‘গতকাল রাতে’, ‘এখন অনেক রাত’, ‘হায় স্বাধীনতা’, ‘সাড়ে তিন হাত মাটি’, ‘একজন জারজ সন্তান’, ‘পেনশন’ অথবা ‘এক কাপ চা’-এর মতো অজস্র শ্রোতাপ্রিয় গানের গীতিকবি বাপ্পী খান। দেশের অন্যতম ব্যান্ড কিংবদন্তি আইয়ুব বাচ্চুর সঙ্গে যার ছিল এক আত্মিক সম্পর্ক। আইয়ুব বাচ্চুর সুরে এলআরবি ও অন্য শিল্পীদের জন্য প্রায় শতাধিক গান লিখেছেন এই গীতিকবি। আগামী ১৮ অক্টোবর আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুবার্ষিকীকে সামনে রেখে তাকে নিয়ে দৈনিক সময়ের আলো'র পাঠকদের জন্য স্মৃতিচারণ করেছেন বাপ্পী খান।
আইয়ুব বাচ্চু এক আবেগের, ভালোবাসার নাম। দেশের অন্যতম এই ব্যান্ড কিংবদন্তিকে নিয়ে আলাদা করে কিছু লেখার ইচ্ছা এবং চাপটা অনেক দিনের। কিন্তু এক ধরনের অসহায়বোধ থেকে তা প্রায় অসম্ভব। তারপরেও কিছু লিখব। খণ্ড খণ্ড কিছু স্মৃতিচারণ। তাকে নিয়ে একটা সম্পূর্ণ লেখার কাজে হাত দিয়েছি, যদিও তা কাগজে-কলমে শুরু হয়নি। আইয়ুব বাচ্চু একজন প্রয়াত মানুষ (আল্লাহ তাকে বেহেশত নসিব করুন)। তাই জাগতিক সাফল্য, প্রতিষ্ঠা, জনপ্রিয়তা এসব কিছুই আমার লেখার অভীষ্ট না। এ আমার নিছক স্মৃতিচারণ।
তখন ‘ময়না’ অ্যালবামটি রিলিজ হয়েছে মাত্র। অ্যালবামের একটা গান আমার খুব মনে লেগেছিল। আইয়ুব বাচ্চুর লেখা, গাওয়া এবং সুর করা গানগুলোর কথা ছিল এমন ‘ও বন্ধু তোমায় যখনই মনে পড়ে যায় / বুকেরই মাঝে বড় বেশি ব্যথা বাজে / আমার ইচ্ছে করে প্রাণ ভরে তোমায় দেখি / আমায় কথা দাও কখনো ছেড়ে চলে যাবে না।’ কী অসাধারণ কথা! কী মর্মস্পর্শী সুর! কী আবেগঘন কম্পোজিশন, গিটার, গায়কী। এই গান শুনেই একজন মিউজিশিয়ান আইয়ুব বাচ্চুর আসক্ত হয়েছিলাম আমি।
তো সে সময় গাইড হাউস অডিটোরিয়ামে সোলসের শো দেখতে গেলাম। আমি ভেবেছিলাম এই গানটি তিনি গাইবেন। কিন্তু এত উত্তেজনায় সোলসের শো দেখছিলাম যে, এটি ভুলেই গিয়েছিলাম। হঠাৎ যখন শো শেষ হলো, তখন খেয়াল হলো গানটির কথা। ততক্ষণে যন্ত্রপাতি খোলা শুরু হয়েছিল। লোকজন প্রায় সবাই চলে যাচ্ছে। আমি দৌড়ে স্টেজের সামনে এসে বললাম, ‘বাচ্চু ভাই ও বন্ধু তোমায় গানটা দুই লাইন শোনাবেন?’ তিনি অবাক হয়ে তাকালেন আমার দিকে।
তারপর শুধু গিটারেই গানটার প্রথম চার লাইন শোনালেন। আমি মুগ্ধতার সঙ্গে তার লেখা, সুর আর গানের প্রেমে আবদ্ধ হলাম। পরে একবার আমি প্রশ্ন করেছিলাম, আমার গানের অনুরোধে এত অবাক হয়েছিলেন কেন? তিনি উত্তরে বলেছিলেন, ‘মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে অ্যালবাম বের হলো। কেমন চলবে তখনও বুঝতে পারছিলাম না। প্রডিউসার বলছিলেন, ময়না গানটা হিট হতে পারে (আমি হিট শব্দটি ব্যবহার করি না, বাণিজ্য সম্ভাবনার খাতিরে লিখলাম)। “ও বন্ধু তোমায়” গানটা তখন কেউ অনুরোধ করতে পারে, ভাবতেই পারিনি। ভালো একজন শ্রোতার দেখা পেলে যেমন ভালো লাগে, তেমন করেই তাকিয়েছিলাম তোর দিকে।’
আশিকুজ্জামান টুলুর সংগীতে আমার প্রথম সলো অ্যালবামের কাজ শুরু হয় সারগাম স্টুডিওতে। সারগাম তখন গানের মানুষের মিলনমেলা। আইয়ুব বাচ্চু তখন প্রায়ই আসতেন বিভিন্ন কাজে। সেই সুবাদে পরিচয়। তেমন ঘনিষ্ঠ কিছু নয়। কিন্তু আইয়ুব বাচ্চুর ছিল মানুষকে মনে রাখার সাংঘাতিক ক্ষমতা। বাংলা ১৩৯৮-এর পহেলা বৈশাখ।
আমি মাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক অ্যাডে ভর্তি হয়েছি (তিন মাস মাত্র সেখানে ছিলাম)। কলাভবনের পাশের মাঠে বিরাট বৈশাখের কনসার্ট হবে। উত্তেজনার শেষ নেই। বন্ধুরা মিলে কনসার্টে গেলাম। আমি উৎসুক হয়ে স্টেজের পেছনে গেলাম। হঠাৎ দেখলাম আইয়ুব বাচ্চু একটা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে কী যেন ভাবছেন। আমি দৌড়ে গিয়ে সালাম দিলাম। তিনি আমাকে চিনতে পারলেন। বললেন, ‘কেমন আছিস?’ আমি বললাম, বাজাবেন না? তিনি বিষণ্ন একটা হাসি দিয়ে ঝুঁকে বললেন, ‘আমি সোলস ছেড়ে দিলাম রে!’ আমার মাথায় বৈশাখের আকাশটা ভেঙে পড়তে শুধু বাকি ছিল।
সোলস ছাড়া আইয়ুব বাচ্চু আর আইয়ুব বাচ্চু ছাড়া সোলসের কথা ভাবতেই কেমন উথাল-পাথাল শুরু হয়েছিল বোঝাতে পারব না। এক সেকেন্ডের মধ্যেই আমি চেতনায় ফিরে এলাম। আমি অসংলগ্ন সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য তাকে বললাম, সব ঠিক হয়ে যাবে। তিনি হেসে বললেন, আমি একটা ব্যান্ড করেছি, ইয়েলো রিভার ব্যান্ড (পরে লিটল রিভার ব্যান্ড)। আজকে প্রথম শো একটা বিদেশি ক্লাবে। ঢাকার সব ইনস্ট্রুমেন্ট এখানে এসেছে। এখানে শো শেষ হলে, কিছু কিছু ইনস্ট্রুমেন্ট আমার শোতে যাবে। তাই অপেক্ষা করছি।
একদিকে বিষাদ, অন্যদিকে উদ্দীপনা। কেমন যেন অপার্থিব এক চেহারা সেদিন আমি দেখেছিলাম বোঝাতে পারব না। একজন মানুষ আইয়ুব বাচ্চুর প্রতি এই অমোঘ প্রীতির সূচনা বোধ হয় তখন থেকেই শুরু। বাচ্চু ভাইয়ের একটা খুব প্রিয় অস্ট্রেলিয়ার ব্যান্ড ছিল লিটল রিভার ব্যান্ড। একসময় ঘোষণা দিয়ে সেটি বন্ধ করা হয়। তখন এই ব্যান্ডের নাম দেন লিটল রিভার ব্যান্ড (এলআরবি)। অনেক দিন এ নামেই চলে। পরে ওই ব্যান্ডটি আবার সংগঠিত হয়। তখন বাচ্চু ভাই ‘এলআরবি’ ঠিক রেখে ব্যান্ডের নাম রাখেন লাভ রানস ব্লাইন্ড। এলআরবির সঙ্গে আমার পথচলা আর আইয়ুব বাচ্চুর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতার কথকতা আমার জীবনে আমৃত্যু স্মৃতি হয়ে থাকবে।
আমি গান গেয়ে ভেবেছিলাম অনেক কিছু করে ফেলব। সরকারি টিভির দালালকে উৎকোচ দিতে হবে বলে গান প্রচারিত হলো না। সে সময় এর খুব চল ছিল। যাক, হতাশ হয়ে গান গাওয়া প্রায় বন্ধ। কিন্তু সারগামে আড্ডা চালু ছিল। টুলু ভাই, বাচ্চু ভাই, জেমস ভাই আর ফান্টি ভাইয়ের সঙ্গে বিশেষ ঘনিষ্ঠতা হয় তখন। এলআরবির প্রথম ডাবল অ্যালবামের কাজ প্রায় তখন শেষের দিকে। ওই সময়ই জেমস ভাইয়ের সুরে ‘ম্যানিলা; পেনফ্রেন্ড’ নামে একটা গানের কথা আমি লিখেছিলাম অন্য শিল্পীর জন্য। বাচ্চু ভাই ওই রেকর্ডিংয়ে এসে গানটা শুনলেন। জেমস ভাইকে বললেন, ‘ভালো হইছে তো। এটা কার লেখা?’ জেমস ভাই বলল, ‘এই যে বাপ্পীর লেখা। ব্যাটাকে জোর করে গান লেখালাম। গায়ক থেকে গীতিকার। হা হা হা।’
বাচ্চু ভাই কিছুক্ষণ বসলেন। যাওয়ার আগে আমাকে ডাকলেন। সারগামে একটা ছোট কক্ষ ছিল। সাধারণত বাদল ভাই ব্যবহার করত। কিছু জরুরি আলাপের জন্যও রুমটি ব্যবহার হতো। যাক আমি ওই রুমে গেলাম। বাচ্চু ভাই আমাকে বললেন, ‘এলআরবির গান রেকর্ড চলছে, তুই গান দে।’ আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম। আমি গান লিখব? আমি বললাম, ’গান তো নেই।’ বাচ্চু ভাই বলল, ‘কবিতা আছে?’ আমি বললাম, ‘আছে কিছু।’ বাচ্চু ভাই বলল, ‘কালকে নিয়ে আয়।’ রাতে আমার অবস্থা খারাপ। বাচ্চু ভাইকে লেখা দিতে হবে! আমার সলো অ্যালবামে আমার লেখা আটটি গান ছিল। সেগুলো প্রয়োজনে বা অতি আবেগে লেখা। কিন্তু বাচ্চু ভাইকে গান দিতে হবে, বিস্ময়কর লাগছিল। যাক, আমার দুটি কবিতার খাতা ছিল।
একটি রোমান্টিক আর অন্যটি সাধারণ। আমি ভাবলাম, সবাই তো রোমান্টিক গান করে, আমি অন্য একটা স্টাইলে গান করি। মানে রোমান্টিক না করাটাই একটা স্টাইল ধরে নিলাম। একটা কবিতার খাতা নিয়ে পরের দিন বিকালে সারগাম নিয়ে গেলাম। বাচ্চু ভাইকে পেলাম না। খাতাটা রেখে এলাম। অনেক রাতে বাচ্চু ভাই বাসায় ফোন করে বললেন, ‘এটা তুই কী করলি?’ এরপর বললেন, ‘কালকে ৬টায় সারগামে আয়।’ ভাবলাম লেখা এতই আজব যে, বাচ্চু ভাই পছন্দ করেননি। পরের দিন সারগামে গেলাম।
বাচ্চু ভাই আমার মাথায় আলতো করে হাত দিয়ে হাসলেন। স্বপন ভাই, জয় ভাই আর টুটুল অন্যরকম করে তাকাচ্ছিল। যাক, এলআরবির সেশনে ঢোকার সৌভাগ্য হলো। এবার আমার হার্টফেল হওয়ার পালা। সেদিন রেকর্ড হলো, ‘পেনশন’ অফিসের দ্বারে দ্বারে দিন প্রতিদিন / মেলে নাকো পেনশন চলে যায় দিন।’ আমার চোখে ভালো লাগার অশ্রু। আমার কবিতা যে এভাবে গান হতে পারে আমি কখনো ভাবিনি। যাক, সেই থেকে শুরু। ওই অ্যালবামে আরও দুটি গান আমার ছিল ‘জীবনের মানে’ ও ‘এক কাপ চা’। তারপর দিন কেমন করে কেটেছে বোঝাতে পারব না। ১৯৯২, ১৯৯৩, ১৯৯৪ এই তিন বছর আমি আর বাচ্চু ভাই প্রায় প্রতিদিনই গান নিয়ে বসেছি। আমাদের একটা সং ব্যাংক ছিল। কে গাবে, কোন প্রোডাকশন করবে এসবের বালাই না রেখে আমরা গান জমাতাম। এই তিন বছরেই আমরা দুজনে প্রায় অর্ধশত গান বেঁধেছিলাম।
এরপর কুরবানির ঈদে রিলিজ হয় এলআরবির প্রথম ডাবল অ্যালবাম। প্রথমে এর ক্যাসেট মাস্টার বাচ্চু ভাইয়ের পছন্দ হয়নি। তাই আবার করা হলো। আমার মনে আছে, কুরবানির ঈদের দিন বিকালেও আমরা স্টুডিওতে ছিলাম। আস্তে আস্তে পাড়া-মহল্লায় ‘ঘুম ভাঙা শহরে’, ‘মাধবী’, ‘হকার’ বাজতে শুরু করেছিল। সে সময় শো আসা শুরু করেছিল। আমি প্রায় সব শোতেই যেতাম। একটা কনসার্টের কথা আমার আজীবন মনে থাকবে। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের শো। পুরো মাঠ ভরা দর্শক। এলআরবির নতুন গানগুলো তখন গাওয়া হতো। মাঠের এক পাশে একটা ছোট রুম ব্যান্ডের জন্য রাখা হয়েছিল।
শোয়ের পর কোনোভাবে আমরা ওই রুমে গিয়ে বসলাম। এত লোক ছবি তুলছিল যে, বেশ ভালো লাগছিল। পাশাপাশি আমরা বসা। সম্ভবত জয় ভাই, স্বপন ভাই, আমি, বাচ্চু ভাই এবং শেষে টুটুল। হঠাৎ স্বপন ভাই আমার দিকে একটা খাতা এগিয়ে দিলেন। আমি প্রথমে বুঝিনি। স্বপন ভাই বললেন, আরে অটোগ্রাফ দাও। আমি তো শঙ্কিত, খানিক লজ্জাও লাগছিল। ভাবলাম কী এমন করলাম যে অটোগ্রাফ চাইছে। এক মিনিট পরে খাতাটা বাচ্চু ভাইয়ের দিকে এগিয়ে দিলাম। তিনি বিষয়টি বুঝলেন। মুচকি হেসে বললেন, আরে দে দে, জীবনে আরও দিতে হবে। সবে তো শুরু। আমি লিখলাম, ‘আমার অটোগ্রাফ দেবার বয়স হয়নি-বাপ্পী।’ তখনও শুধু বাপ্পী নামেই লিখতাম। এক দিন বাচ্চু ভাইকে বললাম, এক নামে তো আরও বাপ্পী আছে। মানুষ আমাকে আলাদা করে কী করে চিনবে? তিনি বললেন ‘বাপ্পী’-র সঙ্গে পারিবারিক ‘খান’ লাগিয়ে দে। এরপর সুখ/স্টারস অ্যালবাম থেকে ‘বাপ্পী খান’ হিসেবেই লিখছি।
১৯৯৭, ১৯৯৮, ১৯৯৯ এই তিন বছর আমি, বস আর এসআই টুটুল একসঙ্গে অনেক সময় কাটিয়েছি। ব্যান্ডের কাজে এসআই ছিল বসের সহযোগী আর আমি ছিলাম বিভিন্ন আইডিয়া বের করতাম। গান-বাজনা ছাড়াও আমাদের তিনজনের ব্যক্তিগত জীবন এক সুরে বাজত। এসআই টুটুল বাচ্চু ভাইকে এত সম্মান করত যে, সেটি ভয়ের পর্যায়ে থাকত। আমি সম্মান করতাম ঠিকই, কিন্তু আমি ছিলাম ঠোঁট কাটা। আমার গঠনমূলক সমালোচনা বাচ্চু ভাই ভালোবাসতেন এবং মানতেন। সমবয়সি বন্ধুর মতো তিনি আমার সঙ্গে মিশতেন। আমার মনে আছে কোনো নতুন গান ভালো লাগলে আমি বলতাম, ‘thank you ayuuubbb’, বস বাচ্চাদের মতো খুশি হতেন। ভয়েস দেওয়ার সময় আমাকে প্যানেলে বসাতেন, যাতে উচ্চারণের সমস্যা হলে আমি বলি। এমন অনেক গান আছে, আমার অনুপস্থিতিতে ওকে হওয়ার পরেও আমি পরে যখন কোনো সমস্যা পেয়েছি, বাচ্চু ভাই হাসি মুখে আবার করেছেন।
এবার একটা অন্যরকম স্মৃতির কথা বলি। দিনক্ষণ অতটা মনে নেই। বিরানব্বইয়ের শেষের দিকে অথবা তিরানব্বইয়ের শুরুর দিকে শিশু একাডেমির একটা শো। এলআরবি এবং আরেকটি ব্যান্ড। যথারীতি প্রথম ব্যান্ডের শো শেষ। এলআরবি স্টেজে উঠে মাত্র একটা গান শেষ করেছে। হঠাৎ চার-পাঁচজন পুলিশ স্টেজে উঠে গেল। উঠেই তারা বাচ্চু ভাইকে ঘিরে ধরে টানাটানি শুরু করল। ব্যান্ডের অন্য তিনজন ভয়ে পাথর হয়ে গেছে, আমিও হতবাক। ততক্ষণে বাচ্চু ভাইয়ের শার্ট ছিঁড়ে গেছে। সাদার মধ্যে কালো বল প্রিন্টের একটা শার্ট ছিল। ওই শার্টটা অনেক বছর বস যত্ন করে রেখেছিলেন। সেদিন আমার পাশে ছিল মির্জা; মিউজিশিয়ান ও সাউন্ড ইন্ডিয়ার।
আমরা দুজন লাফ দিয়ে স্টেজে উঠে গেলাম। আমরা দুজন বাচ্চু ভাইকে সামনে-পেছনে জড়িয়ে ধরলাম। পুলিশরা ক্ষেপে আমাদের লাঠি দিয়ে আঘাত করে। আমি চিৎকার করছিলাম, আপনারা কী করছেন? কাকে ধরে টানছেন? গান থামালেন কেন? ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু তারা কোনো কথা না শুনে সবাইকে সার্চ করে হল থেকে বের করে দিল। কনসার্ট পণ্ড। পুলিশের সঙ্গে আলোচনায় জানা গেল যে আমাদের গানের জগতের কেউ খবর দিয়েছে যে বাচ্চু ভাই নাকি সন্ত্রাসীদের শেলটার দেয়, আর এই কনসার্টেও নাকি অস্ত্রসহ কেউ কেউ আছে। এ জন্য তারা বাচ্চু ভাইয়ের শোতে সার্চ করার নির্দেশ পেয়েছে। কিন্তু বাচ্চু ভাইকে টেনে স্টেজ থেকে নামার কোনো কথা ছিল না।
এই ঘটনার পরের দিন আমি আর বাচ্চু ভাই রমনা থানায় গেলাম। ওসি বাচ্চু ভাইয়ের কাছে ক্ষমা চাইলেন। দুজন কনস্টেবলকে ডেকে মাফ চাইতে বললেন। তারা যে ঘটনা বলল, শুনে আমরা থ বনে গেলাম। কোনো এক ব্যান্ডের লোকেরা টাকা দিয়ে এই কাজ করিয়েছে। বাচ্চু ভাই আমাকে প্রমিজ করালেন, ওই ব্যান্ডের নাম যেন আমি কখনো না বলি। আমি এই প্রমিজটি রেখেছি। কোনোদিন এই ঘটনা আমি কোথাও শেয়ার করিনি। এখন করলাম একটা কারণে। বাচ্চু ভাই চাইলে তাদের সঙ্গে ঝামেলা করতে পারতেন। করেননি। এই ঝামেলায় তিনি জড়াতে চাননি। এমনকি আমার প্রবল আপত্তির পরেও একই স্টেজে তাদের সঙ্গে বাজিয়েছেন বাচ্চু ভাই। সেই ব্যান্ডের কেউ এই লেখা পড়লে, জেনে রাখবেন বাচ্চু ভাই আপনাদের মাফ করেছেন।
বাচ্চু ভাইয়ের মৃত্যুর পর আমি ওই ব্যান্ডের কয়েকজনকে টিভি, সোশ্যাল মিডিয়াতে চোখে পানি নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে দেখেছি। বিভিন্ন মঞ্চে বসের গান ট্রিবিউট করতে দেখেছি। বড়ই বিচিত্র এই ইন্ডাস্ট্রি। সবার কাছে অনুরোধ, এই তথ্যটি (ব্যান্ডের নাম) কেউ আমার কাছে জানতে চাইবেন না। আমার মৃত্যুর সঙ্গে এই তথ্যটাও পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাবে। ওয়াদা আমি অটুট রাখব শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত, ইনশাআল্লাহ।
/এমএইচআর