস্ট যেটা থাকবে সেটাতে অন্যদেরও অফার করা হবে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে মন্ত্রণালয়। এতে রাজি হলে তাদের কাছ থেকেও সার নেওয়া হবে। এই নিয়মের কারণে এবার একটি দরপত্রের মাধ্যমে পাঁচ লাখ ১৫ হাজার মেট্রিক টন সার আমদানিতে সরকারের ২৩৩ কোটি ৬১ লাখ ৪৩ হাজার টাকা সাশ্রয় হয়েছে। এটার জন্য হয়তো কারো কারো কিছুটা সংক্ষুব্ধতা ছিল। সংবাদমাধ্যমে অনেককে ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছে। সেটা কিন্তু সঠিক না।
তিনি বলেন, সারের ক্ষেত্রে যাতে কারো ওপর নির্ভর করে কোনো কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি না হয়, এটা নিশ্চিত করার জন্যই সরকারের এই ব্যবস্থাগুলো। এতে সরকারের অর্থের অনেক আশ্রয় হয়েছে। সামনের সার ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও কোনো সমস্যা হবে না।
এসকে/