১৯৭১ সালে একটি যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জন্ম হয়। মুক্তিযুদ্ধে অসীম সাহসিকতা ও বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ৭ জনকে বীরশ্রেষ্ঠ, ৬৮ জনকে বীরউত্তম, ১৭৫ জনকে বীরবিক্রম ও ৪২৬ জনকে বীরপ্রতীক খেতাব প্রদান করা হয়। এর মধ্যে মাত্র দুজন নারী বীরপ্রতীক খেতাব পান। তারা হলেন, তারামন বিবি ও ক্যাপ্টেন সিতারা বেগম। স্বাধীনতার ২৪ বছর পরও তারামন বিবি জানতেন যে, তিনি বীরপ্রতীক খেতাপপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা।
তারামন বিবি ছিলেন গ্রামের গরীব পরিবারের খুবই সাধারণ এক নারী। যুদ্ধে তিনি গুপ্তচর সেজে একাধিকবার পাকিস্তানি ক্যাম্পে গিয়ে দরকারি তথ্য সংগ্রহ করে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছে দেন। চুলে জটা ধরা পাগল, কখনো সারা শরীরে কাদা মাথা ভবঘুরে ও পঙ্গুর ছদ্মবেশে শত্র ঘাঁটি রেকি করে এনেছেন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। পাশাপাশি পুরুষ সহযোদ্ধাদের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে লড়াই করেছেন।
মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৭৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর গেজেটের মাধ্যমে খেতাবপ্রাপ্ত মোট ৬৭৬ জন শহিদ ও জীবিত মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে তারামন বিবির নামটি ঘোষিত হয়। কিন্তু গ্রামের অজপাড়াগাঁয়ের এই নারীর কাছে সে খবরটি তখন দুর্ভাগ্যজনকভাবে পৌঁছায়নি! ঘটনার এখানেই শেষ নয়। ১৯৯২ সালে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের সেই খেতাব প্রদান করেন। সেই খবরও তারামন বিবি পাননি! তখনো তার ঠিকানা কারও জানা ছিল না। ফলে তার বীরপ্রতীক খেতাব থেকে যায় কাগজে-কলমে। বেগম খালেদা জিয়া তার খোঁজ করেন। ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজের অধ্যাপক বিমল কান্তি দে’র মাধ্যমে খালেদা জিয়া খোঁজ পান তারামন বিবির। তারামন বিবিকে ঢাকায় এনে নিজ হাতে পরিয়ে দেন পদক।
মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য খালেদা জিয়ার অবদান বর্ণনা করতে গিয়ে এ. কে. এম. ওয়াহিদুজ্জামান লিখেছেন, ‘১৯৯১ সালে নির্বাচনে জিতে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন বেগম খালেদা জিয়া। দায়িত্ব নিয়েই তিনি দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৯২ সালের ১৫ ডিসেম্বর খেতাবপ্রাপ্ত সকল মুক্তিযোদ্ধাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পদক দেওয়া হয়। কিন্তু, একজনকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না—তারামন বিবি বীরপ্রতীক। ১৯৯৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর তাকে খুঁজে বের করে নিজ হাতে পদক পরিয়ে দেন বেগম খালেদা জিয়া। ১৯৯৩ সালে একাত্তরের বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন খালেদা জিয়া। গড়ে তোলা হয় রায়ের বাজার বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ। ২০০১ সালে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা সমুন্নত রাখতে গঠন করেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। ২০০২ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক ভাতা ২০ থেকে ৬৬ শতাংশ বাড়ানো হয়। ২০০৩ সালে প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারকে রাষ্ট্রীয় অনুদান দেওয়া হয়। উদ্যোগ নেওয়া হয় বীরশ্রেষ্ঠদের কবরের পাশে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের। ২০০৪ সালে খুলনায় বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান স্টেডিয়াম প্রতিষ্ঠা করা হয়। ২০০৬ সালে বেগম জিয়ার অনুরোধে বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের দেহাবশেষ বাংলাদেশে পাঠায় পাকিস্তান। তাকে সসম্মানে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শায়িত করা হয়। এ সময় ঢাকার প্রতিটি রাস্তার নামকরণ করা হয় মুক্তিযোদ্ধাদের নামে। বেগম জিয়া মুক্তিযুদ্ধকে নির্বাচনে জেতার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেননি, মুক্তিযুদ্ধ ছিল তার বিশ্বাসের অংশ।’
আরআর