সারাদেশের বিভিন্ন স্থানে গত শুক্রবার থেকে কয়েক দফায় ভূ-কম্প অনুভূত হয়েছে। এর কোনোটি মাঝারি আবার কোনোটি মৃদু। সবশেষ বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর) বিকেল ৪টা ১৫ মিনিটে আঘাত হানা ভূ-কম্পনের মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৩ দশমিক ৬। বরাবরের মতো এর উৎপত্তিস্থল নরসিংদী। ইউরোপিয়ান মেডিটেরিয়ান সিসমোলজিক্যাল সেন্টার (ইএমএসসি) এ তথ্য জানিয়েছে। সর্বশেষ ভূমিকম্পটির মাত্রা কম হলেও শঙ্কার বিষয় হচ্ছে এতো অল্প সময়ে বাংলাদেশে এতোবার ভূমিকম্প আঘাত হানার নেপথ্যে কী? একইসঙ্গে প্রশ্ন উঠছে ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল বারবার ঢাকার পাশ্ববর্তী জেলা নরসিংদীতে কেন? বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ ও বিভিন্ন গবেষণার ফলাফল গত শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে অনুভূত হওয়া ভূমিকম্পকে গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ বলা হচ্ছে। এর ২৪ ঘণ্টা পার না হতেই একই এলাকায় ফের ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ার পরই বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিক ৩ প্লেট ও ছয় ফল্ট নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে। এগুলোর কারণেই মূলত রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভূমিকম্প হচ্ছে।
এর আগে গতকাল বুধবার রাত ৩টা ৩০ মিনিট ৪৯ সেকেন্ডে সিলেটে মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত হয়। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৩ দশমিক ৪। এটি মৃদু ভূমিকম্প হওয়ায় অনেকেই ঘটনাটি টের পাননি। সিলেট আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ শাহ মো. সজিব হোসাইন জানান, দিবাগত রাত ৩টা ৩০ মিনিট ৪৯ সেকেন্ডে ৩ দশমিক ৪ মাত্রার এ কম্পন অনুভূত হয়। ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ভারতের মনিপুরে। এই ভূমিকম্পটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে তেমন অনুভূত হয়নি। এ ধরনের ভূমিকম্প প্রায় হয়ে থাকে, যা প্রজ্ঞাপন করা হয় না।
এর আগে গতকাল বুধবার গভীর রাতে বঙ্গোপসাগরে ৪ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে। রাত ৩টা ২৯ মিনিটে বঙ্গোপসাগর এলাকায় আঘাত হানা এ ভূমিকম্পের প্রভাবে কেঁপে উঠে দেশের দক্ষিণপূর্বাঞ্চলীয় জেলা কক্সবাজারের টেকনাফ।
গত শুক্রবার (২১ নভেম্বর) দেশে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে। ওইদিন সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটের দিকে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এ ভূ-কম্পন অনুভূত হয়। এর কেন্দ্রস্থল ছিল নরসিংদীর মাধবদী। শুক্রবারের মাঝারি মানের ওই ভূমিকম্পে এ পর্যন্ত সারাদেশে ১০ জনের প্রাণহানির তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়াও, ভূমিকম্পের সময় ভবন থেকে মাথায় ইট খসে পড়ে ও আতংকে ভবন থেকে লাফিয়ে সারাদেশে অন্তত ৪ শতাধিক মানুষ আহত হন।
এর পরদিন শনিবার (২২ নভেম্বর) সকাল ১০টা ৩৬ মিনিটেও দেশে ভূমিকম্প অনুভূত হয়। মৃদু ওই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থলও ছিল নরসিংদীর পলাশে। রিখটার স্কেলে যার মাত্রা ছিল ৩ দশমিক ৩। পরবর্তীতে একই দিন সন্ধ্যায় আবারও দেশে ভূমিকম্প অনুভূত হয়।
ওইদিন সন্ধ্যায় এক সেকেন্ডের ব্যবধানে দুই বার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এর মধ্যে প্রথম ভূ-কম্পনটি অনুভূত হয় সন্ধ্যা ৬টা ৬ মিনিট ৪ সেকেন্ডে। মাত্রা ছিল ৩ দশমিক ৭। এরপর ফের সন্ধ্যা ৬টা ৬ মিনিট ৫ সেকেন্ডে দ্বিতীয় ভূ-কম্পনটি অনুভূত হয়। রিখটার স্কেলে যার মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৩।
এর মধ্যে প্রথম ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ঢাকার বাড্ডা, আর দ্বিতীয়টির উৎপত্তিস্থল নরসিংদীতে বলে জানায় আবহাওয়া অধিদফতর।
বাংলাদেশে অল্প সময়ের মধ্যে চার ভূমিকম্প কী ইঙ্গিত দিচ্ছে
বাংলাদেশের নরসিংদী জেলায় উৎপত্তি হওয়া ভূমিকম্পে তীব্র ঝাঁকুনিতে ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকা বারবার কেঁপে ওঠার কারণ এবং অল্প সময়ের মধ্যে একের পর এক এ ধরনের ভূমিকম্প কী ইঙ্গিত দিচ্ছে তা নিয়েও নানামুখী বিশ্লেষণ হচ্ছে। এ নিয়ে জনমনেও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা।
ভূতত্ত্ববিদ ও ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা অবশ্য ভূমিকম্প নিয়ে উৎকণ্ঠিত না হয়ে সচেতন হবার পরামর্শ দিচ্ছেন। যদিও এই সিরিজ ভূমিকম্প থেকে কী ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে তা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে তাদের কাছ থেকে।
কেউ কেউ বলছেন, যেই উৎস থেকে এবার মাধবদী ভূমিকম্প হয়েছে সেখানে বড় মাত্রার ভূ-কম্পন তৈরির মতো শক্তি জমা হয়ে আছে এবং সেটি বের হয়ে আসবেই। তারা মনে করেন, একের পর এক ভূমিকম্প সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে।
আবার অন্যরা বলছেন, মাধবদী ও পরের ভূ-কম্পনগুলোর বৈশিষ্ট্য পর্যালোচনা করে ভূকম্পনগুলোর মাত্রা ক্রমশ কমে আসায় তারা মনে করেন, আপাতত একই উৎস থেকে বড় মাত্রার ভূমিকম্পের সম্ভাবনা ক্ষীণ।
অন্যদিকে, ভূগর্ভে ইন্ডিয়ান প্লেট ও বার্মিজ প্লেটের অবস্থান পরিবর্তন জনিত কারণেই যে নরসিংদীর ভূমিকম্প হয়েছে বলে অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, তাতেও কোন কোনো ভূতত্ত্ববিদ ভিন্নমত পোষণ করছেন।
বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিক প্লেট ও ফল্ট
আবহাওয়া অধিদফতরসহ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ও আশপাশে কয়েকটি ভূতাত্ত্বিক প্লেট ও ফল্ট রয়েছে। আসুন এগুলোর বিষয়ে বিস্তারিত জেনেই নিই-
সংশ্লিষ্ট টেকটোনিক প্লেট
বাংলাদেশ মূলত তিনটি বড় প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত-
ইন্ডিয়ান প্লেট : বাংলাদেশের বৃহৎ অংশ এই প্লেটের পূর্ব-উত্তর অংশে। উত্তরে ইউরেশিয়ান প্লেট এবং পূর্বে বার্মা প্লেটের সাথে সংঘর্ষ ঘটায়।
ইউরেশিয়ান প্লেট : হিমালয় অঞ্চলের ওপরে, বাংলাদেশের উত্তরে। ইন্ডিয়ান প্লেটের সাথে সংঘর্ষে হিমালয় ও উত্তরাঞ্চলের ভূ-কম্পের উৎস সৃষ্টি করে।
বার্মা প্লেট : বাংলাদেশের পূর্বদিকে মিয়ানমার অঞ্চলে এর অবস্থান। এখানেই সবচেয়ে বিপজ্জনক ইন্দো-বার্মা মেগাথ্রাস্ট রয়েছে।
বাংলাদেশের প্রধান সক্রিয় ফল্টসমূহ
দেশের ভেতরে ও সীমান্ত বরাবর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফল্টগুলো হলো-
১. ডাউকি ফল্ট : এর অবস্থান সিলেটে মেঘালয়ের পাদদেশ। এর প্রকৃতি হল বড় থ্রাস্ট ফল্ট। বড় ঝুঁকি হল রিখটার স্কেলে ৭–৮ পর্যন্ত বড় ভূমিকম্পের সম্ভাবনা। এর প্রভাবিত জেলাগুলো হল সিলেট, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা ও মৌলভীবাজার।
২. মধুপুর বা মধবপুর ফল্ট : এটির অবস্থান টাঙ্গাইল–ময়মনসিংহ–গাজীপুর অঞ্চলের পশ্চিমে। এর ঝুঁকি হল এম ৬.৫–৭ মাত্রার ভূমিকম্প ঢাকায় শক্তভাবে অনুভূত হবে। প্রভাবিত জেলাগুলো হল টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, শেরপুর, গাজীপুর, কিশোরগঞ্জ ও ঢাকা।
৩. চট্টগ্রাম ফোল্ড বেল্ট ফল্টসমূহ : অবস্থান পার্বত্য চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রাম অঞ্চল। এর ধরন হলো বহু সক্রিয় ফল্ট—ক্রাস্টাল কম্প্রেশন। আর প্রভাবিত জেলাগুলো হল চট্টগ্রাম, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও কক্সবাজার।
৪. ইন্দো-বার্মা মেগাথ্রাস্ট : বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের পূর্বে এটির অবস্থান। ধরন হল বড় সাবডাকশন ফল্ট—এশিয়ার সবচেয়ে বিপজ্জনকগুলোর একটি। এর ঝুঁকি হল এম ৮.৫ এর বেশি হওয়া সম্ভাবনা। প্রভাবিত জেলা হল কক্সবাজার, বান্দরবান, চট্টগ্রাম, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া।
৫. শিলং প্লাটো সীমান্ত ফল্ট: এটির অবস্থান ভারতের শিলং–মেঘালয়ের উচ্চভূমি। ঝুঁকি হল ১৮৯৭ সালের মতো বড় ভূমিকম্প পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনা। প্রভাবিত জেলা হল সিলেট, নেত্রকোণা, সুনামগঞ্জ ও ময়মনসিংহ।
৬. তিস্তা লাইনামেন্ট, প্লায়া-গঙ্গা লাইনামেন্ট : এটির অবস্থান উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে, ঝুঁকিও তুলনামূলক কম। প্রভাবিত জেলা হলো রংপুর, দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁও।
সময়ের আলো/এনএ