ইলন মাস্কের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স (সাবেক টুইটার)-এর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চ্যাটবট গ্রোক এখন বিশ্বমঞ্চে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে। অভিযোগ উঠেছে, গ্রোকের মাধ্যমে ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহার করে আপত্তিকর ছবি, বিশেষ করে শিশুদের যৌন শ্লীলতা লঙ্ঘনকারী ছবি তৈরি করা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাজ্য, ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং তদন্ত শুরু করা হয়েছে।
ইলন মাস্ক অভিযোগগুলোকে ‘সেন্সরশিপের অজুহাত’ হিসেবে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, সরকারগুলো নিয়ন্ত্রণ আরোপের সুযোগ খুঁজছে এবং গ্রোককে অন্যান্য এআই টুলের তুলনায় অতিরিক্ত লক্ষ্য হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এক্সে তিনি একাধিক পোস্টে লিখেছেন, এটি নতুন কোনো সমস্যা নয়, এটি শুধু নতুন একটি টুল। মাস্কের দৃষ্টিতে, যারা গ্রোক ব্যবহার করে অবৈধ কনটেন্ট তৈরি করে, তাদের একইভাবে শাস্তি দেওয়া উচিত যেমন সাধারণভাবে অন্য অনৈতিক কনটেন্টের ক্ষেত্রে দেওয়া হয়।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার ইতোমধ্যেই এক্সকে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন, গ্রোকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে এক্সকে দায়িত্বশীল হতে হবে এবং দেশটির গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রক সংস্থা অফকমকে সমস্ত সম্ভাব্য ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ভাষ্য, সব বিকল্প টেবিলে থাকতে হবে।
বিতর্ক আরও তীব্র হয় যখন ইন্টারনেট ওয়াচ ফাউন্ডেশন জানায়, অপরাধীরা গ্রোক ব্যবহার করে শিশু যৌন নির্যাতনের ছবি তৈরি করছে। এই তথ্য প্রকাশের পর সরকার ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়।
এই পরিস্থিতিতে ইন্দোনেশিয়া গ্রোক ব্যবহারে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। দেশটির যোগাযোগ ও ডিজিটাল মন্ত্রী মেতিয়া হাফিদ বলেছেন, সম্মতি ছাড়া ডিপফেক তৈরি করা মানবাধিকার ও নাগরিক নিরাপত্তার মারাত্মক লঙ্ঘন। এটি প্রথম কোনো দেশ যেখানে সরাসরি এআই চ্যাটবট বন্ধের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বিতর্কের মধ্যেই এক্স কিছু সেটিংসে পরিবর্তন এনেছে। এখন থেকে ছবি সম্পাদনার সুবিধা শুধু অর্থপ্রদত্ত ব্যবহারকারীদের জন্য সীমিত। তবে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এই পরিবর্তনকে “অপমানজনক” হিসেবে উল্লেখ করেছে। তাদের মতে, এটি সমস্যার সমাধান নয়, কারণ ডিপফেক তৈরির সুযোগ এখনও সীমিতভাবে হলেও বিদ্যমান।
যুক্তরাজ্যের প্রযুক্তিমন্ত্রী লিজ কেন্ডাল বলেছেন, নারী ও শিশুদের ছবি যৌনভাবে বিকৃত করা জঘন্য ও নিন্দনীয়। তিনি সতর্ক করেছেন, এক্স যদি দেশীয় আইন মানতে ব্যর্থ হয়, তবে অফকম চাইলে প্ল্যাটফর্ম বন্ধের পদক্ষেপ নিতে পারে। অফকম ইতোমধ্যেই জরুরি মূল্যায়ন শুরু করেছে। প্রয়োজনে সর্বোচ্চ ১ কোটি ৮০ লাখ পাউন্ড জরিমানা বা বৈশ্বিক আয়ের ১০ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানা এবং ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। এছাড়াও আদালতের অনুমোদন সাপেক্ষে বিজ্ঞাপনদাতা, পেমেন্ট সেবা ও ইন্টারনেট সেবাদাতাদের এক্সের সঙ্গে কাজ বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গ্রোক বিতর্ক এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার এবং নিয়ন্ত্রণের দ্বন্দ্বকে সামনে এনেছে। একদিকে উদ্ভাবনের সুযোগ, অন্যদিকে অপব্যবহার। এ ঘটনাটি প্রশ্ন তুলেছে—প্রযুক্তি কতটা স্বাধীন হতে পারে এবং নিয়ন্ত্রণ কতটা জরুরি। বিশ্বজুড়ে সরকারগুলো এখন এ বিষয়ে সতর্ক ও সক্রিয় ভূমিকা নিচ্ছে।
এআই চ্যাটবট গ্রোকের এই বিতর্ক আন্তর্জাতিকভাবে নিয়ন্ত্রণ ও নৈতিকতার সংজ্ঞা পুনঃবিবেচনার আলোচনাকে তীব্র করেছে। প্রযুক্তি ও মানবাধিকার, উদ্ভাবন ও নিরাপত্তার মধ্যে যে সংযোজন তৈরি হয়েছে, সেটিই এখন বিশ্বমঞ্চে মূল আলোচনার বিষয়।
/ইউএমএইচ