সাদা মার্বেল পাথরের অপূর্ব কারুকার্য, সুউচ্চ মিনার আর বিশাল গম্বুজের মেলবন্ধনে গড়া তাজমহল মানেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক রাজকীয় আভিজাত্য। দিল্লি থেকে মাত্র ১৫০ মাইল দূরে যমুনা নদীর তীরে অবস্থিত বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্যের এই ঐতিহাসিক ইমারতটি দীর্ঘ ৪০০ বছর ধরে প্রেমের প্রতীক হিসেবে স্বীকৃত।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই বিশ্ব ঐতিহ্যকে ঘিরে নতুন করে বিতর্কের জল ঘোলা করা হচ্ছে। উত্তরপ্রদেশের এলাহাবাদ হাই কোর্ট সম্প্রতি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ও পুরাকীর্তি বিভাগকে (এএসআই) নোটিশ পাঠিয়ে তাজমহলের ভেতরে জরিপ চালানোর বিষয়ে অবস্থান জানতে চেয়েছে।
এই নতুন বিতর্কের নেপথ্যে রয়েছেন একজন বিজেপি নেতা। তিনি প্রথমে এলাহাবাদের জেলা আদালতে একটি পিটিশন দাখিল করে দাবি করেন, তাজমহলের নিচে একসময় মন্দির ছিল এবং তার প্রমাণ এর বেজমেন্টে বন্ধ থাকা ২২টি কক্ষের ভেতর লুকিয়ে আছে। জেলা আদালত সেই আবেদনটি খারিজ করে দিলে তিনি হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন এবং তাজমহল চত্বরে নতুন করে জরিপ চালানোর দাবি জানান।
এর আগেও এই ঐতিহাসিক স্থাপনা নিয়ে নানামুখী দাবি উঠলেও ইতিহাসবিদদের মতে, ১৯৬৫ সালের আগে তাজমহলের মালিকানা বা এর ভেতরে মন্দির থাকা নিয়ে কোনো ধরনের বিতর্কই ছিল না এবং এর নির্মাণসংক্রান্ত সব ঐতিহাসিক দলিল সুস্পষ্টভাবে সংরক্ষিত আছে।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ১৬৩১ সালে বুরহানপুরে মুঘল সম্রাট শাহজাহানের স্ত্রী মমতাজ মহলের মৃত্যুর পর তার স্মৃতির উদ্দেশ্যে এই সৌধ নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। সম্রাট যমুনা নদীর তীরের মনোরম জায়গাটি বেছে নেন, যা ছিল রাজা মান সিংয়ের নাতি ও অম্বরের রাজা জয় সিংয়ের মালিকানাধীন।
সম্রাট শাহজাহানের সমসাময়িক সরকারি ইতিহাসগ্রন্থ ‘বাদশাহনামা’-তে এই নির্মাণকাজের ভিত্তিস্থাপনের সুস্পষ্ট বিবরণ রয়েছে। ইতিহাসবিদ ড. রুচিকা শর্মার তথ্যমতে, জয় সিং জমিটি বিনামূল্যে দিতে চাইলেও শাহজাহান তা নেননি, বরং সমমূল্যের বিকল্প আরেকটি জায়গা তাকে দেওয়া হয়েছিল। ১৬৪৮ সালের মধ্যে মূল ভবনের কাজ শেষ হলেও খোদাই ও স্বর্গীয় উদ্যানের খালের কাজ সম্পন্ন হতে আরও পাঁচ বছর সময় লাগে।
তাজমহলকে ঘিরে প্রচলিত কিছু লোককথাকে অনেকেই সত্যি মনে করলেও ইতিহাসে তার কোনো অকাট্য প্রমাণ নেই। যেমন একটি বহুল প্রচলিত গল্প হলো— শাহজাহান কারিগরদের হাত কেটে নিয়েছিলেন যাতে এমন দ্বিতীয় কোনো ইমারত আর তৈরি না হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, এই গল্পটি মূলত তাজমহলের অনন্য ও অতুলনীয় রূপকে প্রকাশ করতেই রূপক অর্থে ছড়ানো হয়েছিল।
আরেকটি দাবি করা হয়, তাজমহল নির্মাণের বিশাল খরচের কারণে তৎকালীন গুজরাটে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় এবং হিন্দুদের মৃত্যু হয়। তবে ইতিহাস বলছে, সে সময় দুর্ভিক্ষ হলেও শাহজাহান তা মোকাবিলায় সব সম্প্রদায়ের জন্যই খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহের ব্যবস্থা করেছিলেন। ফলে একে নির্দিষ্ট ধর্মীয় রূপ দেওয়া স্রেফ বিদ্বেষ ছড়ানোর অংশ।
আদালতে চলমান এই বিতর্কের আসল গোড়াপত্তন হয়েছিল ১৯৬৫ সালে। পুরুষোত্তম নাগেশ ওক (পিএন ওক) নামে একজন লেখক, যিনি পেশায় আইনজীবী ও সাংবাদিক ছিলেন, ‘দ্য তাজমহল ওয়াজ আ রাজপুত প্যালেস’ নামে একটি বই লেখেন। সেখানে তিনি দাবি করেন এটি চতুর্থ শতকের এক রাজপুত প্রাসাদ।
এর ২৪ বছর পর তিনি ‘তাজমহল: দ্য ট্রু স্টোরি’ নামে আরেকটি বই লিখে তার তত্ত্ব বদলে বলেন, এটি আসলে ১১৫৫ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত একটি শিব মন্দির (তেজো মহালয়া), যা জয় সিং শাহজাহানকে উপহার দিলে পরে তাকে সমাধিতে রূপান্তর করা হয়।
ঐতিহাসিক জাইলস টিলটসনসহ অন্য বিশেষজ্ঞরা এই দাবিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে জানান, তাজমহলে যে পারস্য ও তৈমুরি স্থাপত্যের পেন্ডেন্টিভ গম্বুজ ও ‘হাশত বেহেশত’ নির্মাণশৈলী রয়েছে, তা প্রাক-মুঘল ভারতের কোনো মন্দিরে থাকা প্রযুক্তিগতভাবে অসম্ভব ছিল। ওক ২০০০ সালে এই দাবি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে গেলেও আদালত তা খারিজ করে দেয়।
পরবর্তীতে ২০০৫ সালেও অমরনাথ মিশ্র নামে এক ব্যক্তি একই ধরনের দাবি নিয়ে এলাহাবাদ হাই কোর্টে গেলে প্রমাণের অভাবে তা খারিজ হয়। এসব ভিত্তিহীন দাবির মুখে ২০১৭ সালে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া (এএসআই) একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়ে স্পষ্ট জানায় যে, তাজমহলে কখনো কোনো মন্দিরের অস্তিত্ব ছিল না বা এটি মন্দির হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের ইসলামি স্থাপত্যগুলোকে হিন্দু স্থাপনা হিসেবে দাবি করার এই প্রবণতা মূলত মুসলিম শাসনকালকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপনের একটি সুনির্দিষ্ট প্রচারণার অংশ। পিএন ওক একইভাবে দিল্লির লালকেল্লাকে হিন্দু দুর্গ এবং খ্রিস্টধর্মকে ‘কৃষ্ণ নীতি’ থেকে আসা ধর্ম বলেও দাবি করেছিলেন।
ভারতে ১৯৯১ সালের ‘উপাসনালয় সুরক্ষা আইন’ অনুযায়ী ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতার সময়কার ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর স্থিতাবস্থা বজায় রাখার কথা থাকলেও, সম্প্রতি মধ্যপ্রদেশের ভোজশালা বা সম্ভলের মসজিদের মতো ঘটনাগুলোতে এই আইনের লঙ্ঘন দেখা যাচ্ছে।
অনেকেই মনে করছেন, ভারতের ইতিহাসের বইগুলোতে একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শ অনুযায়ী ইতিহাস নতুন করে লেখার চেষ্টা চলছে। তবে এসব কৃত্রিম বিতর্ক ও রাজনৈতিক গল্পের বাইরে গিয়ে তাজমহল আজও বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের কাছে প্রেমের অনন্য প্রতীক এবং পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ হিসেবেই টিকে রয়েছে।
সময়ের আলো/জেডি