নওগাঁর শৈলগাছী ইউনিয়নের এক শান্ত পল্লি। সকালের রোদে ঝিলমিল করছে একটি মাঝারি আকারের পুকুর। দূর থেকে দেখলে মনে হবে-আর দশটা মাছের পুকুরের মতোই। কিন্তু কাছে গেলেই ধরা পড়ে ভিন্ন এক বাস্তবতা। জেলেদের জালের ফাঁকে ভেসে ওঠে বড় আকারের গলদা চিংড়ি। যা জেলায় প্রথম গলদা চিংড়ি চাষের পুকুর। আর এই ব্যতিক্রমী সাফল্যের নায়ক নওগাঁ জেলার শৈলগাছী ইউনিয়নের দীঘিরপাড় গ্রামের মাছ চাষি মো. রাজু সরদার।
জানা গেছে, রাজু সরদার দীর্ঘদিন ধরেই কার্প জাতীয় মাছ চাষের সঙ্গে যুক্ত। তবে প্রচলিত চাষে লাভ সীমিত হওয়ায় নতুন কিছু করার চিন্তা তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। ঠিক সেই সময়, গত জুন মাসে স্থানীয় এনজিও ‘মৌসুমী’র কৃষি ইউনিটের মৎস্য খাতের আওতায় ‘উত্তম ব্যবস্থাপনায় গলদা চিংড়ি চাষ’ শীর্ষক একটি প্রদর্শনীর সুযোগ আসে তার হাতে। প্রদর্শনীর আওতায় তাকে ৫০০ পিস গলদা চিংড়ির জুভেনাইল (পোনা) সরবরাহ করা হয়।
অনেকের কাছে বিষয়টি তখনও ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলেও রাজু সরদার থেমে থাকেননি। নিজের উদ্যোগে আরও এক হাজার পিস জুভেনাইল (পোনা) সংগ্রহ করে কার্প জাতীয় মাছের সঙ্গে সমন্বিতভাবে গলদা চিংড়ি চাষ শুরু করেন। রাজু সরদারের পুকুরে নিয়মিত পানির গুণগত মান পরীক্ষা, সুষম খাদ্য সরবরাহ, পুকুরের তলদেশ পরিষ্কার রাখা-সবকিছুই চলে পরিকল্পিতভাবে।
রাজু সরদার জানান, গলদা চিংড়ি খুবই সংবেদনশীল। পানির মান ঠিক না থাকলে সমস্যা হয়। তাই নিয়মিত নজরদারি করেছি।
এই যত্নের ফল মিলতেও বেশি সময় লাগেনি। অল্প কয়েক মাসের মধ্যেই গলদা চিংড়িগুলো দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে। বর্তমানে প্রতি কেজিতে ৭ থেকে ৮টি গলদা চিংড়ি পাওয়া যাচ্ছে-যা স্বাদু পানিতে চাষের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সন্তোষজনক ফলাফল।
রাজু সরদার আশাবাদী, তার পুকুর থেকে মোট ১২০ থেকে ১৩০ কেজি গলদা চিংড়ি উৎপাদন হবে। বর্তমানে বাজারে প্রতিকেজি গলদা চিংড়ির দাম ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা। সে হিসেবে মোট বাজার মূল্য দাঁড়াতে পারে প্রায় এক লাখ ২০ হাজার থেকে এক লাখ ৪০ হাজার টাকা।
তিনি বলেন, কার্প মাছের পাশাপাশি গলদা চিংড়ি চাষ করায় একই পুকুর থেকে দ্বিগুণ লাভের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ঝুঁকি ছিল, কিন্তু সঠিক ব্যবস্থাপনায় তা সম্ভব হয়েছে।
সরেজমিনে কথা হয় স্থানীয় চাষি চপল ও সাইফুলের সঙ্গে। তারা বলেন, আগে স্বাদু পানিতে গলদা চিংড়ি চাষ নিয়ে ভয় ও সংশয় ছিল। আমরা আগে ভাবতেই পারিনি, গলদা চিংড়ি এভাবে পুকুরে সফলভাবে চাষ করা সম্ভব। রাজু সরদারের সাফল্য দেখে আমরাও ইতি মধ্যে গলদা চিংড়ি চাষ শুরু করেছি।
রাজু সরদারের পুকুর এখন যেন জীবন্ত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। প্রতিদিনই আশপাশের এলাকা ছাড়াও জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চাষিরা এসে ঘুরে দেখছেন। ইতোমধ্যে নওগাঁ জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে ৩০ থেকে ৪০ জন চাষি গলদা চিংড়ি চাষে আগ্রহী হয়ে মাঠে নেমেছেন।
উন্নয়ন সংস্থা মৌসুমীর কৃষি ইউনিটের মৎস্য কর্মকর্তা শাহারিয়ার হোসেন বলেন, রাজু সরদারের এই সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়, এটি একটি সম্ভাবনার গল্প। নওগাঁয় কার্প জাতীয় মাছের সাথে গলদা চিংড়ি চাষ ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, বাড়বে মাছ উৎপাদন এবং শক্তিশালী হবে স্থানীয় অর্থনীতি। একটি পুকুর থেকেই জন্ম নেবে নতুন স্বপ্ন-যা নওগাঁর মৎস্য খাতে যোগ করবে এক নতুন অধ্যায়।
পিকেএসএফ এর সহায়তায় রাজু সরদারের সাফল্য দেখে ইতোমধ্যে অনেকেই গলদা চিংড়ি চাষ শুরু করেছে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।
নওগাঁ সদর উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. বায়োজিদ আলম বলেন, এ উদ্যোগকে অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখছি।
তিনি বলেন, কার্প জাতীয় মাছের সাথে গলদা চিংড়ি চাষ করলে অল্প জায়গাতেও ভালো আয় করা সম্ভব। রাজু সরদারের এই সাফল্য অন্য চাষিদের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। আমরা চাই, স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা মৌসুমী এ ধরনের উদ্যোগ আরও গ্রহণ করবে।
এফআর