মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার ইঙ্গিত দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থে গ্রিনল্যান্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। এই বক্তব্য শুধু ডেনমার্কের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ককে টানাপোড়েনে ফেলেনি, বরং ন্যাটো জোটের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের পর ট্রাম্পের এই আগ্রহ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। অনেকের মতে, সামরিক শক্তি ব্যবহারের সাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত গ্রিনল্যান্ড প্রসঙ্গে তার বক্তব্যকে আরও গুরুতর করে তুলেছে।
তবে প্রশ্ন হচ্ছে-এত দূরবর্তী, স্বল্প জনবসতিপূর্ণ এই দ্বীপটি কেন ট্রাম্পের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ?
গ্রিনল্যান্ড কেমন এলাকা?
গ্রিনল্যান্ড বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপ, যার আয়তন প্রায় ২১ লাখ বর্গকিলোমিটার। এটি একসময় ডেনমার্কের উপনিবেশ ছিল এবং বর্তমানে ডেনমার্কের একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। আর্কটিক অঞ্চলে অবস্থিত এই দ্বীপটি পৃথিবীর সবচেয়ে কম জনঘনত্বের এলাকাগুলোর একটি।
প্রায় ৫৬ হাজার মানুষের বসবাস এখানে, যাদের বেশিরভাগই ইনুইট জনগোষ্ঠীর। দ্বীপটির প্রায় ৮১ শতাংশ এলাকা বরফে ঢাকা। শহরগুলোর মধ্যে যোগাযোগের জন্য মানুষকে নৌকা, হেলিকপ্টার কিংবা ছোট বিমানের ওপর নির্ভর করতে হয়। রাজধানী নুক—রঙিন বাড়ি, পাহাড় আর খাঁড়িতে ঘেরা এক শান্ত শহর।
কৌশলগত দিক থেকে কেন গুরুত্বপূর্ণ?
গ্রিনল্যান্ডের ভৌগোলিক অবস্থানই একে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মাঝামাঝি অবস্থিত এবং গ্রিনল্যান্ড–আইসল্যান্ড–যুক্তরাজ্য (GIUK) গেটওয়ের ওপর নজরদারির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা আর্কটিক ও আটলান্টিক মহাসাগরের মধ্যে একটি প্রধান নৌপথ।
এছাড়া গ্রিনল্যান্ডে রয়েছে তেল, গ্যাস এবং বিপুল পরিমাণ বিরল খনিজ। এই খনিজগুলো বৈদ্যুতিক গাড়ি, বায়ু টারবাইন থেকে শুরু করে আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম তৈরিতে অপরিহার্য। চীন যখন এই খনিজ বাজারে আধিপত্য বিস্তার করছে, তখন গ্রিনল্যান্ডের গুরুত্ব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আরও বেড়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আর্কটিক অঞ্চলের বরফ গলতে থাকায় খনিজ সম্পদ আহরণ ও নতুন নৌপথ ব্যবহারের সুযোগও বাড়ছে-যা ভবিষ্যতের বৈশ্বিক বাণিজ্য ও নিরাপত্তার জন্য বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
ট্রাম্প কী বলছেন?
ট্রাম্প দাবি করেন, গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য। তার ভাষায়, গ্রিনল্যান্ড আমাদের দরকার-এটি এখন খুব কৌশলগত এলাকা। সেখানে রাশিয়া ও চীনের উপস্থিতি বাড়ছে।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণ মূলত বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনা চলছে এবং সামরিক পদক্ষেপও পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া হয়নি-যা ইউরোপজুড়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
ডেনমার্ক ও ইউরোপের প্রতিক্রিয়া
ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, গ্রিনল্যান্ড বিক্রির কোনো প্রশ্নই ওঠে না। তিনি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ন্যাটোর কোনো সদস্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেয়, তাহলে তা পুরো জোটের ভিত্তিকেই নড়বড়ে করে দেবে।
ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের একাধিক দেশ ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বলেছে-গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার কেবল সেখানকার জনগণের।
গ্রিনল্যান্ডবাসীরা কী ভাবছেন?
গ্রিনল্যান্ডে ট্রাম্পের মন্তব্য ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে স্বাধীনতার প্রশ্নে আলোচনা চললেও অধিকাংশ মানুষ ডেনমার্কের পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রের শাসনে যেতে চান না।
একটি জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৮৫ শতাংশ গ্রিনল্যান্ডবাসী যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হওয়ার বিরোধিতা করেন।
গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন ট্রাম্পের বক্তব্যকে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য ও অসম্মানজনক বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, গ্রিনল্যান্ড আমাদের আবাসভূমি। আমরা সংলাপে বিশ্বাস করি, কিন্তু তা হতে হবে আন্তর্জাতিক আইন ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রপন্থী নালেরাক পার্টির কিছু রাজনীতিবিদ মনে করেন, ট্রাম্প যদি আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের কথা বলেন, সেটিকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখা যেতে পারে। কিন্তু সামরিক দখলের ইঙ্গিত গ্রিনল্যান্ডবাসীর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
গ্রিনল্যান্ড এখন শুধু একটি বরফাচ্ছন্ন দ্বীপ নয়-এটি বিশ্ব রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু। ট্রাম্পের আগ্রহ এই অঞ্চলকে আন্তর্জাতিক উত্তেজনার নতুন অধ্যায়ে নিয়ে গেছে, যেখানে জাতীয় নিরাপত্তা, সম্পদ, সার্বভৌমত্ব এবং জনগণের অধিকার-সবকিছুই জড়িয়ে আছে।
/ইউএমএইচ