এক শহর, দুই মুখ—ইস্তাম্বুলে চার দিন

নভেদ আহমেদ

সাহিত্য

আমি সাধারণত ভ্রমণ পরিকল্পনা করি অনেক আগেই—যখন এয়ারলাইনগুলো মানুষ টানার জন্য এমন অফার দেয়—মনে হয়, তারা আমাদেরই খুঁজছে, আমরা তাদের

2025-11-15T17:38:42+00:00
2025-11-15T18:26:44+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
সাহিত্য
এক শহর, দুই মুখ—ইস্তাম্বুলে চার দিন
নভেদ আহমেদ
প্রকাশ: শনিবার, ১৫ নভেম্বর, ২০২৫, ৫:৩৮ পিএম  আপডেট: ১৫.১১.২০২৫ ৬:২৬ পিএম  (ভিজিট : ১২৩৯)
গ্রাফিক : সময়ের আলো
আমি সাধারণত ভ্রমণ পরিকল্পনা করি অনেক আগেই—যখন এয়ারলাইনগুলো মানুষ টানার জন্য এমন অফার দেয়—মনে হয়, তারা আমাদেরই খুঁজছে, আমরা তাদের না। ইস্তাম্বুল আসলে আমার তালিকায় ছিল না। কেউ বলেছিল, ‘অসাধারণ শহর’, আবার কেউ বলেছিল, ‘অগোছালো, ভিড় আর পকেটমারের স্বর্গ’—এই দুই চরমের মাঝখানে সত্যিটা কোথায়, তা জানার কৌতূহলেই টিকিট কাটা।

আমি সাধারণত সবসময় বেসিক ইকোনমির চেয়ে একটু ভালো আসনে বসি—যেমন একসময় বন্ধুদের সঙ্গে মধুমিতা সিনেমা হলে রিয়ার স্টলে বসতাম—না বক্সে, না ড্রেস সার্কেলে; ঠিক মাঝামাঝি সেই আরামদায়ক জায়গায়। বিলাস আমার স্বভাবে নেই, আবার অভাবও কোনো লজ্জা নয়। আমি যেন সেই মানুষদের একজন, যারা সামান্য আরামকেই প্রাপ্তি ভাবে, আর অল্পেই তৃপ্তি খুঁজে পায়। জীবনের প্রতিটি যাত্রাতেই তাই আমি খুঁজে নিই ভারসাম্য—যেখানে অতিরিক্ত কিছু নেই, তবুও অভাবের ছায়াও পড়ে না।

শুনেছিলাম, ইস্তাম্বুলে পকেটমাররা নাকি প্রায় শিল্পী। তাই সাবধানতা হিসেবে কিনে ফেললাম এক অদ্ভুত জিনিস—একটা ‘হিডেন পকেট আন্ডারওয়্যার।’ মনে হচ্ছিল, নিজের নিরাপত্তাটাই এবার শরীরের সবচেয়ে নির্জন স্থানে স্থানান্তরিত করলাম।

জেএফকে বিমানবন্দরের স্ক্যানারের সামনে দাঁড়িয়ে আত্মবিশ্বাসটা মুহূর্তেই ভেঙে গেল। স্ক্যানার মেশিনটা হঠাৎ বিপ বিপ বিপ! করে উঠল। এক মহিলা TSA এজেন্ট এসে গম্ভীরভাবে জিজ্ঞেস করল, ‘Sir, what’s hidden in your underwear?’ এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো মজা করে বলি, ‘একটা অস্ত্র, যা মাঝে মাঝে আগেভাগেই বিস্ফোরিত হয়’—কিন্তু নিজেকে থামালাম। সেকেন্ডারি চেকিংয়ে নিয়ে গেল; দৃশ্যটা একসঙ্গে বিব্রতকর, মজার ও মানবিক। 

শেষে কর্মকর্তার মুখেও হাসি ফুটল। আমি মৃদু স্বরে বললাম, ‘Just money’। ভেতরে ভেতরে ভাবছিলাম—আমার টাকা আমি যেখানে খুশি রাখব, এরও স্বাধীনতা থাকা উচিত। ভ্রমণসঙ্গীরা হাসছিল, আমিও হেসেছিলাম—মুখে সংযম, মনে মজা।

ফ্লাইটে কোনো বড় ঘটনা ঘটেনি, তবে খাবারের স্বাদে এক ধরনের উদাসীনতা ছিল। মনে হচ্ছিল, রাঁধুনি ছুটিতে, আর বাকিরা কেবল দায়িত্ব পালন করছে। যাত্রাটা একঘেয়েমি ভরাট হয়ে চলছিল, এমন সময় আমার বোনের স্বামী, বেলাল, পাশের সিটে বসে খাওয়ার সময় অসাবধানতায় কাঁটা-চামচ ফেলে দিলেন পাশের যাত্রীর পায়ের ওপর। মানুষটা চমকে উঠে তাকালেন, মুখে একধরনের অস্বস্তি, আর বেলাল তাড়াতাড়ি ক্ষমা চাইতে লাগলেন, মুখে হালকা লজ্জা। আমি পাশে বসে পুরো দৃশ্যটা উপভোগ করছিলাম—মনে হচ্ছিল, এই ছোট্ট ঘটনাটাই হয়তো পুরো ভ্রমণের সবচেয়ে জীবন্ত মুহূর্ত হয়ে থাকবে। চারপাশের নীরবতার ভেতর সেই বিব্রত হাসিটাই যেন একমাত্র মানবিক সঙ্গী হয়ে রইল।

সন্ধ্যা নামার আগেই পৌঁছালাম ইস্তাম্বুলে। প্রি-অ্যারেঞ্জড ট্রান্সফারের ড্রাইভারের কোথাও দেখা নেই। বাইরে দেখি, এক কিশোর সিগারেট হাতে দাঁড়িয়ে, আমাকে প্রশ্ন করছে, ‘Hotel name? Dora Pera?’ মুহূর্তেই সন্দেহ জাগল—এ কি সত্যিই আমার ড্রাইভার, না অন্য কেউ? পরে জানা গেল, সে কেবল কোঅর্ডিনেটর; গাড়িটা অন্য দিকে দাঁড়িয়ে আছে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। 

ভ্রমণ মানেই এমন ছোট ছোট অচেনা মুহূর্ত, যা প্রথমে ভয় দেখায়, পরে গল্পে পরিণত হয়।

ড্রাইভার মোহাম্মদের সঙ্গে প্রথম কথাতেই প্রশ্ন, ‘Where are you from?’ আমি গর্বের সঙ্গে বললাম, ‘We are American।’ ওর চোখে এক ঝলক অবিশ্বাস—যেন শুনেছে, ‘আমরা মঙ্গল গ্রহ থেকে এসেছি।’ কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলল, ‘No no, originally from where?’ আমি হেসে ফেললাম। এই প্রশ্নটা যেন পৃথিবীর সব বাদামি মানুষের পেছনে লেগে থাকা এক ছায়া। অনেকের কাছে আমেরিকান মানে এখনো সাদা চামড়া, নীল চোখ বা কৃষ্ণবর্ণ মুখ। আমাদের মতো রঙ তাদের সংজ্ঞার বাইরে। অথচ আমেরিকা এখন এক বিশাল মিশ্রণ—সাদা, কালো, বাদামি, চাইনিজ, হিস্পানিক—সবাই মিলে এক মানবিক রঙ তৈরি করেছে। তবুও পৃথিবীর বহু শহরে মানুষ এখনো খুঁজে ফেরে সেই পুরনো ছবিটা। ভাবি, হয়তো ভবিষ্যতের প্রজন্মেরাও একদিন এই প্রশ্ন শুনবে—‘তুমি সত্যিই আমেরিকান?’ আর হেসে বলবে, ‘আমেরিকার মুখ এখন পৃথিবীর মতো—সব রঙের এক জটিল সৌন্দর্য।’

ডোরা পেরা হোটেলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত হয়ে গেছে। তাকসিম এলাকার আলো-ঝলমলে ভিড়ের ভেতর লবিতে ঢুকতেই এক উষ্ণ অভ্যর্থনা। তরুণ বেলবয় সিসিল, চটপটে আর হাসিখুশি, মুহূর্তের মধ্যেই ব্যাগগুলো রুমে পৌঁছে দিলো। ওর ভেতরে ছিল সেই সহজ সরল উদ্যম—যা পৃথিবীর যেকোনো তরুণের চোখে দেখা যায়। পরদিন থেকেই সে প্রতিদিন কোনো না কোনো সস্তা ইলেকট্রনিক জিনিস বিক্রির প্রস্তাব দিত—কখনো টর্চলাইট, কখনো চার্জার। আমি প্রতিবারই বিস্ময় প্রকাশ করে হাসতাম, জানতাম এই ছোট্ট বিনিময় আসলে মানুষেরই এক সূক্ষ্ম ভাষা। ওর মধ্যে ছিল জীবিকার প্রয়াস, কিন্তু ভঙ্গিতে এক রকম মমতা—যেন জীবনের প্রতিটি তরুণ একই আশায় ভর করে এগিয়ে চলে, দেশ ভেদে আলাদা কিছু নয়।

ইস্তাম্বুল শহরটা প্রত্যাশার চেয়ে অনেক গভীর। পূর্ব আর পশ্চিমের সংমিশ্রণ, আধুনিকতার ভেতরে ঐতিহ্যের নিঃশ্বাস। রাস্তায় মানুষের ভিড়, ক্যাফেগুলোর ঘ্রাণ, আর প্রতিটি মুখে একধরনের সজীবতা। খাবারের স্বাদ ছিল নিখুঁত—রঙ, মশলা আর মাংসের সমন্বয় যেন এক উৎসব। প্রথম দুদিন ছিল অপূর্ব, তৃতীয় দিন শরীর ঘোষণা দিল বিরতি। অতিরিক্ত ডোনার কাবাব আর আদানা কাবাবের প্রেমে পড়ে পেট নিজের বিপক্ষে অবস্থান নিল।

হায়া সোফিয়ার লাইনে দাঁড়িয়ে তখন অস্বস্তিটা চরমে। সামনে শত শত মানুষ, পেছনে নীরবতা। শরীরের ভেতর চলছিল এক ব্যক্তিগত সংগ্রাম—প্রকৃতির ডাক, কিন্তু জবাব দেওয়া যাবে না। অবশেষে নিঃশব্দে এক মুক্তি, তারপর এক অনুচ্চারিত অপরাধবোধ। পেছনের মহিলা হঠাৎ তাকালেন, আমি চোখ সরিয়ে দিলাম তার পেছনে দাঁড়ানো এক ওরিয়েন্টাল ভদ্রলোকের দিকে। আমরা দুজনই আবার তাকালাম অন্য এক জনের দিকে—যেন দোষের ভার কাউকে না কাউকে দিতে হবে। সেই অপরিচিত মানুষটি হয়তো আজও জানে না, একদিন ইস্তাম্বুলে সে নির্দোষ হয়েও দোষী হয়ে গিয়েছিল।

শহরের ভিড় সবখানে—হায়া সোফিয়া, টপকাপি মিউজিয়াম, ব্লু মসজিদ—সবখানে মানুষের স্রোত। তবুও ভেতরে এক শান্তি কাজ করে। আমি জানি, আমি পুরোপুরি ধার্মিক নই—এক অদ্ভুত মিশ্র মানুষ, অর্ধেক বিশ্বাসী, অর্ধেক সংশয়ী। তবু পৃথিবীর যেখানেই কোনো মসজিদ দেখি, ভেতরে একটা টান অনুভব করি। মনে হয়, এই দরজার ভেতর ঢুকলেই মনটা একটু হালকা হয়ে যায়, যেন ভেতরের অস্থিরতা কোথাও জমা দিয়ে এলাম। আমি মনে মনে ভাবি, এই পবিত্র স্থানগুলোতে এলেই জীবনের কিছু ভুল, কিছু অবহেলা হয়তো সাময়িকভাবে ক্ষমার আশ্রয় পায়।

ট্যাক্সি চালকরা এখানে যেন এক অনিশ্চয়তার রাজ্যে বাস করে। কেউ কোনো নির্দিষ্ট ভাড়া মানে না, যেন দাম নির্ধারণ হয় চালকের মেজাজ আর যাত্রীর মুখ দেখে। একবার এমন এক ড্রাইভারের মুখোমুখি হলাম, যিনি এমন ভাড়া বললেন যে, মনে হলো গাড়িটা কিনেই ফেলব। দরদাম করতে গিয়ে বুঝলাম, কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, কোনো সিস্টেম নেই। আমি শুধু হেসে বলেছিলাম, ‘তুমি কি আমাকে পুরো শহর ঘোরাতে চাও, না শুধু এক মোড় ঘুরে?’ সে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল, ‘Sir, traffic also expensive!’ তখন মনে হচ্ছিল, এই শহর যেন এক দার্শনিক নাটক—যেখানে যুক্তি সবসময় হার মানে বাস্তবতার কাছে।

গুগল ম্যাপে যে রেস্টুরেন্টটা খুঁজে পেলাম, সেখানে পৌঁছাতে গিয়ে তিনবার রাস্তা হারালাম। ভুলটা আমারই, তবুও গুগলকেই দোষ দিলাম। স্ত্রী শান্ত স্বরে বলল, ‘সব তোমার বুদ্ধির ফল।’ আমি হেসে উত্তর দিলাম, ‘ঠিকই তো, আমি তো তোমাকেই বিয়ে করেছিলাম।’ কথাটার ভেতরে লুকিয়ে ছিল মজা, ভালোবাসা আর ক্লান্তির এক মিশ্র সত্য।

শেষ বিকেলে বসফরাসের ধারে দাঁড়িয়ে শহরটাকে দেখছিলাম—সূর্য ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে, পানির ওপর আলো গলে পড়ছে নরম সোনালি রেখায়। বাতাসে এক ধরনের মিশ্র গন্ধ—সমুদ্র, চায়ের কাপ, আর বিদায়ের হালকা বিষণ্নতা। দূর থেকে আজান ভেসে এলো, যেন শহরটা নিজের কণ্ঠে বিদায় জানাচ্ছে। মনে হচ্ছিল, ইস্তাম্বুল আমার ভেতরেও কিছু রেখে যাচ্ছে—একটা মৃদু অচেনা টান, কিছু অসমাপ্ত অনুভূতি, কিছু অদৃশ্য শান্তি। চার দিন আগের অপরিচিত এই শহর এখন মনে হয় অনেকদিনের পরিচিত কেউ, যাকে ছেড়ে যাওয়া ঠিক সহজ নয়।

তবুও সময় থেমে থাকে না। আমি আবার পথের প্রস্তুতি নিচ্ছি—এই লেখাটা লিখছি ঠিক তখনই, যখন ব্যাগের একপাশে মরক্কোর টিকিট রাখা। এক শহর পেরিয়ে আরেক শহর, এক অভিজ্ঞতা মিশে যাচ্ছে অন্যের সঙ্গে। 

ভ্রমণ যেন এখন জীবনেরই আরেক নাম—চলার মাঝে দেখা, হারানো, আবার ফিরে পাওয়া। জানি, একদিন এই পথও শেষ হবে, তবুও যতদিন শ্বাস আছে, যাত্রা চলবে—এক শহর, এক মানুষ, এক গল্প করে করে।

আরআর


  বিষয়:   ইস্তাম্বুল  ভ্রমণ  পর্যটন  পর্যটক 


Loading...
Loading...
সাহিত্য- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: