‘এই তুমি ওকে তুলে নিয়ে যাচ্ছ কেন! আমি
কিন্তু খুব একা হয়ে যাব। এখানে ও-ই আমার একমাত্র বন্ধু। তুমি ওকে নিয়ে যেও
না প্লিজ! প্লিজ! রোদ-বৃষ্টি-ঝড়ে ও-ই আমার একমাত্র বন্ধু। দেখ, আকাশে
তাকিয়ে দেখ বিকালের আগেই বৃষ্টি নামবে, আমি কার সঙ্গে বৃষ্টিতে ভিজব? তুমি
ওকে নিও না প্লিজ! আমি কিন্তু একা থাকতে খুব ভয় পাই।’ ছোট্ট অশ্বত্থর চি চি
গলার চিৎকারে কর্ণপাত না করেই শিরিন ফেরদৌসী তার পাশের অন্য অশ্বত্থটিকে
তুলে নিয়ে চলে এলো। যতক্ষণ শিরিনকে দেখা গেছে ছোট্ট অশ্বত্থটি তার কষ্টের
কথা বলেই চলছে। কিন্তু তার চিৎকার বাতাসে মিলিয়ে যায়।
চুলায়
চায়ের জল টগবগ করছে। ফুটানো জলে পুদিনাপাতা দিয়ে আঁচ কমিয়ে দেয় শিরিন।
বাসায় কাজের সহযোগী বানু আজও বাড়ি থেকে ফেরেনি। ওর মা মৃত্যুশয্যায়। এই
মেয়েটার এতটুকু জীবনে কোনো শান্তি নেই। বাচ্চা পেটে থাকতে স্বামী মারা গেল।
না বাপের না স্বামীর কোনো বাড়িতে ঠাঁই হলো না। এত পরিশ্রমের টাকাও মেয়েটা
ভোগ করতে পারে না। বাড়ির খরচ মেটাতেই সব চলে যায়।
বানু না থাকায় শিরিন
নিজের হাতেই ঘরের সব কাজ করছে। সকালের চা খুব আরাম করে খাওয়ার অভ্যেস।
চায়ের মগ নিয়ে সামনের খোলা বারান্দায় বসে। চায়ে চুমুক আর সকালে ক্লাসিক্যাল
গান শোনা শিরিনের পুরোনো অভ্যাস। স্বামী পছন্দ না করলেও অনেক মেয়েদের মতো
শিরিন তার এ ভালোলাগাটাকে মেরে ফেলেনি। ‘তুমি নির্মল কর মঙ্গল কর মলিন মর্ম
মুছায়ে...’ এ সংগীত দিয়ে শিরিনের সকাল শুরু হয়। তিনি বিশ্বাস করেন মনের
পবিত্রতার জন্য এই একটি গানই যথেষ্ট।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রোদের তাপ
বাড়তে থাকে। মনে হচ্ছে সূর্য যেন ক্ষেপে উঠছে। দিন দিন মানুষের অমানুষ হয়ে
ওঠা আর নিতে পারছে না। যেন সে চাইছে, পৃথিবীকে আজ উত্তাপে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে
দেবে। তার গায়ে তীব্র দহন। সম্ভব হলে পৃথিবীর অনাসৃষ্টিকারী মানুষদের
পুড়িয়ে খাক করে দিত। কিন্তু ঈশ্বর মনে হয় তার সে ক্ষমতা খর্ব করে রেখেছে।
সূর্যের তাপ দহনের যন্ত্রণা থেকে উত্তাপের জল জলীয়বাষ্প হয়ে আকাশে মেঘ জমতে
থাকে। বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা আসার আগেই ঝুম বৃষ্টি নেমে এলো।
শিরিন ছাদে গিয়ে দেখে ছোট অশ্বত্থটি বৃষ্টিতে হাঁটু মুড়ে মাথা নিচু করে ভিজে চলছে। আলতো করে গায়ে হাত দিতেই চমকে ওঠে।
‘ও তুমি! আমাকে একা করে দিয়ে এখন আসছ আদিখ্যেতা দেখাতে!’ শিরিনের স্নেহ ওকে নত হতে শেখায়। রাগ কষ্ট জলের সঙ্গে ধুয়ে যায়।
দুটি
অশ্বত্থ একই বাড়ির দুই প্রান্তে বেড়ে ওঠে। শিরিন মনে মনে ওদের নতুন নামের
কথা ভাবলেও শেষ পর্যন্ত কোনো নাম ছাড়াই ওরা নিজ নামেই বেড়ে উঠতে থাকে। একজন
কংক্রিটের শক্ত গাঁথুনির কোল ঘেঁষে। অন্যজন আরামদায়ক যত্নে। দুজনেই তাদের
জিনতত্ত্বের কারণে বলিষ্ঠ। বাইরে অযত্নে পোড় খাওয়া অশ্বত্থটি যেন একটু
বেশিই বলিষ্ঠ। শরীরের কাঠামো বেশ পেটানো। দেখেই বোঝা যায় জীবনযুদ্ধে সে বেশ
শক্ত। তার খাবারের মূল উৎস পাশের বাসার ঝরনার মা যখন জল দিয়ে ছাদ পরিষ্কার
করে।
শিরিন সকালে তার পাশে এসে দাঁড়িয়ে আলতো করে গায়ে হাত দিয়ে আদর
করে বলে, ‘তোমরা দুজন দুই প্রান্তে বেড়ে উঠছ। আমি চাই দুজনেই বড় হও।’
শিরিনের মমতায় ও শুধু মাথা নিচু করে থাকে।
দেখতে দেখতে পাশের বাসার
ঝরনা আজ কিশোরী। আমার সঙ্গে শিরিন ফেরদৌসীর ভালোবাসা দূর থেকে ওরা বেশ
উপভোগ করে। বিশেষ করে শিরিন যখন আমার গায়ে হাত বুলিয়ে দেয় ছোট্ট বন্যা
বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে। ইদানীং ঝরনার চঞ্চলতা আমি বেশ উপভোগ করি। আজকাল তাকে
ছেলে আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে বেশ মাখামাখি করতে চোখে পড়ে। মায়ের অগোচরে সেদিন
সন্ধ্যায় তার ফুপাত ভাই রনি ঝরনার হাত ধরে হ্যাঁচকা টানে কাছে টেনে নেয়।
ওমা, বলে চাপা স্বরে চেঁচিয়ে ঝরনা রনির বাহুডোর থেকে ছিটকে বেরিয়ে যায়।
কিন্তু সে যে রাগ করেছে তা কিন্তু নয়। তার চোখে-মুখে রক্তিম আভা। এই উষ্ণ
আলিঙ্গন যে খারাপ লাগেনি তার চোখ বলে দিচ্ছে। কিন্তু মেয়ে বলে কথা! তার তো
হাজারটা বাধা। এই ভয়টা আসলে সমাজের পুরুষতান্ত্রিকতার ভয়। ছোট্ট কিশোরীও
জানে কেউ দেখে ফেললে রনির চেয়ে তাকেই গালমন্দ বেশি শুনতে হবে। অথচ রনি কী
নির্বিকার। এই যে একটু হাত ধরা, অকারণ হাসাহাসি এতেই যেন কোথায় একটা শিহরণ।
দুজনের মধ্যে দোলা দিয়ে গেল।
আমি যে এতকিছু দেখি মানুষ ভাবতেই পারে
না। আমার মনে হয় পৃথিবীর সব গাছ যদি কথা বলতে পারত মানুষ তার সততার
অস্তিত্ব সংকটে পড়ে যেত। মানুষ তার বুদ্ধির নিরানব্বই ভাগ অসৎ কাজে ব্যবহার
করে।
এক গভীর রাতে দুজন নারী-পুরুষের চাপা কণ্ঠের কথোপকথনে আমার
ঘুম ভেঙে যায়। আমার পাশের লাগোয়া বিল্ডিং সেটি আমার থেকে উঁচু। দশ তলার
বারান্দায় এরা বাড়ির মালিক না ভাড়াটে জানি না। তারা প্রায়শই গভীর রাতে
এখানে এসে দাঁড়ায়। দুজনেই মধ্যবয়সি। প্রথম প্রথম দুজনে শুধু কথা বলায়
সীমাবদ্ধ ছিল। আজকে দেখি দুজনে বেশ ঘনিষ্ঠভাবে দাঁড়ায়। দুজনের চোখে চোখ।
মেয়েটি প্রথমে লোকটির হাত টেনে নিজের ঠোঁটে ছোঁয়ায়। লোকটি কিছুক্ষণ
মহিলার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। ধীরে একটি হাত মহিলার কোমর জড়িয়ে মুহূর্তেই
লোকটি মেয়েটির ঠোঁটে ঠোঁট রাখে। মনে হলো লোকটি এতদিন এ অপেক্ষায় ছিল।
আধো আলোতে আমি স্পষ্ট দেখছি একসময় ভদ্রলোকের হাত মেয়েটির বুকে কিছু খুঁজতে
থাকে। মেয়েটি ঝরনার মতো লোকটাকে সরিয়ে দেয় না। আমি চোখ সরিয়ে নিই। ভাবী,
একেই বলে বয়সের সাহস!
শিরিন ভদ্রমহিলা কখনো কিছু বলে না। শুধু আমার
মন খারাপ হলে এসে আমার গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করে। আমিও তার আদরমাখা হাত খুব
উপভোগ করি। কিন্তু সেদিন যখন আমার পাশ থেকে বন্ধুকে নিয়ে যায় আমার তার ওপর
খুব রাগ হয়েছিল। মনে হয়েছিল তার চুলগুলো টেনে ছিঁড়ে তাকে আমার কষ্ট বুঝিয়ে
দিই।
দেখতে দেখতে প্রায় বর্ষা মৌসুম এসে গেল। ছাদে এক খিটখিটে
মেয়েটির আনাগোনা। বুঝতে পারছি তিনি এই বাড়ির মালিকের বড় মেয়ে। তার শখ হয়েছে
ছাদে বাগান করবে। আমি খুব স্পষ্ট বুঝতে পারছি আমার মৃত্যু সন্নিকটে। আমার
ভেতর অস্থিরতা ও ভয় বাড়তে থাকে। শিরিন অনেক দিন এদিকে আসছে না। এই মেয়েটির
আচরণে ঝরনার মাও বেশ সিটিয়ে থাকে।
কালাম ছাদ পরিষ্কার করতে এসে বেশ খানিকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে আপন মনে বলে ওঠে, আহারে কী সুন্দর! এই গাছটা কাডি হালাইমু?
ছাদ
পরিষ্কারের নামে বাড়ির মালিকের মেয়ে আমাকে টেনেহিঁচড়ে উপড়ে ফেলতে চাইছে।
আমি চিৎকার দিলাম কিন্তু তার জঘন্য হাত আমাকে এমন নিষ্ঠুরভাবে টানতে লাগল,
আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল। ও খুব নিষ্ঠুরভাবে কালামকে বলে দা-টা নিয়ে আসেন। এই
বাজে গাছটা তুলতে পারছি না, কাটতে হবে।
আমার শিরিনকে খুব মনে পড়ছে।
আমাকে তুলতে কালামেরও বেশ বেগ পেতে হয়েছে। টেনে তুলে আমাকে ময়লার স্তূপের
কাছে রেখে দিল। আমি সারা দিন খাবার ছাড়া নেতিয়ে পড়ে আছি। ভয়ে আছি এই
বালি-ময়লার সঙ্গে আমাকেও তো রাস্তায় ফেলে দেবে। সন্ধ্যার পর চুপিচুপি ঝরনার
ছোট বোন বন্যা আমাকে তুলে ওদের বারান্দায় পানি খেতে দেয়। আমার খুব আরাম
লাগছিল। আমি মনে মনে ওকে আশীর্বাদ করলাম। রাতে বন্যা আমাকে হাতে নিয়ে
শিরিনের দরজায় টোকা দেয়।
‘তুমি?’
বন্যা আমাকে শিরিনের দিকে
এগিয়ে ধরে। শিরিনের ঘটনা বুঝতে দেরি হয় না। তবু প্রশ্ন করে কে ছিঁড়ল ওকে?
বন্যা কিছু না বলে আমাকে শিরিনের হাতে দিয়ে চলে যায়। শিরিনের নরম হাতে
স্নেহের পরশ।
সকালে বারান্দায় পা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার বন্ধুর
দেখা। ওতো আমাকে দেখে কাঁদছে। কত প্রশ্ন! কিন্তু আমার তো তেমন কথা বলার
শক্তি নেই।
শিরিনের যত্নে আমার প্রাণশক্তি ফিরে আসে। আমরা দুজন আজ তরুণ।
এই ছোট পরিসরে আমাদের রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। শিরিনের স্বামী তাকে পরামর্শ
দেয় আমাদের হাত-পা কেটে ছোট আকৃতি করার। শিরিন জানিয়ে দেয়, আমি মোটেই বনসাই
পছন্দ করি না। এটি তাদের ওপর নির্যাতন। তারা আমাদের প্রাণশক্তি। তুমি
চিন্তা করো না। সময়মতো ওদের আমি বড় পরিসরে নিয়ে যাব।
এই প্রথম আমরা
দুই বন্ধু গাড়িতে করে বাইরে বেরিয়েছি। আমি তবু খোলা আকাশের নিচে অনেক দিন
ছিলাম কিন্তু বন্ধুটি তো বদ্ধঘরে বেড়ে উঠেছে। এখন এমন পরিবেশে সে বেশি
উৎফুল্ল। খুশিতে হাত-পা ছোড়াছুড়ি করছে। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা চলার পর গাড়ি একটা
গ্রামের বাড়ির সদর রাস্তায় দাঁড়ায়। বাড়ির ভেতর থেকে ছোট-বড় অনেকেই ছুটে
আসে। শিশুরা বেশি আনন্দিত। ওদের মধ্যে একটা উৎসব ভাব। শিরিন তার শিক্ষককে
নিয়ে আমাদের দুই বন্ধুকে খুব যত্ন করে মাটিতে বসিয়ে দেয়। এমন মুক্ত পরিবেশে
মাটির মধ্যে এই প্রথম আমরা বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখছি। আজ আমরা দুই বন্ধু
অশ্বত্থ গাছ শিরিনের গ্রামের বাড়ির সদর রাস্তায় দাঁড়িয়ে গ্রামের মানুষের
বিশুদ্ধ বাতাস ছড়িয়ে দিচ্ছি। পথিক যখন আমাদের ছায়ায় দুই দণ্ড বসে তখন
শিরিনের কথা খুব মনে পড়ে।
সময়ের আলো/এসকে/