ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর পর দেশের রাজনীতি নতুন মোড় নিয়েছে। তার মৃত্যুর খবরে দেশব্যাপী চলে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট। কে বা কারা এমন হামলা চালিয়েছে সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট নয়। পরিস্কার হয়নি কারা এ হত্যার সঙ্গে জড়িত। তবে ভিন্ন ভিন্ন সূত্র বলছে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য। হাদির হত্যাকাণ্ড ছিল একটি সুপরিকল্পিত মিশনের ফল। তাকে হত্যা করতে গঠন করা হয় একটি ‘শুটার টিম’। টার্গেট বাস্তবায়নে আগে সখ্যতা গড়ে তোলা হয়, এরপর মাত্র সাত দিনের মধ্যেই চালানো হয় প্রাণঘাতী হামলা। হত্যার ১২ ঘণ্টার মধ্যেই দেশ ছেড়ে চলে যান মূল অভিযুক্ত শুটার ফয়সাল। গুরুত্বপূর্ণ আলামতও গায়েব করা হয় পরিকল্পনা অনুযায়ী। বিশ্বস্ত একটি সূত্রে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য জানা গেছে।
হাদিকে মাথায় গুলি করা যুবক ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে ফয়সালের বাড়ি পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলায়। তার স্থায়ী ঠিকানা বাউফল উপজেলার কেশবপুর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডে, কেশবপুর কলেজের পাশে। তার পিতার নাম হুমায়ুন কবির। পুলিশের পিসিআর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে ফয়সাল ঢাকার আদাবর থানাধীন পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটি (বাসা নং-৪১, রোড নং-০৯)-এ বসবাস করতেন। তার বিরুদ্ধে আদাবর থানায় মামলা রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সূত্র বলছে, প্রথমে সখ্যতা গড়ে তোলে ফয়সাল। তারপর আস্তে আস্তে পরিকল্পনা মাফিক এগিয়ে চলে তার কিলিং মিশনের দিকে। হাদি এবং শুটার ফয়সালের পরিচয় হয় ইনকিলাব মঞ্চের কালচারাল সেন্টারে। শতাধিক সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ ও গোয়েন্দা তথ্যে উঠে এসেছে হত্যার আগে শুটার কীভাবে হাদিকে অনুসরণ করেন ও ধাপে ধাপে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন।
জানা গেছে, গত ৪ ডিসেম্বর রাত ৮টা ১৮ মিনিটে বাংলামোটরের ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারে আসেন শুটার ফয়সাল ও তার সহযোগী কবির। প্রায় ছয় মিনিটের সেই বৈঠকে ফয়সাল হাদির সঙ্গে কাজ করার প্রস্তাব দেন। এটি ছিল ঘনিষ্ঠতা তৈরির প্রথম ধাপ। এরপর ৯ ডিসেম্বর রাতে ফয়সাল আবার কালচারাল সেন্টারে আসেন। এবার তার সঙ্গে ছিলেন আলমগীর নামের একজন। সেই বৈঠকে নির্বাচনি প্রচারণার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়। সেখান থেকেই হাদির টিমে অন্তর্ভূক্ত হন ফয়সাল। তারপর বিশ্বস্ততা অর্জন করে ১০ ডিসেম্বর সেগুনবাগিচায় হাদির প্রচারণায় সরাসরি অংশ নেন তিনি।
প্রচারণায় অংশ নেওয়ার পরই হাদিকে হত্যার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেন ফয়সাল। মিশন বাস্তবায়নের জন্য নরসিংদী, সাভার, মানিকগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় রেকি করেন ফয়সাল। ১১ ডিসেম্বর মিশন বাস্তবায়নের প্রস্তুতিতে উঠেন পশ্চিম আগারগাঁওয়ে বোনের বাসায়। এরপর হামলার দিন ভোরে উবারে করে যান হেমায়েতপুরের একটি রিসোর্টে।
হেমায়েতপুরের গ্রিন জোন রিসোর্টের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, শুক্রবার ভোর ৫টা ২২ মিনিটে ফয়সাল ও আলমগীরের গাড়ি রিসোর্টে প্রবেশ করে। যেখানে আগে থেকেই ছিলেন ফয়সালের বান্ধবী মারিয়া ও তার বোন। সেখানে হাদির একটি ভিডিও দেখিয়ে ফয়সাল বলেন, ‘তিনি হাদির মাথায় গুলি করার পরিকল্পনা করছেন এবং এতে সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি হবে।’ তিনি ঘটনার পর সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ রাখার কথা বলেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সকাল ৮টা ৫৪ মিনিটে বান্ধবীকে নিয়ে রিসোর্ট থেকে বের হন ফয়সাল। বাইরে অপেক্ষায় ছিলেন আলমগীর। উবারে করে বান্ধবীকে বাড্ডায় নামিয়ে দেওয়ার পর বেলা ১১টা ৫ মিনিটে আগারগাঁওয়ের বাসা থেকে মোটরসাইকেলে বের হন। তারপর সরাসরি যান হাদির সেগুনবাগিচার প্রচারণায়। সকাল পৌনে ১২টার দিকে সেখানে পৌঁছান ফয়সাল।
প্রচারণা শেষে দুপুর ১২টা ২২ মিনিটে হাদি মতিঝিলের উদ্দেশ্যে রওনা হলে শুটার ফয়সাল পেছন থেকে তার অটোরিকশা অনুসরণ করতে থাকেন। দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে হাদিকে বহন করা অটোরিকশা মতিঝিলের জামিয়া দারুল উলুম মসজিদের সামনে পৌঁছায়। আলমগীর মোটরসাইকেল পার্ক করলে দুজন নেমে আবারও প্রচারণায় যুক্ত হন। এরপর জুমআর নামাজ শেষে দুপুর ২টা ১৬ মিনিটে হাদি সেখান থেকে রওনা হলে শুটাররাও পিছু নেন। দৈনিক বাংলা মোড়ে ডান দিকে ঘুরে পল্টনের বক্স কালভার্ট সড়কে ঢুকে পড়েন তারা। প্রায় আড়াই ঘণ্টা ফাঁকা জায়গা খুঁজে বেড়ানোর পর দুপুর ২টা ২৪ মিনিটে খুব কাছ থেকে হাদিকে লক্ষ্য করে দুটি গুলি ছোড়েন ফয়সাল। এতে গুরুতর আহত হন হাদি।
আশঙ্কাজনক অবস্থায় ওসমান হাদিকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ১৫ ডিসেম্বর তাকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১৮ ডিসেম্বর ওসমান হাদির মৃত্যু হয়।
এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) কেন্দ্রীয় মসজিদের কবরস্থানে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবরের পাশেই দাফন করা হয় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে।
সময়ের আলো/এনএ