ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে গুলির ঘটনায় প্রধান দুই সন্দেহভাজন ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ফয়সাল করিম মাসুদ ও আলমগীর হোসেন ওরফে আলমগীর শেখকে চিহ্নিত করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে তিন দিন কেটে গেলেও তাদের গ্রেফতার করা যায়নি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ধারণা করছে, অভিযুক্ত ফয়সাল করিম ও আলমগীর শেখ ঘটনার ১২ ঘণ্টার মধ্যে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে গেছেন।
তাদের সম্ভাব্য অবস্থান শনাক্ত করে শনিবার রাতেই ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট, ধোবাউড়া ও শেরপুরের নালিতাবাড়ী সীমান্তবর্তী এলাকায় অভিযান চালায় পুলিশ। সেখান থেকে মানব পাচারে জড়িত থাকার অভিযোগে দুজনকে আটক করে ঢাকায় আনা হয়েছে। তারা হলেন সঞ্জয় চিসিম ও সিবিরন দিও।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদে সঞ্জয় চিসিম জানান, শুক্রবার দিবাগত রাত দেড়টা থেকে দুইটার মধ্যে দুজন বাংলাদেশি নাগরিককে ভারতে পাচারে সহযোগিতা করেছেন তারা। ওই দুজন ফয়সাল ও আলমগীর বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ধারণা করছে।
আটক দুই ব্যক্তি সম্পর্কে রোববার এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার এস এন নজরুল ইসলাম বলেন, অবৈধভাবে লোক পারাপারের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে আটক দুই ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করে শরিফ ওসমান হাদির ওপর হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, হাদিকে গুলি করেন ফয়সাল। আর ঘটনার সময় ফয়সালকে বহনকারী মোটরসাইকেলটি চালাচ্ছিল আলমগীর।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, হাদিকে গুলি করা ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ খান শুক্রবার রাত ২টার দিকে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট-ধোবাউড়া সীমান্ত দিয়ে ভারতের মেঘালয়ে পালিয়ে যায় বলে তারা তথ্য পেয়েছেন। তার সঙ্গে আলমগীর হোসেন শেখও পালিয়েছে।
ওই কর্মকর্তা জানান, গুলির ঘটনার আগের দিন বৃহস্পতিবার নরসিংদীতে ছিল ফয়সাল ও আলমগীর। শুক্রবার সকালে তারা উবার থেকে সারাদিনের জন্য ভাড়া করা প্রাইভেটকারে ঢাকায় আসে। দুপুর ১টার দিকে ফয়সাল ও আলমগীর মোটরসাইকেল নিয়ে পল্টন এলাকার দিকে যায়। সেখানে জুমার নামাজ আদায়ের পর হাদি জনসংযোগ করছিলেন। ফয়সাল ও আলমগীর তখন হাদির সঙ্গে ভিড়ে মিশে যায়; লিফলেটও বিতরণ করে।
সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী, হাদি রিকশায় রওনা হওয়ার পর আলমগীর মোটরসাইকেলে পিছু নেয়। তার পেছনে বসে শুটার ফয়সাল। হাদিকে বহন করা রিকশাটি শুক্রবার দুপুর সোয়া ২টার দিকে বিজয়নগর বক্স কালভার্ট রোডে পৌঁছালে চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে হাদির ডান কানের নিচে গুলি করে ফয়সাল।
সূত্র বলছে, গুলির পর ফয়সালকে বহন করা মোটরসাইকেল পল্টন মোড় হয়ে হাইকোর্ট মৎস্য ভবন এলাকা পেরিয়ে তেজগাঁও আসে। সেখান থেকে উবারের ভাড়া করা গাড়িতে সাভার এলাকায় যায়। এরই মধ্যে সেই গাড়ির চালকের সন্ধান পেয়েছে পুলিশ। রাতে তারা আরেকটি গাড়িতে করে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট যায়। সেখানে দুই দালাল শুক্রবার রাত দেড়টা থেকে ২টার মধ্যে সীমান্ত পার করে দেয়।
সঞ্জম চিসিম এবং সিবিয়ন দিওকে এরই মধ্যে হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ। তাদের সঙ্গে যুক্ত আরেকজন পলাতক রয়েছেন।
অপর একটি সূত্র বলছে, দুজনকে ভারতে পালাতে সহায়তার কথা স্বীকার করেছে সঞ্জয় ও সিবিয়ন। তবে তাদের দাবি, ফয়সাল ও আলমগীরের পরিচয় জানতেন না।
অন্যদিকে হাদিকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি করার ঘটনার সঙ্গে জড়িত শ্যুটার সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ খান ও তার সহযোগী বাইকচালক আলমগীর হোসেন বর্তমানে আসামের গুয়াহাটিতে অবস্থান করছেন বলে দাবি করেছেন আল-জাজিরার সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের। সেই ফয়সালকে নিয়ে এবার তিনি দিয়েছেন নতুন তথ্য।
সায়ের আজ এক ফেসবুক পোস্টে ফয়সালের ফোন নম্বর পাওয়া গেছে বলে জানান। তার আগে সেই ফয়সাল হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাড়ি জমায়, এখন তার অবস্থান ভারতের গুয়াহাটিতে। সেখানে যাওয়ার পর তাকে ভারতে পালাতে সাহায্য করা জাহাঙ্গীর কবির নানকের পিএস মাসুদুর রহমান বিপ্লব তাকে একটি সিম কিনে দেয়।
সায়ের বলেন, ‘ইনকিলাব মঞ্চের সংগঠক ওসমান হাদিকে হত্যার উদ্দেশ্য গুলি করার ঘটনার সাথে জড়িত শ্যুটার সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ খান এবং তার সহযোগী মোটরবাইক চালক আলমগীর হোসেন ১২ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে প্রবেশ করার পর জাহাঙ্গীর কবির নানকের পিএস মো. মাসুদুর রহমান বিপ্লব, ফয়সাল করিম মাসুদকে এই ভারতীয় নম্বরটি জোগাড় করে দেন বলে বিশেষ গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়।’
সেই নম্বর ব্যবহার করে ঘনিষ্ঠ মহলে নিজের উপস্থিতি জানান দেয় ফয়সাল। সায়ের বলেন, ‘+৯১৬০০১৩৯৪০** এই নম্বরটি ব্যবহার করে গতকাল রাতে কয়েকটি নম্বরে নিজেদের এই সেলফি পাঠান ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ খান। যেসকল নম্বরে এই ছবিটি পাঠানো হয় তার একটি ইন্টারসেপ্ট করে এই ছবিটি পাওয়া যায়, যা গতকাল ভারতের আসাম রাজ্যের গুয়াহাটিতে তোলা হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।’
তবে রোববার (১৪ ডিসেম্বর) ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, ওসমান হাদির ওপর হামলাকারীরা ভারতে পালিয়েছে কিনা তথ্য নেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে।
সময়ের আলো/জেডআই