‘চোখটা এতো পোড়ায় কেন/ ও পোড়া চোখ সমুদ্রে যাও/ সমুদ্র কি তোমার ছেলে/ আদর দিয়ে চোখে মাখাও।’ যাপিত জীবনে আমাদের কতকিছুর সম্মুখীন হতে হয়। চোখে-মুখে ক্লান্তি চলে আসে। তখন অনেকে আনমনে গেয়ে উঠি এই গান। চোখ পোড়ালে সমুদ্রে যেতে হয়; অভিভাবকের মতো এ কথা কে বলতে পারেন? সঞ্জীব চৌধুরী।
দুই শব্দের এই নামটি বিশেষণও বটে। এর আগে পরে আর কিছু লিখতে হয় না। কারণ, বাংলা গান, কবিতা, সুর ও সাংবাদিকতার আকাশে উজ্জ্বল নক্ষত্র সঞ্জীব চৌধুরী। বাংলা গানের কিংবদন্তি। এই মহাবিশ্বে কিছু মানুষের আগমন সুন্দর একটি পৃথিবী গড়ার আকাশচুম্বী স্বপ্ন নিয়ে। তারা ঘুণে ধরা সমাজব্যবস্থা বদলে দিতে নিজেদের শেষ বিন্দু দিয়ে নিরন্তর সংগ্রাম করে যান। নিঃস্বার্থভাবে মুক্তি ও মানবতার বার্তা ফেরি করেন রাজপথ থেকে টংঘরে, পথে-প্রান্তরে। অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হয়ে রুখে দাঁড়ান।
গানই তার হাতিয়ার। বাংলাদেশের জনপ্রিয় দলছুট ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা তিনি। যার জন্ম হয়েছে পৃথিবীর কল্যাণে নিজেকে উজাড় করে দেওয়ার জন্য। গানে, কবিতায়, সাংবাদিকতায় এবং সাংগঠনিকভাবেও দুহাত খুলে দিয়েছেন। সঞ্জীব চৌধুরী কালের সাক্ষী।
‘এই নষ্ট শহরে/ নাম না জানা যে কোনো মাস্তান’। ‘সকালে ঠিক খিস্তিখেউড় রাজা-উজির মেরে/ মাস্তানি সব সেরে/ বিকেল বেলা তোমার বাড়ির লাগোয়া পথ ধরে/ যাচ্ছে যখন ফিরে/ ভুলে না হয় দিয়েছিল শিস।’
রাজধানীর পথে-পথে তার পদচিহ্ন। অথচ দিনের সূর্য, রাতের আকাশ আর নগরের চলমান পথচারীরাও জানে—অর্থ-বিত্ত, নাম-খ্যাতি কিছুরই তাকে টলানোর ক্ষমতা ছিল না। বাংলার পথে পথে তিনি গান করতেন মানুষের জন্য, মানুষের বিবেক জাগ্রত করার জন্য। সব সময় মানুষের মাঝে বাঁচতে চেয়েছেন তিনি। সঞ্জীব চৌধুরীর এই গানের দৃশ্যকল্প মুহূর্তেই অনেককেই নিয়ে যায় এক নস্টালজিক সময়ে।
৯০–এর দশকের শুরুর দিকে বিটিভিতে যারা হুমায়ূন আহমেদের ‘কোথাও কেউ নেই’ ধারাবাহিক নাটকে বাকের ভাই চরিত্রটি দেখেছেন, তারা গানটির সঙ্গে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সম্বন্ধ স্থাপন করতে পারেন।
কবিতা থেকে গান অনেকে গেয়েছেন। কবিতা থেকে অনেক পঙক্তি নিয়ে গান করেছেন। কিন্তু সঞ্জীব চৌধুরীর মতো আর কেউ এত কবিকে একসঙ্গে জায়গা দেননি গানে। সমকালীন কবিতাকে ছুঁয়ে দেখেননি এতটা। সেই কারণে হয়তো আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে সঞ্জীব চৌধুরীর এসব গান।
কোটি গানের ভাণ্ডারে যেখানে একজীবনে কত মানুষের একটি গানও শ্রোতাদের হৃদয় নাড়া দেয় না, সেখানে সঞ্জীব চৌধুরীর স্বল্প আয়ুর জীবনে ‘আমি তোমাকেই বলে দেব’, ‘কিংবদন্তি’, ‘চল বুবাইজান’, ‘ইয়াসমিন’, ‘চাঁদের জন্য গান’, ‘কালা পাখি’, ‘সাদা ময়লা রঙিলা পালে’, ‘বাজি’, ‘নৌকাভ্রমণ’, ‘বায়োস্কোপ’, ‘সমুদ্রসন্তান’, ‘ভাঁজ খোলো’, ‘চোখ’, ‘কথা বলব না’, ‘বয়স হলো সাতাশ’, ‘অচিন বৃক্ষ’, ‘জোছনাবিহার’, ‘জোছনাদুয়ারি’, ‘কার ছবি নেই’, ‘সানগ্লাস’, ‘মনে পড়ে’, ‘আমার সন্তান’, ‘নষ্ট শহরে’, ‘হৃদয়ের দাবি রাখো’-সহ কত গান এখনো শ্রোতাদের সুরের সাগরে একাকার করে দেয়। সবাই বলে উঠে ‘এই তো, সঞ্জীব চৌধুরী তো আমার কথা-ই বলছেন।
তেমনি, মনের বলতে না পারা অনেক গভীর আক্ষেপ, প্রতিবাদ তিনি গানে গানে বলে গেছেন অনেক আগেই। যার জন্য মৃত্যুর এতগুলো বছর পরেও সঞ্জীব চৌধুরী এখনো প্রাসঙ্গিক। বাংলা গানের বিস্ময়কর প্রতিভা সঞ্জীব চৌধুরী জীবদ্দশায় যে অসংখ্য কালজয়ী গান উপহার দিয়েছেন, তা তরুণ প্রজন্মের কাছে এখনো অনুপ্রেরণার সিঁড়ি।
এছাড়া, সাংবাদিকতায় ফিচার লেখায়ও ভিন্ন মাত্রা যোগ করেন তিনি। তার অনুজদের অনেকেই এখন শীর্ষস্থানীয় পর্যায়ে কর্মরত। আড্ডাপ্রিয় এই মানুষটি নিজের কথা, সুর আর কণ্ঠের মায়াজালে সবাইকে মোহিত করে ২০০৭ সালের ১৯ নভেম্বর পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। তিনি ক্ষণজন্মা। শারীরিক সমাপ্তি ঘটে নগরের এক বোহেমিয়ান সুরের জাদুকরের।
দেড় যুগ হয়ে গেল বাংলা গানের অন্যতম মহাজন সঞ্জীব চৌধুরীবিহীন, তবু মনে হয়, আমাদের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে তিনি আমাদের মাঝেই আছেন। তিনি তার ভক্তদের কাছে বাংলার বব ডিলান কিংবা প্রিয় সঞ্জীবদা হিসেবে চিরকাল বেঁচে থাকবেন। যতদিন বাংলা গানের আকাশ থাকবে, ততদিন সঞ্জীব চৌধুরী থাকবে।
সময়রে আলো/জেডও/এনএ