আজ বাংলা সংগীত জগতের কিংবদন্তি শিল্পী সুধীন দাশগুপ্তের মৃত্যুবার্ষিকী। গীতিকার, সুরকার, কণ্ঠশিল্পী এবং সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে বাংলা আধুনিক গানের অবিস্মরণীয় অধ্যায় তৈরি করেছিলেন তিনি। বাংলা চলচ্চিত্র এবং আধুনিক গানে নতুন দিগন্তের সূচনা করে তিনি সমৃদ্ধ করেছেন সঙ্গীতপ্রেমীদের হৃদয়।
সুধীন দাশগুপ্ত ১৯৩০ সালের ৯ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের যশোহর জেলার বড়কালিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব কেটেছিল দার্জিলিংয়ে। মায়ের প্রেরণা তাকে সঙ্গীতের জগতে প্রবেশের হাতেখড়ি তৈরি করেছিল, যদিও পিতা মহেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত ছিলেন শিক্ষাবিদ এবং পুত্রের সঙ্গীতপ্রিয়তা তিনি ততটা সমর্থন করতেন না। তবুও, সুধীনের প্রতিভা নিজেই তাকে সঙ্গীতের মহত্ত্বের পথে এগিয়ে নিয়ে যায়।
তিনি ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রে দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। পিয়ানো, সেতার, বাঁশি, তবলা থেকে হার্প পর্যন্ত, সবই তার হাতের ছোঁয়ায় প্রাণ ফিরে পেত। লন্ডনের রয়্যাল স্কুল অব মিউজিক থেকে উচ্চশিক্ষা নিয়ে তিনি পাশ্চাত্য সঙ্গীতে নিখুঁত দখল গড়ে তোলেন। একই সঙ্গে ভারতীয় রাগসঙ্গীত ও লোকসংগীতের গভীর অধ্যয়ন করেছিলেন। এনায়েত খানের কাছে সেতার শিক্ষা গ্রহণ এবং ভাতখণ্ডের রাগ সঙ্গীতের অনুশীলন তাকে পূর্ণাঙ্গ সঙ্গীতজ্ঞে পরিণত করে।
১৯৫৩ সালে সুধীনের প্রথম সুরারোপিত রেকর্ড প্রকাশিত হয় এবং বাংলা চলচ্চিত্র ‘উল্কা’-এর মাধ্যমে চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালনার যাত্রা শুরু করেন। এরপর ১৯৫০-৭০-এর দশক বাংলা আধুনিক গানের স্বর্ণযুগ হিসেবে পরিচিত হয়। এই সময় গৌরী প্রসন্ন মজুমদার, হেমন্ত কুমার মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, ভূপেন হাজারিকা প্রমুখ শিল্পীদের সঙ্গে সমানভাবে অবদান রেখেছিলেন।
তার রচিত গানগুলো শুধু সুরে নয়, কবিতার দিক থেকেও সমৃদ্ধ। ছোটদের জন্যও অসাধারণ সুরারোপ করেছিলেন, যেমন ‘হিংসুটে দৈত্য’ এবং ‘ছোটদের রামায়ণ’। এছাড়া তার ‘এতো সুর আর এতো গান’ ও ‘ঐ উজ্জ্বল দিন ডাকে স্বপ্ন রঙীন’ গানগুলো বাংলা গানের ইতিহাসে চিরস্মরণীয়।
চলচ্চিত্রের দিক থেকেও তার অবদান অপরিসীম। উল্লেখযোগ্য ছবিগুলো—‘পিকনিক’ (১৯৭২), ‘শঙ্খবেলা’ (১৯৬৬), ‘আকাশ কুসুম’ (১৯৬৫), ‘অপরাজিতা’ (১৯৭৬), ‘উল্কা’ (১৯৫৭)—বাংলা চলচ্চিত্র সংগীতে এক নতুন দিগন্ত সৃষ্টি করেছে। ১৯৭২ সালে ‘পিকনিক’ চলচ্চিত্রের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালক হিসেবে বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন পুরস্কার লাভ করেন।
সুধীন দাশগুপ্ত ছিলেন এক নম্র, ভদ্র, অন্তর্মুখী মানুষ। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি মঞ্জুশ্রী সেনগুপ্তকে বিয়ে করেন। তাদের পুত্র সৌম্য একজন আর্কিটেক্ট এবং কন্যা সাবেরি ফ্যাশন ডিজাইনার।
১৯৮২ সালের আজকের দিনে এই মহান শিল্পী আমাদের ছেড়ে চলে যান। তবে তার সৃষ্ট সংগীত, তার গানের ভাব, তার সুরের স্পন্দন আজও বাংলার প্রতিটি সংগীতপ্রেমীর হৃদয়ে অমর। তার গান শুধু সঙ্গীত নয়, এটি এক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার, যা নতুন প্রজন্মকেও অনুপ্রাণিত করে চলেছে।
আজ আমরা স্মরণ করি সুধীন দাশগুপ্তকে, যার সঙ্গীত ছিল চেতনায়, মননে এবং প্রতিটি স্পন্দনে। তার অবদান বাংলা সংগীত জগৎকে সমৃদ্ধ করেছে এবং তার সৃষ্টি চিরকালই বেঁচে থাকবে।
/ইউএমএইচ