শিশুর মানসিক বিকাশে খেলাধুলা

নিবেদিতা দাস

জীবন যখন যেমন

আজকের শিশু আগামী দিনের দেশ গড়ার কারিগর। তাই এই শিশুদের সঠিকভাবে বেড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজন শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা। শিশুদের

2025-12-23T01:47:56+00:00
2025-12-23T01:47:56+00:00
 
  বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬,
১০ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬
জীবন যখন যেমন
শিশুর মানসিক বিকাশে খেলাধুলা
নিবেদিতা দাস
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৩ ডিসেম্বর, ২০২৫, ১:৪৭ এএম 
খেলাধুলা শিশুকে আত্মবিশ্বাসী করে, মানসিক চাপ কমায়। ছবি : সংগৃহীত
আজকের শিশু আগামী দিনের দেশ গড়ার কারিগর। তাই এই শিশুদের সঠিকভাবে বেড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজন শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা। শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের অন্যতম মাধ্যম হলো খেলাধুলা। চারপাশে বড় বড় অট্টালিকার কারণে অনেক শিশুই বাসায় বন্দি অবস্থায় থাকে। তারা মাঠে গিয়ে মুক্ত আকাশে সবার সঙ্গে খেলাধুলা থেকে বঞ্চিত হয়। শিশুদের পরিপূর্ণ মানসিক বিকাশে খেলার মাঠের বিকল্প নেই।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শিশু স্কুলের চাপ, স্ক্রিন টাইমের বৃদ্ধি, খেলার জায়গার অভাব আর শহুরে জীবনযাপনের কারণে ধীরে ধীরে স্থবির হয়ে পড়ছে। আর এ প্রবণতা শুধু ভবিষ্যতের শারীরিক রোগ নয়, মানসিক সমস্যার ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে। শিশুরা দৌড়াবে, লাফাবে, খেলবে- এটাই স্বাভাবিক। এ স্বাভাবিক অভ্যাস পরবর্তী বয়সে মানসিক সুস্থতার জন্য বড় ধরনের সুরক্ষা তৈরি করে।

শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. মোহাম্মদ ওহী উদ্দিন মনে করেন, খেলাধুলা শিশুর সামগ্রিক বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বুদ্ধি বিকাশের ক্ষেত্রে। খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুর মস্তিষ্ক রক্ত সঞ্চালন বাড়ে, মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি উন্নত হয় এবং শেখার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। দৌড়ানো, বল খেলা বা দলগত খেলায় অংশগ্রহণ করলে শিশুর সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ও সৃজনশীল চিন্তা গড়ে ওঠে। পাশাপাশি খেলাধুলা শিশুকে আত্মবিশ্বাসী করে, মানসিক চাপ কমায় এবং সামাজিক আচরণ শেখায়। তাই সুস্থ ও মেধাবী শিশু গড়ে তুলতে নিয়মিত খেলাধুলা অপরিহার্য।

শিশুর বিকাশে দরকার স্বাধীন খেলাধুলা। যেমন- ছবি আঁকা, রং করা, পেইন্টিং, কাটিং ও আঁঠালো আর্ট দিয়ে জোড়া লাগানো, মেক-বিলিভ গেমস বা প্রিন্টেড প্লে বা ড্রেসআপ খেলা। খেলার মাঠের সরঞ্জাম নিয়ে খেলা, আরোহণ বা ক্লাইম্বিং, দোলনা, চারপাশে দৌড়ানো প্রভৃতি। শিশুদের আগ্রহ ঠিক কোন বিষয়ে বেশি তা আবিষ্কারের সুযোগ প্রদান করে খেলাধুলা।

সুইডেনের এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রি-টিন অর্থাৎ ১০ থেকে ১২ বছর বয়সের শিশুদের নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ ভবিষ্যতে মানসিক রোগের ঝুঁকি কমায়। আর এ প্রভাব ছেলেদের ক্ষেত্রে আরও বেশি কার্যকর।

গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, ১১ বছর বয়সি প্রতিটি শিশুর অতিরিক্ত শারীরিক কর্মকাণ্ড ভবিষ্যতে মানসিক রোগের ঝুঁকি ১২ শতাংশ কমিয়েছে।

৫ ও ১১ বছর বয়সি ছেলেদের শারীরিক সক্রিয়তা তাদের উদ্বেগ হওয়ার সম্ভাবনা ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়েছে। বিষণ্নতার ক্ষেত্রেও একই ফল। খেলাধুলা ছেলেদের মধ্যে বিষণ্নতার ঝুঁকি ১৯ থেকে ২৩ শতাংশ পর্যন্ত কমায়।

ফুটবল বা বাস্কেটবলের মতো দলবদ্ধ খেলা ১১ বছর বয়সি ছেলেদের মানসিক রোগের ঝুঁকি কমিয়েছে ২৩ শতাংশ আর মেয়েদের ক্ষেত্রে তা ১২ শতাংশ। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশুদের শারীরিক কার্যকলাপের মাত্রা কমে যায়।

এ গবেষণাটি ব্রিটিশ জার্নাল অব স্পোর্টস মেডিসিনে প্রকাশিত হয়। এ গবেষণায় ১৯৯৭ থেকে ১৯৯৯ সালের মধ্যে সুইডেনে জন্ম নেওয়া ১৬ হাজারেরও বেশি শিশুর দৈনন্দিন শারীরিক কার্যকলাপের তথ্য লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল। এতে অংশ নেওয়া শিশুদের বয়স ছিল ৫, ৮ ও ১১।

খেলা একটি সৃজনশীল কার্যকলাপ। খেলাধুলা ছোট শিশুদের ভাষার বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাদের যোগাযোগের পরিধি বাড়ায়। পাশাপাশি তারা একে অন্যকে এমন শব্দ ও বাক্যাংশ শেখায় যা তার অভিভাবকরাও করতে পারেন না।

খেলাভিত্তিক শিক্ষা একটি শিশুর সামাজিক ও মানসিক দক্ষতা বিকাশে সহায়ক। খেলার মাধ্যমে অন্যদের সহযোগিতা করা, অন্য বন্ধুদের সঙ্গে খেলা, ভাবের আদান-প্রদান, বন্ধুদের নিয়ে আলোচনা, নিয়ম মেনে চলা ইত্যাদি শেখা যায়।

শিশুদের গ্রসমোটর ও সূক্ষ্ম মোটর দক্ষতাগুলো মূলত স্বাধীন খেলার মাধ্যমে বিকশিত হয়। শরীরের বড় পেশিগুলো খেলার মাধ্যমে বিকশিত হয় যেমন- হাঁটা ও দৌড়ানো, ক্লাইম্বিং বা আরোহণ, ঝুলানো, লাফানো, ক্রলিং, ঠেলাঠেলি, টানাটানি, ধরাধরি, বল বা অন্য কিছু নিক্ষেপ করা।

আবার শরীরের ছোট পেশিগুলোও খেলার মাধ্যমে বিকশিত হয় যেমন- ব্লক বা পাজেল খেলার খেলনা দিয়ে মনের মতো কিছু তৈরি, ছবি আঁকা ও সেগুলো কাটা, থ্রেডিং ও লেসিং। সাম্প্রতিক সময়ে স্ক্রিন টাইম বেড়ে যাওয়ায় শিশুর খেলার সময় কমে গেছে। সব শিশুকেই স্বাধীনভাবে খেলার সুযোগ করে দিতে হবে।

স্বাধীন খেলাধুলা বা ফ্রি-প্লে খেলার সময় প্রতিটি শিশু একাধিক সমস্যার সম্মুখীন হয়। খেলার সময় সে কোন সমস্যার সমাধান কীভাবে করবে তা সে নিজেই বেছে নেয়। ফলে তার বিকাশ ঘটে ভালোভাবে। যখন শিশুরা প্রতিদিন খেলার জন্য অবসর সময় কাটাতে অভ্যস্ত হয়, তখন তাদের মধ্যে স্বাধীন বোধ তৈরি হয়।

অভিভাবক হিসেবে আমাদের কর্তব্য শিশুদের প্রতিটি খেলায় উপস্থিত না থাকা। তা হলে শিশু নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। শিশুকে খেলার দিক থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হবে। টানেলের মধ্য দিয়ে আরোহণ করে, চারপাশে দৌড়ে, মুভমেন্ট গেম খেলে, মধ্যরেখা অতিক্রম করার মতো স্বাধীন খেলার মাধ্যমে শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ঘটতে পারে।

অন্যদিকে মানসিকভাবে দুর্বল শিশুরা প্রায়ই খেলার সময় অন্য শিশুদের সঙ্গে ধাক্কা খায়। যদি শিশুদের স্পাসিয়াল সেন্স ঠিকমতো বিকাশ না ঘটে, তবে পরবর্তী সময়ে শব্দ ও অক্ষর লিখতে সমস্যা হয়। একটি অক্ষর খাতার পেজের মার্জিনের ভেতরে না বাইরে থাকবে সেটি সে বুঝতে পারে না।

এ বিষয়ে পলি রহমানের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, তার দুটি বাচ্চা। বাচ্চাদের এখন পরীক্ষা শেষ। তাদের ঘরবন্দি হয়ে কাটাতে হচ্ছে। ঢাকা শহরে তাদের কোনো আত্মীয়স্বজন নেই। বাচ্চাদের ঘরে মন বসে না। কাছাকাছি কোনো খেলার মাঠ নেই। যেখানে গিয়ে বিকালে খেলা করা যায়। সে জন্য তাদের অনেক বেশি মোবাইলের আসক্তি দেখা দিচ্ছে।

উম্মে রুকসানা একজন ব্যাংক কর্মকর্তা। তিনি বলেন, তার এক ছেলে ও এক মেয়ে। ছেলেটি প্লেতে পড়ে। তার এখন স্কুল বন্ধ। সারা দিন ঘরে বসে থাকে। প্রতিদিন সে চায় তার মায়ের সঙ্গে অফিসে যাবে। যেহেতু ডিসেম্বর মাস, ব্যাংকে প্রচুর কাজের চাপ। তিনি চাইলেই ছুটি নিয়ে কোথাও বেড়াতে যেতে পারছে না। তাই বাচ্চাটি হয়তো টিভিতে কার্টুন দেখে নয়তো মোবাইলে গেমস খেলে সময় কাটিয়ে দিচ্ছে।

তাদের দুজনের একই মত, যদি বাসার কাছাকাছি কোনো মাঠ থাকত তবে বিকালে কিছুটা সময় তারা নিজেদের মতো খেলা করতে পারত। এতে তাদের শারীরিক বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে সমবয়সি অনেক বাচ্চার সঙ্গে দেখা হতো ও খেলা করতে পারত।

শিশুর বিকাশের মূলে রয়েছে খেলাধুলা। যদি স্বাধীন খেলাধুলা হয়, সেটি আরও ভালো। শিশুরা খেলার মাধ্যমে বিশ্ব সম্পর্কে অভিজ্ঞতা লাভ করে ও শেখে। খেলার মধ্য দিয়েই তারা চারপাশের পরিবেশের সন্ধান করে, তা থেকে শব্দভান্ডার তৈরি করে ও তাদের আবেগ প্রকাশ করে।

সময়ের আলো/কেএইচও


  বিষয়:   শিশু  মানসিক  বিকাশ  খেলাধুলা 


Loading...
Loading...
জীবন যখন যেমন- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: