শীতের তীব্রতা বাড়ায় জনজীবনে স্থবিরতা

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয়

দেশে জেঁকে বসতে শুরু করেছে শীত। দেশের কোন কোন জেলায় তাপমাত্রা নেমে এসেছে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। হিমেল হাওয়া ও ঘন

2025-12-06T19:07:56+00:00
2025-12-06T19:07:56+00:00
 
  বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬,
১৭ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
শীতের তীব্রতা বাড়ায় জনজীবনে স্থবিরতা
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: শনিবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০২৫, ৭:০৭ পিএম 
শীতের তীব্রতা বাড়ায় জনজীবনে স্থবিরতা। ছবি : সংগৃহীত
দেশে জেঁকে বসতে শুরু করেছে শীত। দেশের কোন কোন জেলায় তাপমাত্রা নেমে এসেছে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। হিমেল হাওয়া ও ঘন কুয়াশায় জনজীবনে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোর ও রাতে তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় ভোগান্তি বেড়েছে নিম্ন আয়ের মানুষের। অনেকেই ভোরবেলা খড়কুটো জ্বালিয়ে উষ্ণতা নিচ্ছেন, শ্রমজীবী মানুষের কাছে এই আগুনই এখন ভরসা। দেশের বিভিন্ন শপিংমল থেকে শুরু করে ফুটপাত এবং ছোট বড় দোকানগুলোতে দিনরাত গরম কাপড় কেনার ভিড় বেড়েছে ক্রেতাদের। যদিও ভোর হতে ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা জনপদে বেলা বাড়ার সাথে সাথে ঝলমলে রোদের দেখাও মেলে।

শনিবার আবহাওয়ার পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে আরও কমতে পারে দিন ও রাতের তাপমাত্রা। সেই সঙ্গে কোথাও কোথাও শেষরাত থেকে ভোর পর্যন্ত হালকা কুয়াশা পড়তে পারে।

শনিবার সকাল ৯টায় দেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় মৌসুমের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১০ দশমিক ৫ ডিগ্রি রেকর্ড হয়েছে। একইসঙ্গে ঢাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১৭ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

আবহাওয়াবিদ হাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, উপমহাদেশীয় উচ্চচাপ বলয়ের বর্ধিতাংশ বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছে। পাশাপাশি মৌসুমের স্বাভাবিক লঘুচাপ দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে সক্রিয় রয়েছে। এই অবস্থার প্রভাবে দেশের আকাশ অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা থাকলেও সারাদেশের আবহাওয়া শুষ্ক থাকতে পারে।

তিনি জানান, শনিবার রাত থেকে ভোর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে হালকা কুয়াশা পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সময়ে সারা দেশে রাত ও দিনের তাপমাত্রা ১ থেকে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমতে পারে।

এ ছাড়া রোববার থেকে বুধবার (১০ ডিসেম্বর) পর্যন্ত আবহাওয়া প্রায় একই রকম থাকতে পারে। এ চারদিনও শেষরাত থেকে সকাল পর্যন্ত হালকা কুয়াশা থাকবে বলেও জানানো হয়েছে। তবে এ সময় তাপমাত্রায় তেমন কোনো পরিবর্তন হবে না। বর্ধিত পাঁচ দিনে আবহাওয়ার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনেরও সম্ভাবনা নেই।

এদিকে আবহাওয়া অধিদফতরের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে, চলতি ডিসেম্বর থেকে আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যেই দেশে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ আঘাত হানতে পারে। তাপমাত্রা নেমে যেতে পারে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত। এ সময়ে ৩ থেকে ৮টি মৃদু (৮-১০ ডিগ্রি), মাঝারি (৬-৮ ডিগ্রি) এবং ২ থেকে ৩টি তীব্র (৪-৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস) শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। পাশাপাশি কোথাও কোথাও শিলাবৃষ্টি ও বজ্রঝড়ও দেখা দিতে পারে।

শীতের এমন পূর্বাভাসে বিশেষ সতর্কতা দিয়েছেন আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা। তারা জানান, ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত উত্তরাঞ্চলে শীতের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি অনুভূত হতে পারে। বয়োজ্যেষ্ঠ, শিশু এবং অসুস্থ ব্যক্তিদের বিশেষভাবে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

পঞ্চগড় প্রতিনিধি জানান, হিমালয়ের কন্যা বলে খ্যাত এই জেলায় শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোর ও রাতে তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় ভোগান্তি বেড়েছে নিম্ন আয়ের মানুষের। অনেকেই ভোরবেলা খড়কুটো জ্বালিয়ে উষ্ণতা নিচ্ছেন, শ্রমজীবী মানুষের কাছে এই আগুনই এখন ভরসা। হিমেল হাওয়া ও ঘন কুয়াশায় ডিসেম্বরের শুরুতেই তাপমাত্রার পারদ ১০ ডিগ্রিতে নেমে আসায় জনজীবনে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।

শনিবার সকাল ৯টায় মৌসুমের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১০ দশমিক ৫ ডিগ্রি রেকর্ড হয়েছে বলে জানিয়েছেন তেঁতুলিয়া প্রথম শ্রেণির আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিতেন্দ্রনাথ রায়। এ সময় বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ ছিল ৯৫ শতাংশ।

বোদা উপজেলার ভাসাইনগর গ্রামের কৃষি শ্রমিক বাবুল বলেন, শীতের কারণে ভোরে কাজে বের হওয়া এখন খুবই কষ্টকর। ঠান্ডায় হাত-পা অবশ হয়ে আসে। কিন্তু কাজ না করলে খাব কী?

পঞ্চগড় সদর উপজেলার মোলানী পাড়া গ্রামের ফজলার রহমান বলেন, ফজরের আযানের সময় আমাদের ঘুম থেকে উঠতে হয়। তখন কনকনে ঠান্ডা থাকে। নামাজ পরে হাঁটতে বের হই।

আটোয়ারী উপজেলার সাতখামার গ্রামের ভ্যান চালক আশরাফুল বলেন, শীতের কারণে সকালে রাস্তায় লোকজন কম থাকে, তাই রোজগারও কমে গেছে।

পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. মনোয়ার হোসেন বলেন, প্রতি বছর শীতের শুরুর দিকে কাশি, সর্দি, শ্বাসকষ্ট নিয়ে চিকিৎসা সেবা নেন। বিশেষ করে শিশু ও বেশি বয়স্করা নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হন। এবারও একই অবস্থা দেখা যাচ্ছে। আমরা সচেতনতার পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দিচ্ছি।

তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিতেন্দ্রনাথ রায় বলেন, গত কয়েক দিন ধরে জেলার তাপমাত্রা ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঘরে ওঠানামা করছিল। শুক্রবার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই এমন পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে, ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে এক বা দুইটি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে বলে জানান এই আবহাওয়াবিদ।

চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি জানান, সীমান্তবর্তী জেলা চুয়াডাঙ্গায় গত কয়েকদিন ধরে তাপমাত্রা কমতে শুরু করেছে। হিমেল বাতাস, কুয়াশা আর হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় জনজীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ। বিশেষ করে দিনমজুর ও স্বল্প আয়ের শ্রমজীবী মানুষ পড়েছেন সবচেয়ে বেশি বিপাকে।

চুয়াডাঙ্গা প্রথম শ্রেণির আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগার সূত্রে জানা গেছে, শনিবার সকাল ৯টায় জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১১ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা চলতি মৌসুমে এটিই সর্বনিম্ন তাপমাত্রা। এ সময় বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ৮১ শতাংশ।

আবহাওয়া পর্যবেক্ষকদের মতে, কয়েক দিনের মধ্যেই জেলায় মৃদু থেকে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এদিকে, শীতের তীব্রতা বাড়লেও কাজ থেমে নেই দিনমজুর ও শ্রমিকদের। ভোর থেকেই ঠান্ডা বাতাস উপেক্ষা করে কাজের মাঠে ছুটছেন তারা। অপরদিকে, শীতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে শীতজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।

সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. বিদ্যুৎ কুমার বিশ্বাস বলেন, শীতজনিত কারণে ডায়রিয়া ও শিশু রোগীদের চাপ বেড়েছে। এরমধ্যে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট, জ্বর-ঠান্ডা ও ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যা বেশি। তবে তুলনামূলক বয়োবৃদ্ধ রোগীদের চাপ কম।

তিনি আরও বলেন, এছাড়া, প্রতিদিন শীতজনিত কারণে আউটডোরে ২০০-৩০০ শিশুসহ বয়োবৃদ্ধরা চিকিৎসা নিচ্ছেন।

চুয়াডাঙ্গা প্রথম শ্রেণির আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জামিনুর রহমান বলেন, তাপমাত্রা আরও কমতে থাকবে। শৈত্যপ্রবাহেরও সম্ভাবনা রয়েছে।
কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধি জানান, গত এক সপ্তাহ ধরে কুড়িগ্রামে পড়ছে ঘন কুয়াশা। সেই সঙ্গে বেড়েছে শীতের তীব্রতা। বেলা বাড়ার সাথে সঙ্গে তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। ফলে আবহাওয়ার পরিবর্তনে শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে বেশি শিশু-বৃদ্ধরা।

শনিবার সকাল ৬টায় জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ১২ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কুয়াশার সঙ্গে উত্তরের হিমেল হাওয়ায় সন্ধ্যার পর থেকে সকাল অবধি অনুভূত হচ্ছে ঠান্ডা।


শীতের তীব্রতা ও ঠান্ডার বাড়ায় জেলার বিভিন্ন শপিংমল ও ছোট বড় দোকানগুলোতে দিনরাত গরম কাপড় কেনার ভিড় বেড়েছে ক্রেতাদের। কুড়িগ্রাম পৌর শহরের সুপার মার্কেট, নছর উদ্দিন মার্কেটে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। তিন দিন ধরে শীতের তীব্রতা বাড়ায় শীত নিবারণের জন্য মানুষ ছুটছেন বিপণি বিতানগুলোতে। উচ্চবিত্ত মানুষজন শপিং মলে ছুটলেও নিম্ন বিত্তবান মানুষের ভরসা পুরোনো কাপড় বিক্রির দোকানগুলো।

গরম কাপড় কিনতে আসা যাত্রপুর ইউনিয়নের আমিনুল ইসলাম (৫০) বলেন, ঘন কুয়াশা ও ঠান্ডায় কাজ কাম করতে পারি নাই। হাতে টাকা নাই তাই ধার দেনা করে বাচ্চাদের জন্য কাপড় কিনতে এসেছি। গত বছরের তুলনায় এ বছর কাপড়ের দাম বেশি। ছোট বাচ্চার একটি সোয়েটার ৫০০ টাকা দিয়ে কিনলাম। অথচ আগে এই সোয়েটার ছিল ২০০- ৩০০ টাকা।

কুড়িগ্রাম রাজারহাট আবহাওয়া ও কৃষি পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র সরকার বলেন, দিন দিন তাপমাত্রা কমে শীতের তীব্রতা বাড়বে এ জেলায়। জেলায় গড়ে ১২ থেকে ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং ঘণ্টায় ১০ হতে ১৪ কিলোমিটার বাতাসের বেগ বিরাজ করছে।

সময়ের আলো/জেডআই


  বিষয়:   শীত  তাপমাত্রা  হিমেল হাওয়া  কুয়াশা 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: