ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, চলমান বিক্ষোভের মুখেও ইসলামি প্রজাতন্ত্র কোনোভাবেই পিছু হটবে না। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলা দেশজুড়ে বিক্ষোভের মধ্যেই নিজের অনড় অবস্থান তুলে ধরেন তিনি।
বৃহস্পতিবার ইরানের ৩১টি প্রদেশের শতাধিক শহরে ছড়িয়ে পড়ে ভয়াবহ সরকারবিরোধী আন্দোলন। বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন সরকারি ভবন ও রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ করেন। এ সময় ‘স্বৈরাচারের মৃত্যু’, ‘খামেনির মৃত্যু’সহ নানা স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে রাজপথ। রাতভর তেহরানসহ বড় বড় শহরে হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন।
বিক্ষোভ দমনের অংশ হিসেবে ইরানি কর্তৃপক্ষ বৃহস্পতিবার গভীর রাতে পুরো দেশে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেয়। ইন্টারনেট পর্যবেক্ষক সংস্থা নেটব্লকস জানিয়েছে, টানা প্রায় ১২ ঘণ্টা দেশটি কার্যত অনলাইনের বাইরে ছিল।
এই আন্দোলনকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সাড়ে চার দশকের ইতিহাসে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অনেক বিক্ষোভকারী প্রকাশ্যেই ধর্মতান্ত্রিক শাসনের অবসান দাবি করছেন।
গত ৩ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ নিয়ে প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে খামেনি বিক্ষোভকারীদের ‘নাশকতাকারী’ ও ‘ধ্বংসকারী’ বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাত ‘হাজারের বেশি ইরানির রক্তে রঞ্জিত’। ইসরায়েলের সঙ্গে সাম্প্রতিক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ও সরাসরি অংশগ্রহণের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
খামেনি আরও বলেন, অহংকারী মার্কিন নেতৃত্ব ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের আগে ইরান শাসনকারী রাজতন্ত্রের মতোই একদিন উৎখাত হবে। সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং নাশকতাকারীদের সামনে কখনোই মাথা নত করবে না।
এ সময় উপস্থিত সমর্থকদের অনেকে ‘আমেরিকার মৃত্যু’ স্লোগান দেন। খামেনির দাবি, রাজধানী তেহরানে কিছু নাশকতাকারী ভবন ধ্বংস করেছে শুধু মার্কিন প্রেসিডেন্টকে খুশি করার উদ্দেশ্যে।
অন্যদিকে, বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ইরানে সরকার উৎখাতের বিষয়ে অভূতপূর্ব উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা হলে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর জবাব দিতে প্রস্তুত।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, তেহরানের আয়াতুল্লাহ কাশানি বুলেভার্ডসহ বিভিন্ন এলাকায় বিপুল জনসমাগম। গাড়ির হর্ন বাজিয়ে বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন জানানো হয়। একই ধরনের বিক্ষোভ দেখা গেছে তাবরিজ, মাশহাদ, কেরমানশাহ ও ইসফাহানসহ বিভিন্ন শহরে।
কয়েকটি ভিডিওতে ইসফাহানে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের আঞ্চলিক কার্যালয় এবং মারকাজি প্রদেশের শাজান্দে গভর্নরের ভবনে আগুন দেওয়ার দৃশ্য দেখা গেছে। তবে এসব ভিডিওর সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।
আন্দোলনকারীদের দাবি, ২০২২-২৩ সালের আন্দোলনের পর এটিই সবচেয়ে বড় গণবিক্ষোভ। সে সময় মাহসা আমিনির পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগ, চলমান বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে অন্তত ৪৫ জন নিহত হয়েছেন। যদিও সাম্প্রতিক ভিডিওতে বিক্ষোভকারীদের ওপর সরাসরি দমনপীড়নের দৃশ্য দেখা যায়নি।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত ইরানের সাবেক শাহর পুত্র রেজা পাহলভি বড় পরিসরে বিক্ষোভের আহ্বান জানিয়েছেন। নতুন ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, বৃহস্পতিবারের জমায়েত প্রমাণ করেছে-বৃহৎ জনসমাগম দমনকারী শক্তিকে পিছু হটতে বাধ্য করতে পারে। তিনি শুক্রবার আরও বড় বিক্ষোভের ডাক দেন।
/ইউএমএইচ