ইন্টারনেটে শিশুদের নিরাপদ রাখতে যেসব পদক্ষেপ জরুরি

হাবিবা সুলতানা

বিবিধ

বর্তমানে বাংলাদেশের শিশুরা খুব অল্প বয়সেই ইন্টারনেটের জগতে প্রবেশ করছে। পড়াশোনা, বিনোদন ও সামাজিক যোগাযোগ—সবই এখন অনলাইনে নির্ভরশীল। কিন্তু এই

2026-01-03T23:48:41+00:00
2026-01-04T00:25:35+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
বিবিধ
ইন্টারনেটে শিশুদের নিরাপদ রাখতে যেসব পদক্ষেপ জরুরি
হাবিবা সুলতানা
প্রকাশ: শনিবার, ৩ জানুয়ারি, ২০২৬, ১১:৪৮ পিএম  আপডেট: ০৪.০১.২০২৬ ১২:২৫ এএম  (ভিজিট : ৩০৯)
প্রতীকী ছবি
বর্তমানে বাংলাদেশের শিশুরা খুব অল্প বয়সেই ইন্টারনেটের জগতে প্রবেশ করছে। পড়াশোনা, বিনোদন ও সামাজিক যোগাযোগ—সবই এখন অনলাইনে নির্ভরশীল। কিন্তু এই সহজলভ্যতার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে ভয়ও।

ইউনিসেফ বাংলাদেশের এক জরিপে দেখা গেছে, দেশে ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী প্রায় ৩২ শতাংশ শিশু সাইবার বুলিং ও অনলাইন হয়রানির শিকার হয়েছে। ঢাকা ট্রিবিউনে প্রকাশিত একটি জাতীয় গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রায় ২৩ শতাংশ শিশু গুরুতর অনলাইন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, যার মধ্যে অনলাইন গ্রুমিং, যৌন শোষণ, ছবি ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইল এবং মানসিক নিপীড়ন অন্যতম। এসব তথ্য স্পষ্টভাবে দেখায় যে, অনলাইন ঝুঁকি এখন শিশুদের জন্য বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং একটি নিয়মিত ও ভয়াবহ বাস্তবতা। প্রশ্ন হচ্ছে, এই ক্রমবর্ধমান অনলাইন ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশের আইন কি সত্যিই শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারছে?

বাংলাদেশে শিশু সুরক্ষার প্রধান আইন হলো শিশু আইন, ২০১৩। এই আইন অনুযায়ী, ১৮ বছরের নিচে সবাই শিশু। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ নিশ্চিত করা। এই আইনে শিশু আদালত, প্রবেশন অফিসার ও পুনর্বাসনমূলক বিচারব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। অনলাইন যৌন শোষণ ঠেকাতে রয়েছে পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১২, যেখানে শিশুকে ব্যবহার করে পর্নোগ্রাফি তৈরি বা প্রচারকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এছাড়া সাইবার অপরাধ দমনে বাংলাদেশে আগে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং বর্তমানে সাইবার প্রোটেকশন অর্ডিন্যান্স, ২০২৫ কার্যকর রয়েছে। কাগজে-কলমে এসব আইন শক্ত মনে হলেও বাস্তবে এগুলো শিশুদের অনলাইন সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে।
এর মূল কারণ হলো, বাংলাদেশের সাইবার আইনগুলো মূলত প্রতিক্রিয়াশীল। অর্থাৎ, ক্ষতি হয়ে যাওয়ার পর অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, কিন্তু ক্ষতি যেন শুরুতেই না হয় সে বিষয়ে আইন প্রায় নীরব। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর শিশু সুরক্ষার কোনো বাধ্যতামূলক দায়িত্ব আরোপ করা হয়নি। ফেসবুক, টিকটক বা ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোকে শিশুদের ঝুঁকি কমাতে আইনত বাধ্য করা হয়নি, ফলে শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ে।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো, বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা এখনো অনেক ক্ষেত্রে উপনিবেশিক আমলের আইন নির্ভর। ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ এবং সাক্ষ্য আইন ১৮৭২ দিয়ে আজকের ডিজিটাল প্রমাণ, অনলাইন কথোপকথন, অ্যালগরিদমিক ক্ষতি বা সোশ্যাল মিডিয়ার ডেটা কার্যকরভাবে মূল্যায়ন করা কঠিন। এর ফলে সাইবার মামলাগুলো বছরের পর বছর ঝুলে থাকে এবং শিশুরা দীর্ঘ সময় ধরে মানসিক ও সামাজিক ক্ষতির শিকার হয়।

আইনের ভাষাগত অস্পষ্টতাও বড় একটি বাধা। ‘অশ্লীল’, ‘আপত্তিকর’ বা ‘নৈতিকতা বিরোধী’ এর মতো অস্পষ্ট শব্দ অনেক সময় শিশু সুরক্ষার চেয়ে মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে আইন প্রয়োগের মূল লক্ষ্য শিশু সুরক্ষা থেকে সরে গিয়ে অন্যদিকে মোড় নিয়েছে।

আদালত কিছু ক্ষেত্রে শিশুদের অনলাইন অধিকার স্বীকার করেছে। বিএনডব্লিউএলএ বনাম বাংলাদেশ (২০১১) মামলায় উচ্চ আদালত অনলাইনে যৌন হয়রানিকে স্বীকৃতি দিয়ে তা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। একইভাবে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট বনাম বাংলাদেশ এবং সৈয়দ রেজওয়ানুল হক বনাম বাংলাদেশ মামলায় আদালত স্পষ্টভাবে বলেন, অস্পষ্ট ও অনির্দিষ্ট আইনি ধারা ব্যবহার করে কোনোভাবেই নাগরিকের মৌলিক অধিকার খর্ব করা যাবে না। তবে এসব যুগান্তকারী রায় সত্ত্বেও শিশুদের জন্য একটি সমন্বিত, আধুনিক ও প্রযুক্তি-সংবেদনশীল অনলাইন সুরক্ষা কাঠামো এখনো বাংলাদেশে গড়ে উঠেনি।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশ শিশু সুরক্ষার ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার গ্রহণ করেছে। দেশটি জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ এবং শিশুশ্রম ও যৌন শোষণবিরোধী আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার একাধিক সনদ অনুমোদন করেছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, বাংলাদেশ এখনো সাইবার অপরাধ বিষয়ক বুদাপেস্ট সনদ অনুমোদন করেনি। এই সনদ অনুমোদন না করায় সীমান্ত পেরিয়ে সংঘটিত অনলাইন অপরাধ তদন্ত, আন্তর্জাতিক তথ্য বিনিময় এবং ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কার্যকরভাবে অংশ নিতে পারছে না, যার ফলে শিশু সুরক্ষা আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে।

যেখানে বাংলাদেশ এখনো লড়াই করছে, সেখানে উন্নত রাষ্ট্রগুলো সমাধানের পথে এগিয়ে গেছে। যুক্তরাজ্য শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও আধুনিক পথ অনুসরণ করেছে। দেশটি ২০২৩ অনলাইন নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করে শিশু সুরক্ষার দায়িত্ব সরাসরি প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর ন্যস্ত করেছে। এই ব্যবস্থায় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোকে শিশুদের সম্ভাব্য ঝুঁকি আগেই মূল্যায়ন করতে হয়, ক্ষতিকর বিষয়বস্তু ছড়িয়ে পড়ার আগেই তা প্রতিরোধ করতে হয় এবং শুরু থেকেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নকশা অনুসরণ করতে হয়। আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থা কোম্পানির বৈশ্বিক আয়ের বড় অংশ পর্যন্ত জরিমানা আরোপ করতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও অস্ট্রেলিয়াও একই ধরনের প্রতিরোধমূলক ও শিশুকেন্দ্রিক অনলাইন সুরক্ষা কাঠামো অনুসরণ করছে।

বাংলাদেশে শিশুদের অনলাইন সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। প্রথমত, শিশুদের অধিকার ও নিরাপত্তাকে কেন্দ্র করে একটি স্বতন্ত্র ও শিশুবান্ধব অনলাইন নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ওপর বাধ্যতামূলক দায়িত্ব আরোপ করতে হবে, যাতে তারা শিশুদের জন্য ক্ষতিকর কনটেন্ট আগেই শনাক্ত ও প্রতিরোধ করতে বাধ্য হয়। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় সহযোগিতা জোরদার করার জন্য বুদাপেস্ট সাইবার অপরাধ সনদ দ্রুত অনুমোদন করা উচিত।

একই সঙ্গে সাইবার ট্রাইব্যুনালগুলোর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি করে আধুনিক ডিজিটাল প্রমাণ বিশ্লেষণের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সচেতন ও আত্মরক্ষায় সক্ষম করে তুলতে স্কুল পর্যায়ে ডিজিটাল নাগরিকত্ব শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা সময়ের দাবি।

সবশেষে বলা যায়, অনলাইনে ভয় বাড়ছে। কারণ আইন এখনো প্রযুক্তির গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। কাগজে অঙ্গীকার থাকলেও বাস্তবে শিশুদের অনলাইন সুরক্ষা খণ্ডিত ও দুর্বল। শিশুদের নিরাপদ ডিজিটাল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হলে এখনই কাঠামোগত আইন সংস্কার, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং প্রযুক্তি কোম্পানির জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।

লেখক : শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

আরআর




  বিষয়:   শিশু  ডিজিটাল  ইন্টারনেট  আইন 


Loading...
Loading...
বিবিধ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: