দেশে বর্তমানে সাড়ে ৩৬ লাখ প্রতিবন্ধী মানুষ রয়েছে। সেখানে মাত্র সাড়ে ২৪ লাখ প্রতিবন্ধীকে ভাতা দেওয়া হচ্ছে। এদিকে, তাদের সেবার জন্য দেশের বিভিন্নস্থানে থাকা প্রতিবন্ধী সেবাকেন্দ্রগুলো নানা প্রকিবন্ধকতার কারণে খুবই খারাপ অবস্থায় আছে। নারী সেবাকর্মী না থাকায় ফিজিওথেরাপী নিতে হচ্ছে পুরুষদের কাছ থেকে। ফলে সেবাবিমুখ হচ্ছেন নারী প্রতিবন্ধীরা।
বাংলাদেশ ডিজঅ্যাবেলড ডেভেলপমেন্ট ট্রাস্ট- বিডিডিটি কতৃক জেলা পর্যায়ের প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রগুলোর সেবার মানোন্নয়নের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এসব চিত্র উঠে অসে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে ফ্রি প্রেস আনলিমিটেড এবং আর্টিকেল-১৯ এই প্রকল্পটি বাংলাদেশে বাস্তবায়ন করছে, যার গবেষণা অংশ পরিচালনা করে বিডিডিটি।
শনিবার (১৫ নভেম্বর) রাজধানীর মিরপুর-১৪-এর জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের মিলনায়তনে এই প্রতিবেদন উন্মোচন করা হয়। এসময় সরকারি দপ্তর, উন্নয়ন সংস্থা, সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে প্রকল্পের চূড়ান্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন বিডিডিটির কনসালটেন্ট অ্যাডভোকেট রেজাউল করিম সিদ্দিকী।
তিনি জানান, আট বিভাগে ৩২ জেলার সেবা কেন্দ্রগুলোতে তথ্য সংগ্রহের ভিত্তিতে দেখা গেছে, অধিকাংশ কেন্দ্রে প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ৪০ জন সেবা নিতে আসেন। এর মধ্যে ৬৪.৫২% আসেন সহায়ক যন্ত্র পাওয়ার জন্য এবং ৫৮.০৬% আসেন বিভিন্ন থেরাপি সেবা নিতে; যার মধ্যে ফিজিওথেরাপি সেবা বেশি চাহিদাসম্পন্ন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী স্টাফসংকট প্রতিবন্ধী সেবা কেন্দ্রগুলোর সব থেকে বড় সমস্যা। পাশাপাশি দক্ষ জনবল, সরঞ্জাম, সহায়ক ডিভাইস ও থেরাপি সুবিধায় ঘাটতি প্রকট। এছাড়া নারীদের সেবাগ্রহীতাদের জন্য উপযোগী অবকাঠামো, যেমন নিরাপদ ওয়াশরুম, বিশ্রামকক্ষ ইত্যাদির অভাব রয়েছে। বিডিডিটির গবেষণা তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবন্ধী সেবা কেন্দ্রগুলোর প্রাইভেসি, প্রবেশগম্যতা, সেবার মান, সময় ব্যবস্থাপনা সব ক্ষেত্রেই সেবা গ্রহীতাদের অসন্তুষ্টির চিত্র পাওয়া গেছে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, অনেক কেন্দ্রই প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক সেবা প্রত্যাশীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। বক্তাদের আলোচনায় সহায়ক ডিভাইস, থেরাপি সেবা, আধুনিক সরঞ্জাম, দক্ষ জনবল এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদারের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়। একই সঙ্গে হটলাইন সেবা, পরিচর্যাকারী প্রশিক্ষণ, মনোসামাজিক সহায়তা এবং শিশু-কেন্দ্রিক ইউনিট চালুর সুপারিশ উঠে আসে।
তারা বলেন, যথেষ্ট বাজেট বরাদ্দ না থাকায় সেবার মান কম; সেবা প্রদানকারী স্টাফ কম থাকায় নির্দিষ্ট সময়ে মানসম্মত সেবা দেওয়া কঠিন; সহায়ক ডিভাইস সংকট প্রকট; প্রতিবন্ধী সাহায্য কেন্দ্রের পরিবহন ভ্যান অপর্যাপ্ত।
বিডিডিটির এই প্রকল্পের ঢাকা টাইমসের কো-অর্ডিনেটর মোক্তার বলেন, প্রকল্পের মাধ্যমে আমাদের সাংবাদিকরা সরাসরি মাঠে গিয়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মতামত জেনেছেন। বিডিডিটির সঙ্গে তথ্য সহযোগিতার মাধ্যমে এই গবেষণা সরকারের কাছে গুরুত্বসহকারে পৌঁছাতে পেরেছে।
অনুষ্ঠানে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের সহকারী পরিচালক মফিজুল ইসলাম বলেন, আমাদের সক্ষমতার মধ্যেই সর্বোচ্চ সেবা দিয়ে যাচ্ছি। অনেক ক্ষেত্রে সেবা ভালো হচ্ছে, সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। জনবল বাড়ানোর জন্য আমরা সরকারের কাছে আবেদন করেছি।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের ডেপুটি ডিরেক্টর (নিবন্ধন) আইয়ুব খান বলেন, বিডিডিটি ও ঢাকা টাইমসের গবেষণা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বর্তমানে ২৪ লাখ ৫০ হাজার প্রতিবন্ধীকে ভাতা দেওয়া হচ্ছে। দেশে মোট ৩৬ লাখ ৫১ হাজার প্রতিবন্ধীর সবারই ভাতার আওতায় আসা উচিত।
প্রতিবেদনে যেসব সুপারিশ গুরুত্ব পেয়েছে তার মধ্যে রয়েছে উপজেলাগুলোতে নতুন সেবা কেন্দ্র স্থাপন, সহায়ক ডিভাইস সরবরাহ বৃদ্ধি, দক্ষ জনবল নিয়োগ, নারীবান্ধব ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য প্রবেশযোগ্য অবকাঠামো, থেরাপি ও মনোসামাজিক সহায়তা বিস্তৃত করা, কেন্দ্রগুলোর হটলাইন ও তথ্যসেবা জোরদার ও নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করা। অনুষ্ঠানের সঞ্চালনায় ছিলেন বিডিডিটির প্রোগ্রাম অফিসার সাবরিনা তাসনীম।
ইইউ অর্থায়নে ফ্রি প্রেস আনলিমিটেড ও আর্টিকেল-১৯ এর কারগরি সহায়তায় বিডিডিটি এবং ঢাকা টাইমস যৌথভাবে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পের অংশ হিসেবে ৮টি রাউন্ডটেবিল আলোচনা, ৮টি স্ট্র্যাটেজিক ডায়ালগ, ৮ বিভাগীয় শহরে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রত্যাশা ও অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করা হয়। বক্তারা প্রতিবদনটিকে সময়োপযোগী ও বাস্তবসম্মত হিসেবে উল্লেখ করেন।
এসকে/