বাংলাদেশ তো বটেই পুরো পৃথিবী জুড়েই সাম্প্রতিক সময়ে এক আতঙ্কের নাম ভূমিকম্প। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সপ্তাহ জুড়ে দফায় দফায় ভূমিকম্পে কেঁপেছে বহু অঞ্চল। বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে গত শুক্রবার থেকে কয়েক দফায় ভূ-কম্প অনুভূত হয়েছে। এর কোনোটি মাঝারি আবার কোনোটি মৃদু। সবশেষ গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টা ১৫ মিনিট ২০ সেকেন্ডে আঘাত হানা ভূ-কম্পনের মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৩ দশমিক ৬। এটি স্বল্পমাত্রার ভূমিকম্প এবং এর উৎপত্তিস্থল নরসিংদীর ঘোড়াশালে।
এর আগে গত শুক্রবার ২১ নভেম্বর সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার যে ভূমিকম্প হয়েছে, বিশেষজ্ঞদের মতে, এটা স্মরণকালের মধ্যে দেশে সবচেয়ে ভয়াবহ ভূমিকম্প। ভূপৃষ্ঠে এতো তীব্রতা ঢাকাবাসী আগে অনুভব করেনি। স্বাভাবিকভাবেই ঢাকাবাসী এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। তবে এ সময় আতঙ্কিত হওয়ার চেয়ে জরুরি সতর্ক থাকা। ভূমিকম্পের সময় সুরক্ষিত থাকতে সচেতন হওয়া জরুরি। জানতে হবে, ভূমিকম্পের সময় কী করতে হবে, ভূমিকম্পের পরে কী করতে হবে। আগাম প্রস্তুতিই–বা কী। এসব জানা থাকলে হয়তো কিছুটা পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব।
ভূমিকম্প কেন হয়? পৃথিবীর ভেতরের টেকটোনিক প্লেটগুলোর নড়াচড়ার ফল ভূমিকম্প। তবে ভূমিকম্প মানেই আতঙ্ক নয়। সব ভূমিকম্পই ভয়াবহ নয়। বরং, বেশির ভাগ ভূ-কম্পন এতো ছোট হয় যে, মানুষ টেরই পায় না। তাই ভূমিকম্প কতো ঘন ঘন হয় এবং কোন মাত্রার ভূমিকম্পে ভয় পাওয়ার দরকার নেই, তা বোঝার জন্য রিখটার স্কেল খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি ধারণা।
জানেন কী, কীভাবে এই ভূমিকম্প পরিমাপ করা হয়? কবে থেকেই বা এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে? ১৯৩৫ সালে চার্লস রিখটার ভূমিকম্পের শক্তি মাপার এই স্কেল তৈরি করেন। এরপর দীর্ঘ গবেষণা ও রেকর্ডের ভিত্তিতে দেখা যায়, পৃথিবীতে ছোট-বড় মিলিয়ে অসংখ্য ভূমিকম্প প্রতিদিনই ঘটে! জানলে অবাক হবেন, এর মধ্যে মাত্র কয়েকটি বড় ভূমিকম্প মানুষের নজরে আসে। বাকিগুলো নীরবে পৃথিবীর ভেতরে ঘটে যায়! একবার ভাবুন তো, সব ভূমিকম্প যদি মানুষ টের পেতো তাহলে অতঙ্কের মাত্রা কোন পর্যায়ে যেতে পারে।
গবেষকদের মতে, রিখটার স্কেল অনুযায়ী ৮ মাত্রা বা তার বেশি শক্তিশালী ভূমিকম্পকে বলা হয় ‘গ্রেট আর্থকোয়েক’। সারা পৃথিবীতে এমন ভূমিকম্প বছরে গড়ে মাত্র ১টি ঘটে। ৭ মাত্রার ভূমিকম্পও খুব কম ঘটে। এ মাত্রার ভূমিকম্প হয় বছরে মাত্র ১৮টির মতো। তার একটু নিচে ৬ মাত্রার ভূমিকম্প দেখা যায় বছরে প্রায় ১২০ বার এবং ৫ মাত্রার ভূমিকম্প ঘটে প্রায় ৮০০ বার! এই ভূমিকম্পগুলোই সাধারণত খবরে আসে। জেনে নিশ্চয়ই অবাক হচ্ছেন। কিন্তুই এটিই সত্যিই। ৫ মাত্রার নিচের ভূমিকম্প মানুষ খুব বেশি টের পায় না। কিছু মানুষ টের পেলেও এগুলোতে বাস্তব ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা কম থাকে। ফলে বলা যায় নীরবেই এসব ভূমিকম্প আঘাত হানে এবং তেমন কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয় না।
তবে ৪ মাত্রার নিচের ভূমিকম্পও এখন খবর। কারণ, মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হচ্ছে। ৪ মাত্রার নিচে যে ভূমিকম্প হয়, তার সংখ্যা অনেক বেশি। ৪ থেকে ৪ দশমিক ৯ মাত্রার হালকা ভূমিকম্প বছরে প্রায় ৬ হাজার ২০০ বার ঘটে! আর ৩ থেকে ৩ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্প ঘটে বছরে ৪৯ হাজার বার! মানে দিনে শত শত বার! এগুলোর বেশির ভাগই এত ক্ষুদ্র হয় যে, সাধারণ মানুষ বুঝতেই পারে না। শুধু তাই নয়। এর চেয়ে আরও ছোট ভূমিকম্প, যেমন ২ কিংবা ১ মাত্রার ভূমিকম্প প্রতিদিন হাজার হাজার বার পৃথিবীর কোথাও না কোথাও ঘটে চলেছে।
এত সংখ্যক ছোট ভূমিকম্পের ভিড়ে একটা বিষয় নিশ্চিত। ৩ দশমিক ৯ মাত্রার নিচে ভূমিকম্প হলে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কারণ, এই মাত্রার ভূমিকম্প বছরে প্রায় ৪৯ হাজার বার ঘটে। সাধারণত ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট বা মানুষের কোনো ক্ষতি করে না। এই ছোট ভূমিকম্পগুলো পৃথিবীর অভ্যন্তরে চাপ কমানোর মতো স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া।
ভূতত্ত্ববিদ ও ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরাও অবশ্য ভূমিকম্প নিয়ে উৎকণ্ঠিত না হয়ে সচেতন হবার পরামর্শ দিচ্ছেন। যদিও এই সিরিজ ভূমিকম্প থেকে কী ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে তা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে তাদের কাছ থেকে। সুতরাং, এখন নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন ভূমিকম্পে কী করতে হবে, কতোটা সচেতন থাকতে হবে।
সময়ের আলো/এনএ